শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ২১ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২০ আগস্ট, ২০১৯ ২৩:৪০

বেঁচে যাওয়াদের তাড়িয়ে বেড়ায় দুঃসহ স্মৃতি

নিজস্ব প্রতিবেদক

রক্তাক্ত একুশে আগস্টের নারকীয় ঘটনা এখনো দুঃস্বপ্নের মতো তাড়িয়ে বেড়ায় অনেককে। ঘটনার ১৫ বছর পরও তারা স্মৃতি থেকে মুছে ফেলতে পারছেন না সেই বিকেলকে। গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায় গ্রেনেডের বীভৎস আওয়াজ, লাশ, আর্তচিৎকার আর সহকর্মীদের বিলাপের স্মৃতির তাড়নায়। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় টার্গেট ছিল আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু সেদিন অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পেয়েছিলেন  তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের অন্য নেতারা। প্রাণ হারান সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রয়াত মো. জিল্লুর রহমানের স্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সেই সময়ের মহিলাবিষয়ক সম্পাদিকা আইভি রহমানসহ দলের তৎকালীন ২৪ নেতা-কর্মী। আহত হন পাঁচ শতাধিক, যাদের অনেকেই চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছেন কিংবা কেউ কেউ আর স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাননি। মৃত্যুর এত কাছাকাছি গিয়ে আবার ফিরে আসায় হয়তো তারা নতুন জীবন পেয়েছেন কিন্তু যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিন তাদের বহন করে যেতে হবে সেই বিভীষিকার স্মৃতি। মহিলা লীগের সহ-সভাপতি নাসিমা ফেরদৌসকে মৃত ভেবে ঘটনাস্থলে লাশের ট্রাকে তোলা হয়েছিল। সারি সারি লাশের সঙ্গে রাখা হয়েছিল ঢাকা মেডিকেলের করিডোরেও। কিন্তু জ্ঞান ফিরে আসায় চিৎকার করতেই চিকিৎসা করা হয় তাকে। সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক এমপি নাসিমা ফেরদৌস। বলেন, আমার শরীরে দেড় হাজারের মতো স্পিøন্টার ঢুকেছে। পা দুটো ক্ষতবিক্ষত। শরীরের ক্ষতবিক্ষত অংশগুলো জোড়াতালি দিয়ে হুইল চেয়ারে জীবনযাপন করছি। সেদিন নেত্রী শেখ হাসিনা আমার পাশে না থাকলে হয়তো আর কোনো দিন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারতাম না। তিনি বলেন, এখনো আমার শরীরের বিভিন্ন অংশে যন্ত্রণা হয়। মাঝে মাঝে রাতে ঘুমাতে পারি না। হাত-পা অবশ হয়ে আসে। ফুসফুস, কোমর, পিঠ, মাথা, হাত-পা, কত জায়গায় এখনো স্পিøন্টার। নিজের শরীরের ক্ষতগুলো নিজে দেখলে ঠিক থাকতে পারি না। আগস্ট এলেই আরও বেশি অসুস্থ হয়ে যাই। দুই চোখে শুধু বার বার লাশ আর রক্তের দৃশ্য ভেসে ওঠে। ২১ আগস্ট হামলা পরিকল্পনা করেছিলেন খালেদা ও তারেক রহমান। এ মামলায় এই দুজনের ফাঁসি হওয়া উচিত ছিল।  

ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার পরদিন পত্রিকায় মৃতদের সঙ্গে যার ছবি ছাপা হয়েছিল, তিনি সাভারের মাহবুবা আকতার। যিনি ছিলেন মৃতদের তালিকায়। সেই দিনের স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে মাহবুবা বলেন, ‘শরীরে দেড় হাজার ¯িপ্লন্টার। রাতে এক ঘণ্টা ঘুম হয়। বাকি সময়টা এপাশ-ওপাশ করেই কাটাই। এখনো শুনতে পাই সেই ভয়াবহ নারকীয় গ্রেনেডের শব্দ। মাঝেমধ্যে মনে হয়, এত কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে আত্মহত্যা করাই ভালো। কিন্তু না, আমাকে চিকিৎসাসহ আবাসনের ব্যবস্থা করে দিতে আমার নেত্রীও কম কষ্ট করেননি। আমি যদি আত্মহত্যা করি, তাহলে আমার নেত্রী কষ্ট পাবেন। আইভি রহমানের হাত ধরে দাঁড়িয়েছিলেন শাহিদা তারেক দীপ্তি (সাবেক সংসদ সদস্য)। নির্মম ওই ট্র্যাজেডি আইভি রহমানের জীবন কেড়ে নিলেও দেহে অসংখ্য ¯িপ্লন্টারের দুঃসহ যন্ত্রণা নিয়ে এখনো তিনি বেঁচে রয়েছেন। শমরিতা হাসপাতাল ছাড়াও মিরপুরের সেলিনা হাসপাতাল এবং কলকাতায় পিটারসেন এবং ব্যাংককে তার দেহে অস্ত্রোপচার করে দুই শতাধিক ¯িপ্লন্টার বের করা হলেও এখনো তার দুই পা-সহ সারা শরীরে বিঁধে রয়েছে পাঁচ শতাধিক ঘাতক ¯িপ্লন্টার। আওয়ামী লীগের অন্য নেতাদের সঙ্গে সেদিন গুরুতর আহত হন বর্তমান আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম। গুরুতর আহত শামীমকে প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে তাকে ভর্তি করা হয়নি। এরপর নিয়ে যাওয়া হয় সিকদার মেডিকেলে। সেখানে বেশ কিছু দিন চিকিৎসা হয়। এরপর ভারতের এ্যাপোলো হাসপাতালে অপারেশন করে শরীর থেকে কিছু ¯িপ্লন্টার বের করা হয়। তবে এখনো শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন ২৪টি ¯িপ্লন্টার। তিনি বলেন, নেত্রীর সামনেই ছিলাম। আপা বক্তৃতা শেষ করেছেন এমন সময় সাংবাদিকরা ছবি তোলার জন্য অনুরোধ করলে আপা মাইক নিয়ে দাঁড়ান। এ সময় মুহুর্মুহু গ্রেনেড ছোড়া হয়। এরপর কী হয়েছে মনে নেই।

পরে সিকদার মেডিকেলে নিজের অবস্থান জানতে পারি। তিনি বলেন, পূর্ণিমা কিংবা অমাবস্যার রাতে স্পি­ন্টারের যন্ত্রণায় ঘুমাতে পারি না। তিনি বলেন, সেদিনের গ্রেনেড হামলার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান জড়িত। দীর্ঘদিন মামলা চলার পর রায় হয়েছে। আমি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক কিংবা মন্ত্রী হিসেবে না, একজন আহত ব্যক্তি হিসেবে এ রায় দ্রুত কার্যকর হোক-এটাই আমার প্রত্যাশা।  

গ্রেনেড হামলার শিকার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সদস্য এস এম কামাল হোসেনের খাদ্য নালির ৯ ইঞ্চি কেটে ফেলা হয়েছিল। সেই দুঃসহ স্মৃতিচারণ করে এস এম কামাল হোসেন বলেন, ‘মানুষের দোয়ায় এবং আল্লাহর রহমতে এখন ভালো আছি। সেদিনের সেই ভয়ঙ্কর ঘটনার কথা মনে পড়লে এখনো দুই চোখ বন্ধ হয়ে আসে।’ তিনি বলেন, শেখ হাসিনাকে হত্যা করাই ছিল ঘাতকদের উদ্দেশ্য। ’৭৫-র ঘাতকের প্রতিনিধিরাই একুশে আগস্ট ঘটিয়েছিল। ‘এই হামলা যে শুধু আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার জন্য করা হয় তা নয়, ১৫ আগস্টের কুশীলবরা এই হামলার মাধ্যমে দেশকে গণতন্ত্রশূন্য করতে চেয়েছিল।’ তিনি বলেন, ‘এই হামলার বিচার হয়েছে, হচ্ছে। কিন্তু আমরা মনে করি আমাদের আশানুরূপ হয়নি। আমরা প্রত্যাশা করি এই হামলার মূল হোতা তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে এনে আদালত সর্বোচ্চ সাজা কার্যকর করবে।’

২০০৪ সালের ২১ আগস্টের দিন সাংবাদিকরা ঈশ্বরের ইচ্ছায় একেবারে দেবদূত হয়ে তখনকার বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাঁচিয়েছেন বলে মন্তব্য করেন আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য পংকজ দেবনাথ। তিনি বলেন, আপা (শেখ হাসিনা) বক্তৃতা শেষ করে নামবেন। এ মুহূর্তেই সংবাদ কর্মীরা বললেন, আপা আমি ছবিটা পাইনি। এটা বলেই আপাকে থামালেন। আপা তাদের কথায় একটু থেমেছেন এবং ছবি তোলার সুযোগ দিয়েছেন। তখন আমি লিড সেøাগান দিয়েছি। এ সময়ের মধ্যে একটা অপরিচিত শব্দ ভেসে এলো। আমরা বুঝিনি কোথায় কী হচ্ছে। বুঝে ওঠার আগেই আবার সেই শব্দ। তখন মানুষের আর্তচিৎকার। যদি সংবাদ কর্মীরা আপাকে না থামাতেন তাদের ছবির জন্য তাহলে কিন্তু ওই মুহূর্তে আপা সেই স্পটেই থাকতেন যেখানে আইভি রহমান ছিলেন। তিনি আরও বলেন, যারা হামলা করেছে তারা অত্যন্ত প্রশিক্ষিত। আমাদের স্বেচ্ছাসেবক লীগের কুদ্দুস পাটোয়ারী, মোস্তফা রহমান সেন্টুসহ অনেক নেতা-কর্মী শহীদ হয়েছেন। তখনো আমি বুঝিনি আমার পায়ে লেগেছে। আমার বাম পা নাড়তে পারছি না। আমি হাত দিয়ে দেখি পা আমার ঠিক আছে কিন্তু নড়তে পারছি না। তখন এলোপাতাড়ি গুলির শব্দ শুনতে পেলাম। আমি মাটিতে পড়ে গেলাম। হামলা হয়েছে অল্প সময়ের মধ্যে। আধা ঘণ্টাও লাগেনি। অল্প সময়ে অনেক ঘটনা।

ভয়াবহ ওই গ্রেনেড হামলায় আহত নেতাদের মধ্যে একজন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আকতার হোসেন। এখনো শরীরের অসংখ্য জায়গায় স্পি­ন্টার। প্রতিদিন ২১ আগস্ট ফিরে আসে তার কাছে। কারণ গ্রেনেডের টুকরো বিদ্ধ শরীরে যন্ত্রণার সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে আছেন এ নেতা। তিনি বললেন, সেদিন আমার অবস্থান ছিল ট্রাকের কাছে। ওপরে তখন নেত্রীর ভাষণ চলছিল। আমি বাহাউদ্দিন নাছিম, ইসহাক আলী খান পান্না, নজরুল ইসলাম বাবুসহ অনেকেই একসঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ করেই বিস্ফোরণ। এর মধ্যে একটি গ্রেনেড এসে ফাটে ট্রাকের কাছে। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা মোস্তাক আহমেদ সেন্টু ঘটনাস্থলেই মারা যান। ওই বিস্ফোরণেই আমি আহত হই। রক্তাক্ত হয়ে পড়ে থাকি রাস্তার ওপর। চোখের সামনে অনেক নেতা-নেত্রীর নির্মম মৃত্যু ভেসে ভেড়াচ্ছে এখনো। মাথা, ঠোঁট, স্পর্শকাতর অংশে এখনো স্পি­ন্টার রয়ে গেছে। রাতের দিকে এত কষ্ট হয় যে, মনে হয় বেঁচে থাকাটাই দুষ্কর।

ছাত্রলীগের সাবেক নেতা জোবায়দুল হক রাসেল গ্রেনেড হামলায় আহত হন। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, শত শত মানুষ আহত পড়ে আছে, ধোঁয়ায় চারপাশ অন্ধকার। সবাই দিগি¦দিক ছোটাছুটি করছেন। অথচ বিএনপি-জামায়াতের পেটোয়া পুলিশ বাহিনী আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ওপর নির্মমভাবে নির্যাতন করে। সেদিনের দৃশ্য ভাবতে গেলে গা ছমছম করে। কীভাবে যে মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে এলাম। আজও আমার শরীরে অনেক গ্রেনেড কণা। সান্ত্বনা একটাই। জননেত্রী শেখ হাসিনা এখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়।


আপনার মন্তব্য