Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ২৩:৪৩

বছরে পাচার ৭৫ হাজার কোটি টাকা আয় বৈষম্য বিপজ্জনক স্তরে

অর্থনীতি সমিতির সেমিনারে অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম

নিজস্ব প্রতিবেদক

বছরে পাচার ৭৫ হাজার কোটি টাকা আয় বৈষম্য বিপজ্জনক স্তরে

বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ৭৫ হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম। অর্থনীতি সমিতির সাবেক এ সভাপতির মতে, ব্যাংক ঋণ লুণ্ঠিত অর্থের সিংহভাগ অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। আর একটি বড় অংশ পাচার প্রক্রিয়ায় দেশের অর্থনীতিতে প্রবেশ করছে। যে কারণে আয়বৈষম্য বেড়ে বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছে গেছে।

ড মইনুলের মতে, ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ মোট দেশজ উৎপাদন-জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে বাহাদুরি করার কিছু নেই। এ প্রবৃদ্ধির হার সত্ত্বেও দেশে বৈষম্য বাড়ছে। বাংলাদেশ এখন একটি ‘উচ্চ আয়বৈষম্যের দেশে’ পরিণত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। আয়বৈষম্য বাড়তে থাকার এ প্রবণতা দেশের জন্য আসন্ন মহাবিপদ সংকেত বললে অত্যুক্তি হবে না। তার মতে, দেশে কোটিপতির সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এর পেছনে ন্যক্কারজনক পন্থা হলো- দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হওয়া। এমন কোনো সরকারি সংস্থার নাম করা যাবে না, যেটা খানিকটা দুর্নীতিমুক্ত। এ ছাড়া বর্তমান জাতীয় সংসদে সাংসদদের ৬২ শতাংশই ব্যবসায়ী। এ সংসদ ব্যবসায়ীদের সংসদ এবং রাজনীতি এখন লোভনীয় ব্যবসায় পরিণত। গতকাল রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি আয়োজিত ‘বাংলাদেশের আয় ও ধন বৈষম্য’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে উত্থাপিত মূল প্রবন্ধে এসব তথ্য তুলে ধরেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম।

অর্থনীতি সমিতির সভাপতি অধ্যাপক আবুল বারকাতের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক ড. জামাল উদ্দিন আহমেদের সঞ্চালনায় ওই সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। সেমিনারে আরও বক্তৃতা করেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থা-বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. কে এম মুরশিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শফিক উজ জামান। সাড়ে তিন দশক ধরে সর্বশক্তি দিয়ে এ বিষয়ে জাতির মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করেও তিনি ব্যর্থ হয়েছেন, এ কথা উল্লেখ করে ড. মইনুল ইসলাম তার প্রবন্ধে বলেন, বাংলাদেশে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের আয় বাড়ার হার বিশ্বে সবচেয়ে বেশি। ২০১২-১৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ধনাঢ্য ব্যক্তির বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ। তারা ধন বৈষম্যকে পাহাড়সমান করে তুলছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ অর্জিত হয়েছে বলে সরকারিভাবে প্রাক্কলিত হয়েছে। এ বিবেচনায় বিশ্বের অন্যতম গতিশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু দেশে আয়বৈষম্য বাড়ছে ব্যাপক হারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন তার ভাষণে বলেন, ৯০ দশকে খেলাপির সংস্কৃতি শুরু হয়। ওই সময় থেকে মনে করা হতো এটি সামাজিক সন্ত্রাস। এ ঋণ খেলাপির সংস্কৃতি রোধ করতে হবে। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পার হলেও আর্থিক খাতে আস্থার অভাব রয়েছে। ব্যাংক ও আর্থিক খাত ঠিক করতে হলে দীর্ঘমেয়াদে সংস্কার দরকার। পাশাপাশি আস্থার মাধ্যমে চালিয়ে নিতে হবে এ খাতকে। ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, দুর্নীতি, দলবাজি, স্বজনপ্রীতি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ঠেকানো না গেলে আয়বৈষম্য কমবে না। সুযোগ থাকার কারণেই দেশে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। দুর্নীতি ও সর্বক্ষেত্রে মধ্যস্বত্ব্যভোগী দূর করতে না পারলে এ বৈষম্য নিরসন করা যাবে না। তিনি আরও বলেন, ব্যাংকিং খাতে আমানত নেওয়া হয় তিন মাসের জন্য। কিন্তু ঋণ দেওয়া হয় দীর্ঘদিনের জন্য। বিদেশি একটি দাতা সংস্থার পরামর্শে ব্যাংকিং খাতে এ পদ্ধতি চালু হয়। যে কারণে আজ এ খাত ধ্বংসের মুখে পড়েছে।

সাবেক এ গর্ভনর আরও বলেন, দেশে কর জিডিপির অনুপাত কম। সোয়া চার কোটি মানুষ কর দেওয়ার কথা। সেখানে দিচ্ছে মাত্র ২০ লাখ। পদ্ধতিগত সমস্যার কারণেই এটি হয়েছে। তবে মাতৃমৃত্যুর হার ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবকিছুতেই বাংলাদেশ শীর্ষ অবস্থানে আছে। বৈষম্যের পরও এ অগ্রগতি হয়েছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থা-বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. কে এম মুরশিদ বলেন, সমাজে বৈষম্য বাড়লেও সাধারণ মানুষ এ নিয়ে কোনো কথা বলছে না। কিন্তু তারা কথা বলছে চাকরি নেই, বেতন কম, স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বেশি, আবাসন সমস্যা ইত্যাদি। কিন্তু প্রকৃত অর্থে বৈষম্য ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। কারণ সরকারের প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলো নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে কাজ করছে না। এগুলো ঠিক করতে হলে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দরকার। না হলে এর সমাধান সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি অধ্যাপক আবুল বারকাত বলেন, জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার দ্বিগুণ হলেও লাভ হবে না, যদি এর সুফল নিচের দিকে না যায়। বৈষম্য নিরসন করতে হবে। এ জন্য শক্তিশালী রাষ্ট্র দরকার। রাষ্ট্রের শক্তিশালী ভূমিকার দরকার। বৈষম্য নিরসনে সামাজিক সেবা খাতগুলোকে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শফিক উজ জামান বলেন, গ্রামকে অবহেলা করে চললে আয়বৈষম্য দূর হবে না। তা দূর করতে কর্মসংস্থানমুখী শিল্পায়ন দরকার। সে ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, রপ্তানি আয় কয়েকটি পণ্যের ওপর নির্ভর। দেশে পাট থেকে পলিমা হচ্ছে। এটি কাজে লাগিয়ে এ খাতে বৈষম্য দূর করতে হবে। কারণ বিশ্বে প্রতি দিন চার কোটি পিস পলিথিন ফেলা হচ্ছে। পলিমা আমাদের রপ্তানি খাতে বিরাট সুযোগ এনে দিতে পারে। অর্থনীতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. জামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকিং খাতেও বৈষম্য আছে। বড় ঋণ খেলাপিদের জেলে দিতে পারছে না, আটকাতে পারছে না। সঠিকভাবে ঋণ বিতরণ হয়নি। বড় সাহেবদের ঋণ দেওয়ার ফলে হাওর অঞ্চল সুনামগঞ্জ বা দরিদ্র অঞ্চল কুড়িগ্রামে ছোট ছোট ঋণ দেওয়া হয়নি। ব্যাংকারদের মনোভাবের কারণে এটি হয়েছে। তারা মনে করছে ছোট ঋণের পরিচালনা ব্যয় ও সময় অনেক বেশি। যে কারণে বড় ঋণের দিকে মনোযোগ দিয়েছে। এখানে সংস্কার আনা দরকার। তিনি আরও বলেন, মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। কিন্তু কর্মসংস্থানবিহীন জিডিপি হলে এর গুণগতমান ঠিক থাকবে না। এ জন্য বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিনিয়োগ বাড়ালে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।


আপনার মন্তব্য