শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১ নভেম্বর, ২০১৯ ২২:৪৬

বিশ্ব ফোরামে বাংলাদেশ

কমনওয়েলথ, মানবাধিকার কাউন্সিল, ইউনিসেফ, ইউনেস্কো এপিজিসহ দুই ডজন ফোরামে চালকের আসন

জুলকার নাইন

বিশ্ব ফোরামে বাংলাদেশ

বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ফোরামে বাংলাদেশের নেতৃত্ব বাড়ছে। একাধিক ফোরামে বাংলাদেশ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও পালন করছে। অনেক ফোরামের শক্তিশালী কার্যনির্বাহী কমিটিতে চালিকার আসনে আছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে আছে কমনওয়েলথ, মানবাধিকার কাউন্সিল, ইউনিসেফ, ইউনেস্কো, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত, ইউএনউইমেন, ওপিসিডব্লিউ, আরসিজি, এপিজি, ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনসহ অন্যান্য সংস্থা। উন্নয়নশীল দেশসমূহের স্বার্থ সংরক্ষণে ও জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এসব সংস্থাকে কাজ লাগানোর সুযোগ এসেছে বাংলাদেশের সামনে। এর মধ্যে             মানবাধিকার সুরক্ষা ও মুদ্রা পাচার প্রতিরোধের মতো ফোরাম যেমন আছে তেমন আছে নারীর ক্ষমতায়ন ও দূষণ প্রতিরোধের মতো ফোরাম। রাসায়নিক অস্ত্রনিরোধ সনদ কার্যকরের লক্ষ্য নিয়ে ১৯৯৭ সালে যাত্রা করে আন্তর্জাতিক সংস্থা অর্গানাইজেশন ফর দ্য প্রোহিবিশন অব কেমিক্যাল উইপন্স (ওপিসিডব্লিউ)। নেদারল্যান্ডসের হেগভিত্তিক সংস্থাটিতে সদস্য দেশ বর্তমানে ১৮৯টি। দুই বছর ধরে ওপিসিডব্লিউর নির্বাহী পরিষদের চেয়ারম্যান বাংলাদেশ। এ সংস্থার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়াটা কূটনীতির ক্ষেত্রে এক ‘বড় অর্জন’। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোয় জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়কারী সংস্থার (ইউএনওসিএইচএ) উদ্যোগে সিভিল-মিলিটারি সমন্বয়ে বড় ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলা ও মানবিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফরম রিজিওনাল কনসালটেটিভ গ্রুপ (আরসিজি)। এর মাধ্যমে বড় ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় আন্তদেশীয় সিভিল-মিলিটারি সমন্বয় জোরদার ও অপারেশনাল প্ল্যান তৈরি করা হয়। বাংলাদেশ এখন আরসিজি চেয়ারম্যান। অন্যদিকে, মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক মানদ  নির্ধারণকারী সংস্থা ফাইন্যানশিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্সের (এফএটিএফ) এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের আঞ্চলিক সংস্থা এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং (এপিজি)। বাংলাদেশ এই গ্রুপের কো-চেয়ার। এপিজির স্থায়ী কো-চেয়ার অস্ট্রেলিয়ার পাশাপাশি ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ এ দায়িত্বে থাকবে। একই সঙ্গে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত এপিজির স্টিয়ারিং গ্রুপের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে বাংলাদেশ।

জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের (ইউএনএইচআরসি) সদস্য হিসেবে তিন বছর মেয়াদে দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ। গত বছরের অক্টোবরে মানবাধিকার কাউন্সিলে আরও ১৬টি সদস্য দেশের সঙ্গে নির্বাচিত হয় বাংলাদেশ। জাতিসংঘের সদস্য ১৯৩টি দেশের ভোটের মধ্যে ১৭৮টি পায় বাংলাদেশ। জানুয়ারিতে নতুন মেয়াদের দায়িত্ব শুরু হয়। মানবাধিকার কাউন্সিলের সদস্য হয়ে ২০২১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ দায়িত্ব পালন করবে। অবশ্য এর আগে বাংলাদেশ তিনবার (২০০৯-১২, ২০১৫-১৭ ও ২০১৯-২১) এ সদস্য পদে বিজয়ী হয়েছিল। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্য দেশ থেকে ৪৭টি দেশ নিয়ে এ কাউন্সিল গঠিত হয়। এসব দেশ নির্বাচনের মাধ্যমে কাউন্সিলের সদস্য হয়। এ ছাড়া জাতিসংঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের (ইকোসক) সহযোগী সংস্থায় চার বছর মেয়াদে বাংলাদেশ এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করছে। ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থাকবে এ দায়িত্বে। কমিশন অন দ্য স্ট্যাটাস অব উইমেনের (সিএসডব্লিউ) সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ নির্বাচিত হয়েছে এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে।

জাতিসংঘ শিশুবিষয়ক সংস্থার ইউনিসেফের তহবিল পরিচালনায় ১৪ সদস্যের পরিষদের অন্যতম নির্বাচিত প্রতিনিধি বাংলাদেশ। এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে নির্বাচিত বাংলাদেশ ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত এ পরিষদে থাকবে। জাতিসংঘের নারীবিষয়ক বিশ্ব সংস্থা ইউএনউইমেনের ১৭ সদস্যের পরিচালনা পরিষদেরও তিন বছর মেয়াদে নির্বাচিত সদস্য বাংলাদেশ। ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ এ দায়িত্বে থাকবে। ইউনিসেফ ও ইউএনউইমেনের পরিচালনা পরিষদের সদস্য হওয়ায় বাংলাদেশ তিন বছর সক্রিয়ভাবে সংস্থা দুটির কার্যাবলি, অর্থসংস্থান ও এর যথাযথ ব্যবহারে ভূমিকা রাখতে পারবে। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশসমূহের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং ‘এজেন্ডা-২০৩০’-এর বাস্তবায়নেও সংস্থা দুটিকে আরও ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারবে। বিশ্বে শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির প্রসার এবং উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটানোর জন্য কাজ করে জাতিসংঘের বিশেষ সংস্থা ইউনেস্কো। এর নির্বাহী পরিষদে নির্বাচিত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ। ২০১৭ সালে শুরু হওয়া এই মেয়াদ শেষ হবে ২০২১ সালে। বিশ্বের অন্যতম জোট কমনওয়েলথের নির্বাহী কমিটিতে নির্বাচিত সদস্য হিসেবে কাজ করছে বাংলাদেশ। দুই বছর মেয়াদের এ দায়িত্ব শুরু হয়েছে ২০১৮ সালের জুলাইয়ে। ২০২০ সালের জুলাই পর্যন্ত কমনওয়েলথের ১৬ সদস্যের সর্বোচ্চ বডির অংশ হয়ে থাকবে বাংলাদেশ। ৫৩ সদস্যের এই জোটের সিদ্ধান্ত, প্রস্তাব ও কর্মসূচি কী হবে তা এই নির্বাহী কমিটিই নির্ধারণ করে। পরে সেগুলো পাস করা হয় কমনওয়েলথের গভর্নিং বডিতে। সমুদ্র অর্থনীতিবিষয়ক ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনের (আইওআরএ) ভাইস চেয়ারম্যান বাংলাদেশ। গত বছরের জুলাইয়ে ২০১৯-২১ মেয়াদের এ দায়িত্ব পায় বাংলাদেশ। এরপর ২০২১-২৩ মেয়াদে বাংলাদেশ এ সংস্থার চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করবে। বাংলাদেশ গত বছর ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ব্যুরোর সদস্য নির্বাচিত হয়েছে। আইসিসির সদস্য রাষ্ট্র ১২৩টি; তাদের সর্বসম্মতিক্রমে দুই বছরের (২০১৯-২০) জন্য ব্যুরো সদস্য হয় বাংলাদেশ। ২০১০ সালে আইসিসির সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে যোগদানের পর এই প্রথম বাংলাদেশ ব্যুরোর সদস্য হিসেবে কাজ করতে যাচ্ছে। মধ্যে ২১টি রাষ্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত ‘ব্যুরো’ আইসিসির শীর্ষ পরামর্শক পরিষদ হিসেবে পরিগণিত। সাধারণত ব্যুরো আইসিসির বাজেট চূড়ান্তকরণ, বিচারক, প্রসিকিউটর, ডেপুটি প্রসিকিউটর নির্বাচন সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্বান্ত গ্রহণ করে। জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আবদুল মোমেন বলেন, তিনি জাতিসংঘে প্রায় সাড়ে ছয় বছর স্থায়ী প্রতিনিধি ছিলেন। তিনি বলেন, ‘শুধু নিজের সময়ের কথা যদি বলি, প্রায় ৫২টি নির্বাচনে অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ, যার একটিতেও হারেনি। এর কারণ হচ্ছে, বাংলাদেশ সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রেখেছে, কারও সঙ্গেই শত্রুভাবাপন্ন কিছু করেনি।’ তিনি বলেন, এসব নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের যে প্রতিশ্রুতি ছিল, দায়িত্বের পাশাপাশি সেগুলোও রক্ষা করেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল এই দেশ বিশ্ববাসীর জন্য শান্তির দ্বীপ হবে (পিস আইল্যান্ড)। সত্যি সত্যি অদূর ভবিষ্যতে তাই হবে বাংলাদেশ।


আপনার মন্তব্য