শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২২ নভেম্বর, ২০১৯ ২৩:০৬

ক্রিকেট কূটনীতি বাংলাদেশ-ভারতের

ইডেনে ঘণ্টা বাজালেন হাসিনা-মমতা

কূটনৈতিক প্রতিবেদক ও কলকাতা প্রতিনিধি

ক্রিকেট কূটনীতি বাংলাদেশ-ভারতের
ঘণ্টা বাজিয়ে গতকাল ইডেনে দিনরাতের গোলাপি বলের টেস্ট ম্যাচের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি -বাংলাদেশ প্রতিদিন

খেলা ছাপিয়ে ইডেন গার্ডেন সাক্ষী হয়ে গেল এক ঐতিহাসিক ক্রিকেট কূটনীতির। গতকাল স্টেডিয়ামের ঐতিহ্যবাহী ঘণ্টা বাজিয়ে দিনরাতের টেস্ট ম্যাচের উদ্বোধন করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। ঢং ঢং ঢং ঘণ্টা বাজার পরই বল মাঠে গড়ায়। শুধু এ ম্যাচ উপলক্ষেই গতকাল সকালে ঢাকা থেকে কলকাতা যান প্রধানমন্ত্রী। ক্রিকেট-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি কর্মসূচি শেষে রাতে ঢাকা ফিরে আসেন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ ও ভারতের প্রথম এই দিনরাতের টেস্ট ম্যাচে উপস্থিত হয়ে আবারও একবার বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের অংশ হয়েছে। ২০০০ সালের নভেম্বরে ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে ভারতের বিরুদ্ধেই বাংলাদেশ ক্রিকেট দল প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলে। সে সময় বিপুলসংখ্যক দর্শকের উপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই ঐতিহাসিক সেই টেস্ট ম্যাচের উদ্বোধন করেছিলেন। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) সভাপতি সৌরভ গাঙ্গুলী সে সময় ভারতীয় ক্রিকেট দলের নেতৃত্ব দেন। সেই ম্যাচে বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়রাও গতকাল ছিলেন ইডেন গার্ডেনে। তখনকার বাংলাদেশের ক্যাপ্টেন নাইমুর রহমান দুর্জয় গতকাল তার স্কোয়াডের সদস্যদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন আরেক দফায়। দুপুর সাড়ে ১২টায় প্রধানমন্ত্রী টেস্টের ভেন্যু ইডেন গার্ডেনে গিয়ে পৌঁছলে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ও বিসিসিআই সভাপতি সৌরভ গাঙ্গুলী তাঁকে স্বাগত জানান। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মাঠে প্রবেশ করেই একটি ছাতার নিচে একত্রে কিছুক্ষণের জন্য বসেন। এরপর শেখ হাসিনা ও মমতা ব্যানার্জি মাঠে প্রবেশ করেন এবং উভয় দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে পরিচিত হন। মাঠে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই গ্যালারিভর্তি হাজারো দর্শক তুমুল করতালির মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানান। তিনিও হাত নেড়ে করতালির জবাব দেন। শেখ হাসিনা টসের জন্য বিশেষ গোলাপি কয়েন ও গোলাপি ম্যাচ বল সংশ্লিষ্ট দলের অধিনায়ক এবং আম্পায়ারদের হাতে তুলে দেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে স্থানীয় সময় ১২টা ৫৫ মিনিটে ইডেন গার্ডেনে ঘণ্টা বাজিয়ে ঐতিহাসিক গোলাপি বলের প্রথম টেস্ট ম্যাচের সূচনা করেন। বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়ক মোমিনুল হক ও ভারতের টেস্ট অধিনায়ক বিরাট কোহলি নিজ নিজ খেলোয়াড়দের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। গোলাপি বলে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত এ ঐতিহাসিক টেস্ট ম্যাচ স্থানীয় সময় দুপুর ১টায় শুরু হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন এমপি, ভারতের ক্রিকেট কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকার, ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের (বিসিসিআই) সভাপতি সৌরভ গাঙ্গুলী মাঠে উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ ও ভারতের চলমান সিরিজের এই দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচের প্রথম সেশনের খেলা দেখার পর প্রধানমন্ত্রী তাঁর জন্য নির্ধারিত হোটেলে যান। এ সময় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে হয় তাঁর একান্ত বৈঠক। গতকাল কলকাতার ইডেন গার্ডেনে ঐতিহাসিক গোলাপি টেস্টের ফাঁকেই সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা নাগাদ দক্ষিণ কলকাতার তাজ বেঙ্গল হোটেলে একান্ত বৈঠকে মিলিত হন শেখ হাসিনা ও মমতা ব্যানার্জি; যা চলে প্রায় এক ঘণ্টা। বৈঠক শেষে তাজ হোটেলে একটি ফটোসেশন হয়। বৈঠক শেষে মমতা বলেন, ‘এটা সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎকার। দুই বাংলার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বরাবরই ভালো। ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কও ওনেক ভালো। দুই দেশের মধ্যে অনেক আলোচনা হয়েছ।’ তিনি আরও বলেন, ‘শেখ হাসিনাকে আমি আবার আসতে বলেছি। বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্ব ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক যেন এভাবেই বজায় থাকে।’ পরে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমি বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা নিয়ে এসেছি। সৌরভ গাঙ্গুলী দাওয়াত দিয়েছেন ক্রিকেট খেলা দেখার জন্য। কলকাতায় গোলাপি বলে দিনরাতের যে খেলা হচ্ছে তা দেখতেই মূলত এসেছি।’ মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদানের কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের জাতির পিতা শেখ মুজিবুরের নেতৃত্বে যে মহান মুক্তিযুদ্ধ করি, তাতে ভারতবাসীর অবদান আমরা চিরদিন কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করব। তাই এ দেশের মানুষের প্রতি সব সময় আমার কৃতজ্ঞতা জানাই, সবাইকে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই। আমি যখনই এ দেশে আসি আমার খুবই ভালো লাগে। ১ কোটি শরণার্থী এখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং সে সময় তারা সব রকম সহযোগিতা পেয়েছিলেন। এটা আমরা সব সময় মনে রাখি। এই যে আমরা দুটি প্রতিবেশী দেশ সব সময় আমাদের সম্পর্ক চমৎকার এবং তা বজায় থাকুক তা-ই আমরা চাই।’ ইডেনে পিঙ্ক টেস্ট নিয়ে তিনি বলেন, ‘এই ক্রিকেট খেলায় আমরা এবার হয়তো ভালো করতে পারছি না। ইনশা আল্লহ আমরা একদিন নিশ্চয়ই ভালো করব।’ তবে তিস্তা বা এনআরসি ইস্যুতে মমতা ব্যানার্জি বা শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করলে কেউই মুখ খুলতে চাননি। সূত্রের খবর, এদিনের বৈঠকে হাসিনা নিজেই তিস্তা চুক্তি ইস্যুটি তোলেন। জবাবে মমতা জানান, এটি কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুনরায় স্টেডিয়ামে যান। ম্যাচের পর ইডেন গার্ডেন স্টেডিয়ামে বেঙ্গল ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী রাত ১০টায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি বিশেষ ফ্লাইটে ঢাকার উদ্দেশে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করেন। বিসিসিআই সভাপতি সৌরভ গাঙ্গুলী কলকাতায় দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচ খেলা দেখতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। অবশ্য পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচির কারণে মোদি উপস্থিত হতে পারেননি। পরে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়ে আমন্ত্রণ জানান। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলাদেশ বিমানের একটি বিশেষ ফ্লাইটে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীরা গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় কলকাতায় নেতাজি সুভাষ চন্দ্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেখানে কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম, ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী, বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার রিভা গাঙ্গুলী দাশ ও বিসিসিআই সভাপতি সৌরভ গাঙ্গুলী প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান।

দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী : ইডেন গার্ডেনে ভারত-বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের মধ্যে প্রথম দিনরাতের টেস্ট ম্যাচ উদ্বোধন উপলক্ষে ১২ ঘণ্টার কলকাতা সফর শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত রাত ১১টায় কলকাতার নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি বিশেষ ফ্লাইটে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ সময় রাত ১২টায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন তিনি। কলকাতা বিমানবন্দরে পশ্চিমবঙ্গের নগর উন্নয়নমন্ত্রী ও কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম এবং ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানান।


আপনার মন্তব্য