শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০৪

ট্রানজিস্টার ঘুরিয়ে পেয়ে গেলাম অরোরা নিয়াজি কথোপকথন

কামাল লোহানী

ট্রানজিস্টার ঘুরিয়ে পেয়ে গেলাম অরোরা নিয়াজি কথোপকথন

মুক্তিযুদ্ধে আমার কাছে সবচেয়ে আবেগময় দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। এদিন বিজয়ের ঠিক আগমুহূর্তে আমরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের জন্য সংবাদ,  কথিকা, গান ইত্যাদি তৈরিতে ব্যস্ত ছিলাম। মুক্তিবাহিনীর পক্ষ থেকে আমাদের অন্যান্য দিনের মতো নিয়মিত অনুষ্ঠান প্রচারে বিরত থাকতে বলা হলো। বিষয়টা স্বাভাবিক লাগল না। মনে হলো মুক্তিবাহিনী হয়তো বিজয় অর্জন করতে যাচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ ও রেডিও তরঙ্গ মনিটর করতে শুরু করি। ১৬ তারিখ সকালবেলা ট্রানজিস্টার ঘোরাতে ঘোরাতে একটা ওয়েব লেংথে পেয়ে গেলাম ভারত-বাংলাদেশ যুগ্ম-কমান্ডের অধিনায়ক জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা ও পাকিস্তানি বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক লে. জেনারেল এ এ কে নিয়াজির কথোপকথন। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই পেলাম মূল চমক!

প্রতিপক্ষ হলেও অরোরা ও নিয়াজি ছিলেন ব্যাচমেট। কথোপকথনে তারা রসিকতাও করছিলেন, আবার সিরিয়াস কথাও হচ্ছিল। আগেই মিত্রবাহিনী তিন ভাষায় পাকিস্তানকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়ে লিফলেট বিতরণ করেছে। তাতে লেখা হয়েছে, ‘হাতিয়ার ডালদো’। দুজনের অনেকক্ষণ কথোপকথন হলো। অপেক্ষা করতে করতে হঠাৎ করে শুনে ফেললাম যে, আজকেই (১৬ ডিসেম্বর) বিকাল সাড়ে ৪টায় ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করবে। জয়বাংলা স্লোগান দিয়ে উল্লাসে ফেটে পড়ি স্বাধীন বাংলা  বেতার কেন্দ্রের সবাই। পাশের কয়েকটি বাড়ি থেকে আমাদের জন্য মিষ্টি পাঠানো হয়। নিউজের দায়িত্বে আমি। বাঙালির অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে দ্রুত স্পেশাল বুলেটিন লিখে ফেললাম। এবার সেই খবর জাতিকে জানানোর পালা। সংবাদটি পড়ার কথা বাবুল আকতারের। সে পড়ার চেষ্টা করল। কিন্তু সেই বিশেষ সংবাদটি পাঠের জন্য কণ্ঠস্বরে যে উত্থান-পতনের প্রয়োজন তা বাবুলের ছিল না। আমার সহকর্মীরা তখন সংবাদটি আমাকে পাঠ করতে অনুরোধ জানালেন। সংবাদটি পাঠ করে আমার মধ্যে অদ্ভুত এক অনুভূতি  তৈরি হলো। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হতে যাচ্ছে। আর এই সংবাদটি সারাবিশ্বের মানুষের কাছে আমার কণ্ঠের মাধ্যমে  পৌঁছে যাচ্ছে, এটি ভাবতেই আমার কাছে অদ্ভুত এক শিহরণ লাগল।  সে সময় আমাদের ২ নম্বর স্টুডিওতে সহযোদ্ধা শহীদুল ইসলাম গান  লেখালেখির কাজ করছিলেন আর কণ্ঠশিল্পী অজিত রায় নিজের কণ্ঠে তা তুলছিলেন। মাত্র ১৯-২০ মিনিটে তারা সেদিন দেশের ঐতিহাসিক গান ‘বিজয় নিশান উড়ছে ঐ’ কণ্ঠে তোলার পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ফেললেন। বিষয়টা ছিল বিস্ময়কর! ২৫ মার্চ মাঝরাতে পাকিস্তানিরা অপারেশন সার্চলাইট অভিযান নাম দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নিরস্ত্র বাঙালির ওপর। পাকিস্তান সামরিক জান্তা ও পশ্চিমা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মনোভাব আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারলাম। এই গণহত্যার প্রতিবাদে ও পাকিস্তানি দুঃশাসন থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে- এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েই চট্টগ্রামের কালুরঘাটে ২৬ মার্চ চালু হলো স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র। ২৭ মার্চ মেজর জিয়া বঙ্গবন্ধুর নামে এই বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। সেই ঘোষণা পাঠ করার সঙ্গে সঙ্গে সেনাবাহিনীর বাঙালি সদস্যরা মুক্তিযুদ্ধের দিকে যুক্ত হতে থাকেন। দেশের মানুষও স্বতঃস্ফূর্তভাবে জনযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ৩০ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বোমা মেরে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র উড়িয়ে দেয়। কিন্তু ১ কিলোওয়াট একটি ট্রান্সমিটার অক্ষত ছিল। সেটি বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রের কর্মীরা বিভিন্ন বাধা অতিক্রম করে নিয়ে যান ত্রিপুরার জঙ্গলে। সেখান থেকেই প্রচার চলতে থাকে।

একসময় বেতার কেন্দ্রের বার্তা বিভাগের দায়িত্ব আমার ওপর বর্তায়। আমিনুল হক বাদশা আমাকে একটা ট্যাক্সিতে তুলে এক জায়গায় নিয়ে যায়। দোতলা একটা কক্ষে নিয়ে বলল, আপনি আজ থেকে এখানে থাকছেন। দুই দিন পরেই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শুরু হবে এখান থেকে। আপনাকে নিউজের দায়িত্ব নিতে হবে। কলকাতায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র চালু হলো। নেই তেমন কোনো সরঞ্জাম। আমরা কাজ শুরু করলাম। বাংলা ও ইংরেজি সংবাদ সাজিয়ে ফেললাম। প্রথমদিকে সকালে ও সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান প্রচার করা হতো। একটু ধাতস্থ হওয়ার পর দিনে তিনবার প্রচার করতে থাকলাম অনুষ্ঠান। তৈরি করা বেতার অনুষ্ঠানগুলো ৪০-৫০ মিনিট গাড়ি চালিয়ে সীমান্তের কাছাকাছি ট্রান্সমিটারে পৌঁছে দিতেন একজন বিএসএসফ জওয়ান। সেখান থেকেই প্রচার হতো। সংবাদ যাতে রিপিট না হয় এজন্য তিন দিনের ২৭টি বুলেটিন অগ্রিম তৈরি করে পাঠিয়ে দিতাম। যাতে অবরুদ্ধ বাংলাদেশের মানুষ বুঝতে না পারে আমরা কোনো ধর্মঘটে আছি বা বেতার বন্ধ হয়ে গেছে। অনুলেখক : শামীম আহমেদ

 


আপনার মন্তব্য

close