শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ২৩:০৭

রাজনীতিতে গার্মেন্ট মালিকদের সুসময়

মন্ত্রী মেয়র এমপি দলীয় পদে ভালো করছেন সবাই, আওয়ামী লীগে ঠাঁই না পাওয়াদের যোগাযোগ বিএনপিতে

মাহমুদ আজহার ও রফিকুল ইসলাম রনি

রাজনীতিতে গার্মেন্ট মালিকদের সুসময়

রাজনীতিতে সুসময় বইছে গার্মেন্ট মালিকদের। এক সময়ে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত অথবা সুসম্পর্ক রেখে চলা গার্মেন্ট ব্যবসায়ীদের অনেকেই এখন আওয়ামী লীগের টিকিটে এমপি হয়েছেন। আবার কোনো দলীয় রাজনীতি না করেও কেউ কেউ পেয়েছেন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব। এমনকি হয়েছেন ঢাকা সিটির মেয়রও। শুধু এমপি-মন্ত্রীই নন, দলীয় পদ-পদবিতেও আসছেন তারা। ক্রমান্বয়ে এই সংখ্যা বাড়ছে। অনেকেই এখন পাইপ লাইনে আছেন বলে জানা গেছে। তবে কেউ কেউ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত ছিলেন আগে। যারা আওয়ামী লীগে সুবিধা করতে পারছেন না তারা এখন তলে তলে বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে জানা গেছে।

সূত্রমতে, ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন গার্মেন্ট ব্যবসায়ী ও ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন। ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত থাকলেও পরবর্তীতে দলের কোনো পদ-পদবিতে ছিলেন না। ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের ছেড়ে দেওয়া আসনে নৌকা টিকিট নিয়ে নির্বাচিত হলে প্রথমবারের মতো সংসদে পা রাখতে যাচ্ছেন তিনি। বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আতিকুল ইসলাম গত ১ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগেও তিনি উত্তরের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের অকাল মৃত্যুতে উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন। ঢাকা উত্তর সিটির প্রথম মেয়র আনিসুল হকও এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি ছিলেন। তবে ব্যবসায়ীর চেয়ে দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে গ্লামার ছড়িয়ে সিভিল সোসাইটিতে তুমুল জনপ্রিয় মানুষ হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করে নিয়েছিলেন। ছিলেন দলমতের ঊর্ধ্বে  সবার কাছে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। 

গত দশম সংসদের খুলনা-৪ আসনের এমপি এস এম মোস্তফা রশিদী সুজার মৃত্যুর পর উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান গার্মেন্ট ব্যবসায়ী, সাবেক কৃতী ফুটবলার আবদুস সালাম মুর্শেদী। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি দলীয় মনোনয়ন পেয়ে এমপি হয়েছেন। এক সময়ের বিএনপিপন্থি ফোরামের ব্যবসায়ী নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এলাকায় রাজনীতিতেও অবদান ছিল না। ২০১৮ সালের ৩ মার্চ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর উপস্থিতিতে খুলনা সার্কিট হাউসের বিশাল সমাবেশে আনুষ্ঠানিকভাবে সালাম মুর্শেদী দলে সক্রিয় হন। এর আগে নিজ নির্বাচনী এলাকায় কোনো ধরনের গণসংযোগ ছিল না। ২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারিতেও তিনি নৌকা নিয়ে এমপি হয়েছেন।  রাজশাহী-৬ আসনে প্রথমবারের মতো নৌকা নিয়ে ২০০৮ সালে এমপি নির্বাচিত হন গার্মেন্ট ব্যবসায়ী শাহরিয়ার আলম। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০১৮ সালের ৩০ জানুয়ারির ভোটে নির্বাচিত হয়েও তিনি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন। পোশাক শিল্পের সফল উদ্যোক্তা হিসেবে ১৯৯৫ সালে ব্যবসা শুরু করেন শাহরিয়ার আলম। সফল উদ্যোক্তা হিসেবে ২০০৭-২০০৮ অর্থবছরে নিটওয়্যার ক্যাটাগরিতে জাতীয় রপ্তানি ট্রফি লাভ করেন তিনি। তবে রাজনীতিতে তিনি ভালো করছেন। রংপুর-৪ আসন থেকে গত তিনটি সংসদ নির্বাচনে নৌকা নিয়ে একটানা নির্বাচিত হয়েছেন গার্মেন্ট ব্যবসায়ী শিল্পপতি টিপু মুনশি। এবার তাকে দেওয়া হয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব। তিনি রাজধানীর গুলশান থানা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ছিলেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কমিটিতেও।  সিরাজগঞ্জ-৫ আসনে গত সংসদ নির্বাচনে নৌকা নিয়ে বিজয়ী হয়েছেন তরুণ গার্মেন্ট ব্যবসায়ী আবদুল মমিন মন্ডল। তার আগে এই আসনে দশম সংসদের এমপি ছিলেন তার পিতা ব্যবসায়ী আবদুল মজিদ মন্ডল। রাজশাহী-৪ আসনে আওয়ামী লীগের এমপি এনামুল হকও গার্মেন্ট ব্যবসায়ী। নরসিংদী-৩ আসনের এমপি জহুরুল হক ভূঁইয়া মোহন গার্মেন্ট ব্যবসায়ী।

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এক সময় ব্যবসায়ীরা রাজনীতিবিদ বা এমপিদের আর্থিক সহযোগিতা দিতেন। এখন ব্যবসায়ীরা নিজেরাই রাজনীতিতে নাম লেখান। এর দুটি কারণ হতে পারে। একটি হলো ওই ব্যবসায়ীর অর্থ আছে কোনো সামাজিক মর্যাদা নেই, তাকে কেউ চেনেন না। আরেকটি হলো তার আরও অর্থবিত্ত চাই। এ কারণেও তারা এমপি হতে মরিয়া। অন্যদিকে রাজনীতি এখন ক্ষমতার। এটা করতে গেলে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। শীর্ষ রাজনীতিবিদরাও চান টাকা-পয়সা। এ কারণে ব্যবসায়ীদেরও ছাড় দিতে হয়। আবার যারা রাজনীতি করেন, তাদের বড় অংশেরই কিছু না কিছু ব্যবসা আছে। নইলে তারা চাঁদাবাজি করে চলেন।’ 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমাদের দেশে যে রাজনীতি চলছে তা কোনো ফর্মুলা অনুযায়ী চলে না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ব্যবসায়ীরা তাদের স্বার্থের পরিপন্থী কিছু হলে প্রেসার গ্রুপ হিসেবে পার্লামেন্টের এমপিদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করেন। ব্যবসায়ীরা যাদের টাকা-পয়সা দিয়ে সহযোগিতা করে পার্লামেন্টে পাঠান তারা ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। এটা খোদ ভারতেও দেখা যায়। সেখানে টাটাসহ বড় বড় ব্যবসায়ী সব দলকেই সাহায্য করে। এখানে একটি উঁচু মানের বুর্জোয়া শ্রেণির বিকাশ ঘটে। কিন্তু আমাদের দেশে তার উল্টো। এখানে গণতন্ত্র মাঝেমধ্যে হোঁচট খায়। আমাদের পুঁজিপতিরা লুটেরা। তারা তাদের অবৈধ টাকা রক্ষার জন্যই রাজনীতিতে নাম লেখান। সংসদ সদস্য হন। এতে তাদের কোনো জবাবদিহিতা করতে হয় না। এখন টাকা সুইচ ব্যাংকে চলে যাচ্ছে। নানাভাবে পাচার হচ্ছে। ব্যাংক ও শেয়ারবাজার লুট হচ্ছে, ক্যাসিনোর বাজার তৈরি হচ্ছে। দলের রাজনীতি এখন পুঁজিপতি বা ব্যবসায়ীদের হাতে। 

সূত্রমতে, একাদশ জাতীয় সংসদে নির্বাচিত এমপিদের মধ্যে ১৮২ জনই পেশায় ব্যবসায়ী। অর্থাৎ ৬১ দশমিক ৭ শতাংশ। স্বাধীনতার দুই বছর পর প্রথম নির্বাচনে ১৯৭৩ সালে সংসদে ব্যবসায়ী ছিলেন ১৫ শতাংশ। তবে ১৯৯০ সালের পর থেকেই রাজনীতিতে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। এখানে আসতে থাকেন ব্যবসায়ীরাও। ১৯৯৬ সালে ব্যবসায়ী এমপির হার হয় ৪৮ শতাংশ, ২০০১ সালের সংসদে এ হার দাঁড়ায় ৫১ শতাংশ। ২০০৮ সালে মোট এমপির ৬৩ শতাংশই ছিলেন ব্যবসায়ী। আর দশম জাতীয় সংসদে অর্থাৎ ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে যারা এমপি নির্বাচিত হন তাদের মধ্যে ১৭৭ জন কোনো না কোনো ব্যবসায় সম্পৃক্ত ছিলেন, যা শতকরা হিসেবে ৫৯ শতাংশ। এখনো বহু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী আওয়ামী লীগের টিকিটে এমপি-মন্ত্রী হওয়ার জন্য পাইপ লাইনে আছেন। এর মধ্যে পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর শীর্ষ পর্যায়ের নেতা যেমন রয়েছেন, তেমনি আরও নানা ধরনের ব্যবসায়ীও রয়েছেন।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর