শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ২৯ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৮ মার্চ, ২০২০ ২৩:২৬

হাসপাতালে ডাক্তার নেই

সাধারণ রোগীরা সেবা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন, এখনো পিপিই মূল সংকট সারা দেশে

মাহবুব মমতাজী ও জয়শ্রী ভাদুড়ী

হাসপাতালে ডাক্তার নেই

করোনার ভয়ে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে রোগী দেখা বন্ধ করে দিয়েছেন ডাক্তাররা। এ পরিস্থিতিতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন অন্যান্য রোগী। তারা চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন বাড়িতে। এদিকে সার্জিক্যাল মাস্ক চেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক চিকিৎসক। এ ছাড়া ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) না পাওয়ায় সেবা দিতে আতঙ্কে থাকছেন চিকিৎসকরা। তারা পিপিই না পেলেও দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের পিপিই পরে ফটোসেশনের হিড়িক পড়ে গেছে।

সরেজমিন বেসরকারি হাসপাতাল : বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে সালাউদ্দিন স্পেশালাইজড হাসপাতাল অন্যতম। গতকাল বেলা সোয়া ৩টায় টিকাটুলী হাটখোলা রোডে এ হাসপাতালে চোখের ডাক্তার দেখাতে যান ওয়াদুদ মিয়া (৫৫) নামে এক ব্যক্তি। রিসিপশনে সিরিয়াল দিতে গেলে ডাক্তার নাই বলে তাকে জানানো হয়। সে সময় ওই নারী জানান, ডাক্তার দেখাতে সিরিয়াল নেওয়া শুরু হবে ৪ এপ্রিলের পর। আর চোখের ডাক্তার দেখানোর জন্য ওই ব্যক্তিকে ১ এপ্রিল তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত সোমবার থেকেই এ হাসপাতালে ব্যক্তিগতভাবে রোগী দেখা বন্ধ করে দেন ডাক্তাররা। অথচ নিয়মিতভাবে শিডিউলভেদে অন্তত ৭০ জন ডাক্তার রোগী দেখতেন এখানে। এদের মধ্যে ছিলেন- মেডিসিন বিভাগের তিনজন, হৃদরোগ বিভাগের তিনজন, নিউরো মেডিসিন বিভাগের দুজন, মেডিসিন ও লিভার বিভাগের চারজন, কিডনি রোগ বিভাগের একজন, ডায়াবেটিস ও হরমোন বিভাগের একজন, শিশুরোগ বিভাগের সাতজন, অনকোলজি বিভাগের একজন, বক্ষ ব্যাধি বিভাগের দুজন, চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগের তিনজন, মানসিক ও ¯œায়ুরোগ বিভাগের একজন, সার্জারি বিভাগের দুজন, ইউরোলজি বিভাগের একজন, শিশু সার্জারি বিভাগের একজন, অর্থোপেডিকস বিভাগের তিনজন, নিউরো সার্জারি বিভাগের একজন, নাক, কান ও গলা বিভাগের তিনজন, গাইনি ও প্রসূতি বিদ্যা বিভাগের আটজন, চক্ষু বিভাগের নয়জন, দন্ত রোগ বিভাগের তিনজন, ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগের একজন, প্যাথোলজি বিভাগের দুজন, রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগের একজন, আল্ট্রাসনোগ্রাফি বিভাগের পাঁচজন, ফিজিওথেরাপি বিভাগের একজন এবং নিউট্রিশন বিভাগের একজন ডাক্তার। নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী এ প্রতিবেদককে জানান, যেসব ডাক্তার এখানে প্রতিদিন রোগী দেখতেন তারা এখন করোনার ভয়ে বাসাতেই অবস্থান করছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার শাহ মো. মুহিউদ্দিন আজাদ বলেন, আমাদের রোগী দেখা বন্ধ নেই। রোগী আসলে আমরা ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা করি। তবে জ্বর, সর্দি আর কাশি নিয়ে কেউ এলে তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে কিংবা মহাখালীতে পাঠিয়ে দিই। এখন সারা দিনে জরুরি রোগী মাত্র ৫-৭ জন আসেন।

শুধু এই হাসপাতালেই নয়, পুরান ঢাকার দয়াগঞ্জ মোড়ে অবস্থিত ল্যাবএইড ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালেও দেখা গেছে একই চিত্র। গুলশানের শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দেখা যায়, এখানেও ডাক্তাররা রোগী দেখা কমিয়ে দিয়েছেন। ৩-৪ জন ডাক্তার আসেন এক দিন পর পর। করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে আক্রান্ত হচ্ছেন চিকিৎসকরা। এর মধ্যেই দেশে দুজন চিকিৎসক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। পর্যাপ্ত ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) না থাকায় আক্রান্ত হচ্ছেন চিকিৎসকরা। তাই জ্বর, সর্দি, কাশির রোগী এলে চিকিৎসা দিতে ভয়ে পাচ্ছেন চিকিৎসকরা।

স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, এ পর্যন্ত অধিদফতরে পিপিই এসেছে ৩ লাখ ৫০ হাজার। এর মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে ২ লাখ ৮৫ হাজার। মজুদ রয়েছে ৬৫ হাজার। আরও এক লাখ পিপিই খুব শিগগিরই স্বাস্থ্য অধিদফতরে পৌঁছাবে বলে জানা গেছে। কিন্তু রাজধানীসহ দেশের জেলা-উপজেলার হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত পিপিই পাচ্ছেন না চিকিৎসকরা। অনেক জেলার হাসপাতালে এখনো পিপিই পৌঁছায়নি। অথচ পিপিই পরে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিতে দেখা গেছে উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তাদের পিপিই পরে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিতে দেখা গেছে। অথচ পিপিই কার জন্য প্রয়োজন এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা রয়েছে। গত ১৫ মার্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সহযোগিতায় ‘করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ব্যক্তিগত সুরক্ষা উপকরণের (পিপিই) যুক্তিসঙ্গত ব্যবহার’-এই মর্মে একটি নির্দেশনা প্রচার করে স্বাস্থ্য অধিদফতর। ওই নির্দেশনায় বলা হয়, বিশ্বব্যাপী পিপিই তথা স্বাস্থ্যসেবাদাতাদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামে ঘাটতি রয়েছে এবং এই পরিস্থিতিতে জরুরি ভিত্তিতে দেশের স্বাস্থ্যসেবাদাতাসহ সংশ্লিষ্ট সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সঠিক নিয়মে যৌক্তিকভাবে সামগ্রীগুলো ব্যবহার করতে হবে। অথচ সরকারি কর্মকর্তারাই এই নির্দেশনা মানছেন না।

সোনারগাঁ উপজেলা প্রশাসন, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পিপিই পরে ফটোসেশনের ছবি এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পিপিই পরে এমন ফটোসেশনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের পিপিই কেন প্রয়োজন? যারা সরাসরি করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের সেবা দেবে সেসব চিকিৎসক, নার্স, আয়া, ওয়ার্ডবয়কে সুরক্ষার জন্য পিপিই দিতে হবে। এটা কোনো ফটোসেশনের সামগ্রী নয়। স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজন অনুযায়ী পিপিই সরবরাহের চেষ্টা চলছে। কিন্তু এই জরুরি সামগ্রীর যথেচ্ছ ব্যবহার হলে স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা ঝুঁকিতে পড়বেন।

মাস্ক চেয়ে চিকিৎসকের স্ট্যাটাস : ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক বিমল কুমার সাহা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, ‘আমি একজন চিকিৎসক। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত আছি। আমার কিছু সার্জিক্যাল মাস্ক দরকার। প্লিজ হেল্প করেন।’

গতকাল বেলা ২টা ৪৯ মিনিটে ‘ময়মনসিংহ হেল্পলাইন’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে নিজের মোবাইল নম্বর দিয়ে এমন পোস্ট দেন এই চিকিৎসক। তিনি সার্জারি বিভাগের মেডিকেল অফিসার। চিকিৎসকের দেওয়া এমন পোস্ট মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই ভাইরাল হয়ে যায়। অনেকেই এমন স্ট্যাটাসে চিকিৎসকের অসহায়ত্বের সঙ্গে একমত প্রকাশ করেন। আবার অনেকেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর