শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ৩ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২ এপ্রিল, ২০২০ ২৩:৩০

বিশ্বে ১০ লাখ আক্রান্ত মৃত্যু ৫০ হাজার

মক্কা-মদিনায় কারফিউ, বিপর্যস্ত স্পেন যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাজ্য ইতালি ফ্রান্স

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিশ্বে ১০ লাখ আক্রান্ত মৃত্যু ৫০ হাজার

চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান থেকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া নভেল করোনাভাইরাসের বিশ্বমহামারী কভিড-১৯-এ আক্রান্তের সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়েছে। আর মৃতের সংখ্যা পাড় করেছে অর্ধলাখের ঘর। করোনাভাইরাসের দোর্দ- প্রতাপে দেশে দেশে এখন লাশের মিছিল। অসহায় বিশ্বে এখন শুধুই কান্নার রোল। কোনো কিছুতেই যেন কোনো কাজ হচ্ছে না। স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে শুরু করে তাবৎ সামাজিক-অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ বন্ধ রেখে কারফিউ-লকডাউন পালন করেও প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না ভাইরাসকে। অনবরত মৃত্যু আর ঘায়েল হতে থাকায় প্রতিটি দিন ও রাত হয়ে উঠেছে বিভীষিকাময়। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার করতে মুসলমানদের পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনায় ২৪ ঘণ্টার কারফিউ জারি করেছে সৌদি আরব। যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ছে লাশের সংখ্যা। দেশটি এক দিনে মৃত্যুর নতুন রেকর্ড গড়ল। বিপর্যস্ত স্পেনের ভয়ঙ্করতম দিন ছিল গতকাল। দেশটিতে লাশের সংখ্যা ১০ হাজার পেরিয়ে গেছে। ইতালির মৃত্যু সংখ্যা ১৩ হাজার ছাড়িয়েছে। দেশটিতে লকডাউন চলবে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত। ভারতে আক্রান্ত ২ হাজার ছাড়িয়েছে। পার্শ্ববর্তী এ দেশটিতে এক দিনে মারা গেছে ১০ জন। লকডাউন না মানলে গুলির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ফিলিপাইনে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইয়াকোভ লিৎটজম্যান আক্রান্ত হয়েছেন। দেশটিতে মৃতের সংখ্যা ৩১। যুক্তরাজ্যে এক দিনে মৃত্যুর নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বুধবার রাত পর্যন্ত বিগত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে ৫৬৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে দেশটিতে মৃতের সংখ্যা ২৯২১ জনে পৌঁছেছে। এ ছাড়া করোনাভাইরাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৮৬ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ৫৬, যুক্তরাজ্যে ১৯, ইতালিতে ২, কাতারে ২, সৌদি আরবে ৩ এবং স্পেন, সুইডেন, লিবিয়ায় ও গাম্বিয়ায় ১ জন করে মারা গেছেন।

যুক্তরাজ্য থেকে প্রতিনিধি আ স ম মাসুম জানান, করোনাভাইরাসের মহামারীতে যুক্তরাজ্যে এক দিনে মৃত্যুর নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। বুধবার দেশটির স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে ৫৬৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে দেশটিতে মৃতের সংখ্যা ২৯২১ জনে পৌঁছেছে। যুক্তরাজ্যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর মৃতের সংখ্যা দু’শতে পৌঁছাতে সময় লাগে ১৭ দিন। আর পরবর্তী ১১ দিনেই মৃতের সংখ্যা দুই হাজার পার হয়েছে। যুক্তরাজ্যে এখন পর্যন্ত দেড় লক্ষাধিক মানুষের করোনাভাইরাস পরীক্ষা করা হয়েছে। স্থানীয় সময় বুধবার সকাল পর্যন্ত পরীক্ষা করা হয়েছে ১ লাখ ৫২ হাজার ৯৭৯ জনের। গত সাত দিনে গড়ে প্রতিদিন আট হাজার মানুষের এই পরীক্ষা করা হয়েছে। তার আগের সাত দিনে এই গড় ছিল ৫ হাজার ৮০০।

স্পেনে রেকর্ড মৃত্যু : করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গতকাল ২৪ ঘণ্টায় স্পেনে রেকর্ড মৃত্যু ঘটেছে। সন্ধ্যা পর্যন্ত পাওয়া খবর অনুযায়ী, মৃত্যুর সংখ্যা ছিল এক হাজারেরও বেশি। এই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দেশটিতে এদিন মোট মৃতের সংখ্যা ১১ হাজার ছাড়িয়েছে।

দিল্লিতে তাবলিগে যাওয়া তিন বাংলাদেশি করোনা আক্রান্ত : দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাজে তাবলিগ জামাতে যোগ দেওয়া তিন বাংলাদেশি করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। গতকাল ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের পালওয়াল এলাকার একটি গ্রামে তাদের পরীক্ষা করা হয়। ওই পরীক্ষায় তাদের শরীরে করোনার উপস্থিতি শনাক্ত হয় বলে জানিয়েছেন পালওয়ালের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা ব্রাহাম দীপ সিন্ধু। ডা. সিন্ধুকে উদ্ধৃত করে হিন্দুস্তান টাইমস এ তথ্য জানিয়েছে।

বুধবার বেশি মৃত্যু ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও স্পেনে : করোনায় মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে গত বুধবার নতুন মাইলস্টোন ছুঁয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন ও ইংল্যান্ড। ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্য অনুযায়ী, এদিন যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ৪৯ জনের। সব মিলিয়ে দেশটিতে মৃতের সংখ্যা ৫ হাজার ছাড়িয়ে যায়। ভয়াবহ পরিস্থিতি ছিল স্পেনেরও। সেখানে এদিন মৃত্যু হয় ৯২৩ জনের। এ ছাড়া এদিন ইতালিতে মারা যান ৭২৭ জন, ফ্রান্সে ৫০৯ জন, জার্মানিতে ১৫৬ জন, ইরানে ১৩৮ জন, নেদারল্যান্ডসে ১৩৪ জন, বেলজিয়ামে ১২৩ জন, তুর্কিতে ৬৩ জন, সুইডেনে ৫৬ জন, সুইজারল্যান্ডে ৫৫ জন, ব্রাজিলে ৪১ জন, পর্তুগালে ২৭ জন, ভারতে ২৩ জন, ইন্দোনেশিয়ায় ২১ জন মিলিয়ে বিশ্বে মোট মারা যান ৪ হাজার ৮৯০ জন।

মৃত্যু উপত্যকা নিউইয়র্ক : কার্যত হাসপাতালে পরিণত হয়েছে আমেরিকার নিউইয়র্ক শহর। বুধবার ২৪ ঘণ্টায় এখানে করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় প্রায় ১ হাজার ৩০০ জন। শুধু নিউইয়র্কেই মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় ৮৩ হাজার। মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, শুধু বুধবারই আমেরিকায় করোনায় মৃত্যু হয়েছে ৮৮৪ জনের, এর মধ্যে কেবল নিউইয়র্কেই মৃত্যু হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জনের। বস্তুত নিউইয়র্কই এখন মহামারীর ভরকেন্দ্র। নিউইয়র্ক প্রশাসন জানিয়েছে, সাধারণ মানুষ তো বটেই, ভাইরাস সংক্রমিত হয়েছে রাজ্যের পুলিশ এবং আপৎকালীন পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের মধ্যেও। নিউইয়র্ক প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু পুলিশেই ১৬ শতাংশ কর্মী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে ১ হাজার কর্মীর শরীরে করোনাভাইরাস মিলেছে। দমকলের ২ হাজার ৮০০ কর্মীকে অসুস্থতার কারণে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের ২৫ শতাংশ অসুস্থ। তাদের অনেকের শরীরেই সংক্রমণ ছড়িয়েছে। আমেরিকার নিউ জার্সি শহরের ডাক্তার ফ্রাঙ্ক গ্যাবরিন প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার অভাবে মারা গেছেন। তার দেহে করোনাভাইরাস সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দেওয়ার কয়েক দিনের মাথায় তিনি মারা যান। ফ্রাঙ্ক গ্যাবরিনের দীর্ঘদিনের বন্ধু ডেবরা ভ্যাসালেস লিয়ন্স জানান, ‘এক সপ্তাহ ধরে গ্যাবরিনের কাছে শুধু একটি কিট ছিল এবং একটি মাস্ক ছিল। তার গ্লাভস ছিল এক্সট্রা লার্জ সাইজের, অথচ গ্যাবরিনের জন্য দরকার ছিল মিডিয়াম সাইজের গ্লাভস। না পেয়ে গ্যাবরিন সেই এক্সট্রা লার্জ সাইজেরই গ্লাভস ব্যবহার করেছেন। এ ছাড়া, সাবানও ফুরিয়ে গিয়েছিল।’

এক সপ্তাহে মৃতের সংখ্যা দ্বিগুণ : গত বুধবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) ডিরেক্টর জেনারেল টেড্রোস আডহ্যানম গেব্রিয়েসাস বিশ্বকে ফের একবার সচেতন করে জানিয়েছেন, ‘কভিড-১৯-কে মহামারী ঘোষণার পর চার মাস হয়ে গেল। বিশ্বব্যাপী এই রোগ নিয়ন্ত্রণে আসার কোনো নাম নিচ্ছে না, উল্টো হুড়মুড়িয়ে বাড়ছে সংক্রমণের সংখ্যা, মৃতের সংখ্যা। গত এক সপ্তাহে মৃতের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। আর কিছু দিনের মধ্যেই ১০ লাখ ছুঁয়ে ফেলবে সংক্রমণের সংখ্যা এবং মৃতের সংখ্যা ছুঁয়ে ফেলবে ৫০ হাজার।’ তিনি উল্লেখ করেন, এ অবস্থায় লকডাউনই একমাত্র উপায় এই রোগের সঙ্গে লড়ার জন্য। তিনি দরিদ্র নাগরিকদের আর্থিক সংকট থেকে বাঁচাতে ঋণ মওকুফের প্রস্তাব দিয়েছেন।

আইসিইউ সংকট ইউরোপজুড়ে : করোনাভাইরাস মোকাবিলায় এখন নতুন সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে ইউরোপের দেশগুলো। হাসপাতালে শয্যা নেই। নেই পর্যাপ্ত পরিমাণে আইসিইউ-ও। এ অবস্থায় চীনের মতোই রাতারাতি অস্থায়ী হাসপাতাল গড়ার চেষ্টা করছে ইতালি, ফ্রান্স, ব্রিটেনের মতো দেশ। কোথাও সামরিক বিমান বা দ্রুতগতির ট্রেনে রোগীকে সরানো হচ্ছে অন্য প্রদেশে। কোথাও লাইব্রেরি বা কনভেনশন সেন্টারে গড়ে তোলা হচ্ছে অস্থায়ী হাসপাতাল। অপেক্ষাকৃত কম অসুস্থ মানুষদের সেখানে সরিয়ে করোনায় আক্রান্তদের পরিষেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে আইসিইউ থাকা হাসপাতালে। লন্ডনের একটি কনভেনশন সেন্টারে খুব শিগগিরই ৪ হাজার শয্যার একটি অস্থায়ী হাসপাতাল শুরু হচ্ছে। অপেক্ষাকৃত কম সংকটজনক রোগীদের সেখানে স্থানান্তরিত করা হবে। হাসপাতাল শয্যার সংখ্যা ২০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে স্পেনে। হোটেলগুলোকেও দ্রুত আইসোলেশন সেন্টার হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে। ইসরায়েলের স্বাস্থ্যমন্ত্রী আক্রান্ত, মোসাদ প্রধান কোয়ারেন্টাইনে : ইসরায়েলের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইয়াকোভ লিৎটজম্যান ও তার স্ত্রী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। ইসরায়েলি সরকারের সবচেয়ে প্রবীণ এই মন্ত্রী বর্তমানে আইসোলেশনে আছেন। গতকাল ইসরায়েলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে ইসরাইলি দৈনিক হারেৎজ খবর দিয়েছে, বুধবার রাতে আক্রান্ত ৭১ বছর বয়সী স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও তার স্ত্রীর শরীরে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি ধরা পড়ে।

এর পর থেকে তারা আইসোলেশনে থেকে চিকিৎসা নিতে শুরু করেছেন। দৈনিকটি আরও জানিয়েছে, মন্ত্রীর দেহে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর তার উপদেষ্টা এবং স্বাস্থ্য দফতরের মহাপরিচালকসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছে। এদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় ইসরায়েলি গুপ্তচর সংস্থা মোসাদের প্রধান ইয়োসি কোহেন এবং জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান মেইর বেন শাব্বাত কোয়ারেন্টাইনে চলে গেছেন। এ দুজনও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সম্প্রতি সাক্ষাৎ করেছিলেন। হারেৎজ জানিয়েছে, ইসরাইলে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে এ পর্যন্ত ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া ৬ হাজার ২১১ জন আক্রান্ত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১০৭ জনের অবস্থা গুরুতর।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর