শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ৩ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২ এপ্রিল, ২০২০ ২৩:৩৪

ত্রাণ বিতরণে সমন্বয়ের বিকল্প নেই

সশস্ত্র বাহিনী র‌্যাব পুলিশকে দায়িত্ব দেওয়ার আহ্বান

শিমুল মাহমুদ

ত্রাণ বিতরণে সমন্বয়ের বিকল্প নেই

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সরকার ঘোষিত বন্ধের কারণে কর্মবিচ্যুত লাখ লাখ মানুষের রোজগারের পথ রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে নিত্যদিনের খাবারে টান পড়েছে নিম্ন আয়ের অসংখ্য মানুষের। গরিব অসহায় মানুষের সহায়তায় সরকার এবং বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এলেও সমন্বয়হীনতায় ত্রাণ কার্যক্রমে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। বিচ্ছিন্নভাবে ত্রাণ দেওয়ায় বিভিন্ন স্থানে মারামারি, হট্টগোল হচ্ছে। ত্রাণ লোপাটের অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। সেই খবর প্রকাশের কারণে হামলার শিকার হয়েছেন সাংবাদিকরা। প্রকৃত অভাবীরা ত্রাণ পাচ্ছে না। অন্যদিকে অনেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সামগ্রী নিয়ে যাচ্ছে। বড় সমস্যা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার বিষয়টিই লঙ্ঘিত হচ্ছে। দীর্ঘ ত্রাণের লাইন কিংবা হুড়োহুড়ি করে ত্রাণ নেওয়ার মাধ্যমে করোনাভাইরাস সংক্রমণ মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। এ অব্যবস্থাপনা রোধে সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, র‌্যাবের মাধ্যমে তালিকা করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রকৃত অভাবীদের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া জরুরি। এর মাধ্যমে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মূল উদ্দেশ্য সফল হবে এবং যত্রতত্র ভিড় করে ত্রাণ নেওয়ার বিশৃঙ্খলা বন্ধ হবে। বিশৃঙ্খল বিতরণে ঝুঁকি বাড়ছে : দুই দফায় ১৭ দিনের বন্ধের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য, দোকানপাট, পরিবহনসহ নিত্যদিনের কর্মতৎপরতা বন্ধ হয়ে গেছে। কর্মহীন হয়ে পড়েছে অসংখ্য মানুষ। দৈনিক আয়ের মানুষগুলো পড়েছে অসহায় অবস্থায়। দিনমজুর, রিকশাচালক, স্বল্প আয়ের শ্রমিক-কর্মচারীসহ অসংখ্য মানুষ কষ্টে পড়ে গেছে। তারাই রাজধানীর আবাসিক এলাকাগুলোয় ভিড় করছে ত্রাণের আশায়। কিন্তু এলাকাভিত্তিক সোসাইটি এবং বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের পক্ষ থেকে ত্রাণ দেওয়া হলেও বিচ্ছিন্ন ত্রাণে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে। রাজধানীর উত্তরার কয়েকটি সেক্টরে ঘোষণা দিয়েও বিশৃঙ্খলার কারণে ত্রাণ বিতরণ বন্ধ করে দিতে হয়েছে। বুধবার দুপুরে উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টর কল্যাণ সমিতি ত্রাণ বিতরণের উদ্যোগ নিলেও প্রায় ৩ হাজার ত্রাণপ্রার্থীর উপস্থিতিতে হুড়োহুড়ির কারণে বিতরণ বন্ধ করে দিতে হয়। শত শত মানুষ গিজগিজ করে দাঁড়িয়ে ত্রাণ নিতে এসে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি মারাত্মকভানে বাড়িয়ে তুলছে। রাস্তায় ঘুরে ত্রাণ বিতরণ : করোনা সংকটে দিশাহীন নিম্ন আয়ের মানুষ ও হতদরিদ্রদের পাশে দাঁড়িয়েছেন অনেকে। বাড়িয়ে দিয়েছেন সহায়তায় হাত। এসব উদ্যোগ প্রশংসিত হলেও সমন্বয়হীনতায় কার্যকর সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েকদিন ধরে ঢাকার রাস্তায় গাড়িতে করে ঘুরে ঘুরে অনেকেই ত্রাণ দিচ্ছেন। এতে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে ত্রাণ বিতরণে। ত্রাণের আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা মানুষ রাস্তায় বসে থাকছে। ত্রাণের গাড়ি এলেই তারা হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এতে বিভিন্ন স্থানে ত্রাণদাতাদের পালিয়ে যেতে হয়েছে। মারামারির ঘটনাও ঘটেছে কোথাও কোথাও। বুধবার ও গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বহু মানুষকে রাস্তার পাশে বসে থাকতে দেখা যায়। সাহায্য-প্রত্যাশীর ভিড় ছিল মোড়ে মোড়ে। বুধবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ঢাকা মহানগরী দোকান মালিক সমিতির ত্রাণ বিতরণের সময় বিশৃঙ্খলা ও মারামারির ঘটনা ঘটে। এ সময় ত্রাণ নেওয়ার জন্য কাড়াকাড়ি, হুড়োহুড়ি লেগে যায়। এর আগে মঙ্গলবার দুপুরে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে খাবার বিতরণের সময় বিশৃঙ্খলার মধ্যে বিতরণ শেষ না করেই চলে যান আয়োজকরা। একই দিন গুলিস্তানে সমাজসেবা অধিদফতরের পিকআপ ভ্যান ঘিরে ধরে আশপাশের ভবঘুরে মানুষ ও রিকশাচালকরা। বিতরণের অপেক্ষা না করে তারা ত্রাণের ব্যাগ নিয়ে চলে যান। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, যত্রতত্র ত্রাণ বিতরণে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। রাস্তাঘাটে যেখানে সেখানে যানবাহন থেকে বিতরণের ফলে সঠিকভাবে ত্রাণ বণ্টন হচ্ছে না। গাড়ি থেকে ত্রাণসামগ্রী নিক্ষেপের ফলে হুড়োহুড়ি করে ত্রাণ নিতে গিয়ে শক্ত-সমর্থরাই ত্রাণ পাচ্ছে। দুর্বলদের কাছে ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে না। একই ব্যক্তি একাধিক ত্রাণের প্যাকেট লুফে নিচ্ছে। প্রয়োজন থাকলেও অনেকে ত্রাণ পাচ্ছে না। অনেকে ত্রাণ বিতরণের নামে শোডাউন ও প্রচার চালাচ্ছেন। ফেসবুকে ত্রাণ বিতরণের ছবিও শেয়ার করছেন তারা। লুটপাটও বন্ধ নেই : গত রবিবার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে জেলা প্রশাসকদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়, কর্মহীন ও যারা দৈনিক আয়ের ভিত্তিতে সংসার চালান, তাদের তালিকা প্রস্তুত করে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। স্থানীয় পর্যায়ে বিত্তশালী ব্যক্তি, সংগঠন, এনজিও কোনো খাদ্য সহায়তা দিলে জেলা প্রশাসকরা প্রস্তুতকৃত তালিকার সঙ্গে সমন্বয় করবেন, যাতে কোনো কর্মহীন মানুষ বাদ না পড়ে। গত কয়েকদিনে এ নির্দেশনা মানতে দেখা যায়নি অধিকাংশ এলাকায়। যে-যার মতো ত্রাণ বিতরণ করছে। বিশেষ করে কোনো কোনো স্থানে জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে ত্রাণ লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে রিপোর্ট লেখার কারণে সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে একাধিক জায়গায়। সমন্বয়ের বিকল্প নেই : বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে অনেক মানুষের জটলা করে ত্রাণ বিতরণের বিশৃঙ্খলা বন্ধ করতে হবে। রাস্তাঘাটে বিচ্ছিন্নভাবে ত্রাণ বিতরণের অরাজকতা থামাতে হবে। প্রকৃত অভাবীদের তালিকা তৈরি করে তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দিতে পারলে রাজপথের অরাজকতা বন্ধ হবে। এজন্য সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ ও র‌্যাবের মাধ্যমে যার যার দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় সমন্বয়ের কাজটি করা যায়। বর্তমানে সশস্ত্র বাহিনীসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সামাজিক দূরত্ব রক্ষায় সারা দেশে কাজ করছে। তাদেরই ত্রাণ বিতরণে সমন্বয়ের দায়িত্বটি দেওয়া যায়। এর মধ্য দিয়ে রাস্তার হুড়োহুড়ি বন্ধ হবে। মানুষের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব বজায় থাকবে। ত্রাণপ্রার্থীদের মাধ্যমে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ আশঙ্কাও দূর হবে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর