শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৮ এপ্রিল, ২০২০ ২৩:৩৮

এক মাসে ২০০ ছাড়াল আক্রান্ত

নতুন তিনজনসহ মৃত্যু বেড়ে ২০, আরও ৫৪ জন শনাক্ত, সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ঢাকায়, অধিকাংশই মানেননি সামাজিক দূরত্ব

মির্জা মেহেদী তমাল

এক মাসে ২০০ ছাড়াল আক্রান্ত

চীনের উহানে যে মূর্তিমান আতঙ্কের সঙ্গে মানুষের প্রথম দেখা, আজ গ্রহজুড়ে সেই আতঙ্ক করোনাভাইরাসের সঙ্গে যুদ্ধে লকডাউনে ঘরবন্দী মানুষ। কিন্তু কোনোভাবেই মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের রাশ টেনে ধরা যাচ্ছে না। মৃত্যুর মিছিল লম্বা হচ্ছে। মৃত্যুপুরীতে পরিণত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি, স্পেন, ফ্রান্সসহ অসংখ্য দেশ। বাংলাদেশও ভয়াবহ এ ভাইরাসের ছোবলের বাইরে নয়। গত ৮ মার্চ সর্বপ্রথম বাংলাদেশে করোনাভাইরাস আক্রান্ত তিন রোগীর সন্ধান পাওয়া যায়। ঠিক এক মাস পর বাংলাদেশে রোগীর সংখ্যা ছাড়াল ২০০। আক্রান্তের অধিকাংশই মানেননি সামাজিক দূরত্ব। বর্তমানে আক্রান্তের সংখ্যা ২১৮। মৃত্যু হয়েছে ২০ জনের। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন প্রাণঘাতী ভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির ক্রান্তিকাল। দেশ সংক্রমণের তৃতীয় স্তর থেকে চতুর্থ স্তরের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ইতিমধ্যে ২১ জেলায় এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের সংখ্যা এখন রাজধানী ঢাকা। এর পরের স্থানটি হলো নারায়ণগঞ্জ। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সামাজিক দূরত্ব কার্যকরে দেশে চলছে সাধারণ ছুটি আর জেলায় জেলায় লকডাউন। গতকালও কক্সবাজার, নরসিংদী জেলা লকডাউন করা হয়েছে। এর আগে ঢাকার প্রতিটি প্রবেশদ্বার বন্ধ করে দেওয়া হয়। লকডাউন করে দেওয়া হয়েছে আরও বেশ কয়েকটি জেলা। সামাজিক দূরত্ব কার্যকর ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে সেনাবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থা দেশজুড়ে কাজ করছে। এর পরও সামাজিক দূরত্বের ধার ধারছে না অনেকেই। এতে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।

পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বক্তব্য আসার পর। বার্তা সংস্থা বাসস জানায়, গত মঙ্গলবার সকালে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগীয় পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী প্রলয় সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, ‘সারা বিশ্বে যেভাবে করোনা রোগী বৃদ্ধি পেয়েছে, বৃদ্ধি পাওয়ার একটা ট্রেন্ড (প্রবণতা) আছে। তাতে আমাদের সময়টা এসে গেছে, এপ্রিল মাসটা। এই সময়টা আমাদের খুব সাবধানে থাকতে হবে।’

গতকাল এক ভিডিও কনফারেন্সে করোনা মোকাবিলায় চীনা বিশেষজ্ঞের কাছে বাংলাদেশের চিত্র তুলে ধরেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, বিদেশফেরত ব্যক্তিরা দেশে ফিরে তাদের নিজেদের শহরে ছড়িয়ে পড়েছেন। সবার তথ্য নেই আমাদের কাছে। মৃত্যুহারও তুলনামূলক বেশি। তার মানে রোগী শনাক্তে টেস্ট পর্যাপ্ত হচ্ছে না। করোনার উপসর্গ থেকে মারা যাওয়া নমুনা সংগ্রহ করে ফলাফল দেখা গেছে তারা অধিকাংশই করোনা পজিটিভ ছিলেন। শনাক্তের আগেই মারা যাচ্ছেন অনেকে। জানা গেছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও এর ব্যাপকতার ওপর ভিত্তি করে বিশ্বের দেশগুলোকে চারটি স্তরে ভাগ করেছে। একজনেরও সংক্রমণ শনাক্ত না হওয়া দেশ স্তর-১-এ। বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তি শনাক্ত হওয়া ও তাদের মাধ্যমে দু-এক জনের সংক্রমণ; স্তর-২। নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সংক্রমণ সীমিত থাকলে তা স্তর-৩। আর স্তর-৪ হলো সংক্রমণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া। ৮ মার্চ বাংলাদেশ প্রথম ঘোষণা করে, দেশে কভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তি আছে। এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সংক্রমণ পরিস্থিতির দ্বিতীয় স্তরে পৌঁছায়। সংক্রমিত ব্যক্তিরা ছিলেন বিদেশফেরত। এটাকে স্থানীয় সংক্রমণ বলা হয়। এই বিদেশফেরত ব্যক্তিদের মাধ্যমে বেশকিছু মানুষ সংক্রমিত হচ্ছে এমন বলতে থাকে আইইডিসিআর। কিন্তু দুই সপ্তাহ আগে রাজধানীর টোলারবাগে একটি সংক্রমণের ইতিহাসে দেখা যায়, সংক্রমিত ব্যক্তির বিদেশ ভ্রমণ বা বিদেশফেরত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার ইতিহাস নেই। তখনই প্রশ্ন উঠেছিল, সংক্রমণ কি তাহলে সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে? এরই মধ্যে ৫ এপ্রিল সংক্রমণের তৃতীয় স্তরে প্রবেশ করে বাংলাদেশ- এমন বক্তব্য দেন আইইডিসিআরের পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। তিনি বলেন, রাজধানীর টোলারবাগ ও বাসাবো, নারায়ণগঞ্জ, মাদারীপুর (শিবচর) ও গাইবান্ধা (সাদুল্লাপুর)-এ পাঁচ এলাকায় গুচ্ছ আকারে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে নগরবাসী নিজেকে ঘরে আবদ্ধ রেখে পরিবারের সদস্য, সর্বোপরি সমাজকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারে।

করোনার ভয়ঙ্কর থাবায় রাজধানী ঢাকা : করোনাভাইরাসের ভয়ঙ্কর থাবার কবলে পড়েছে রাজধানী ঢাকা। গত ৮ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত এক মাসে দেশে মোট ২১৮ জন করোনাভাইরাস রোগী শনাক্ত হয়। তার মধ্যে সর্বোচ্চ ১২৪ জনই রাজধানী ঢাকার। এ ছাড়া মৃত ২০ রোগীর সিংহভাগই রাজধানী ঢাকার বাসিন্দা। গতকাল পর্যন্ত রাজধানীর ৫২ এলাকায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে। এসব এলাকার কয়েক হাজার ঘরবাড়ি ইতিমধ্যে লকডাউন করা হয়েছে। করোনাভাইরাস ক্রমেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ায় রাজধানীর লাখ লাখ বাসিন্দা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। বন্ধ আছে স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শপিং মলসহ মার্কেটও বন্ধ। সংক্রমণের আশঙ্কায় মসজিদে প্রতি ওয়াক্তের নামাজে সর্বোচ্চ ৫ ও শুক্রবার জুমার নামাজে ১০ জনের বেশি নিয়ে জামাত করা যাবে না বলে নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। সরকারি নানা উদ্যোগের পরও থেমে নেই সংক্রমণ। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে রোগতত্ত্ববিদ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা রাজধানীসহ সারা দেশের মানুষকে অত্যাবশ্যক প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হতে নিষেধ করছেন। তবু অনেকে নানা অজুহাতে ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন। এত কিছুর পরও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখছেন না অনেকেই।

সচেতনতা তৈরি, চিকিৎসাসেবা প্রদান ও লকডাউন কার্যকরের পাশাপাশি দুস্থ ও অসহায়দের খাদ্য ও প্রয়োজনীয় উপকরণও সরবরাহ করছে সেনাবাহিনী গত ২৫ মার্চ থেকে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পঞ্চগড়, সাভার, লালমনিরহাটসহ দেশের প্রতিটি এলাকাতেই দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছেন সেনা সদস্যরা। দেশপ্রেম আর মানবিক বোধ থেকেই মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে নিজেরা বিনামূল্যে ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করছেন। সেই সঙ্গে রোদ, বৃষ্টি ও ঝড় উপেক্ষা করে সড়কে সড়কে টহল দিয়ে সাধারণ মানুষকে যেমন সতর্ক করছেন, তেমনি ‘সঙ্গনিরোধ’ নিশ্চিতেও তেড়েফুঁড়ে না ছুটে ইতিবাচক পদক্ষেপে জয় করেছেন দেশের মানুষের হৃদয়।

এক দিনে আক্রান্ত ৫৪ জন, মৃত ৩ : এক দিনেই ৫৪ জনের মধ্যে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ায় দেশে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১৮-এ। আক্রান্তের মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। দেশে কভিড-১৯-এ মৃতের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২০। আক্রান্তের মধ্যে ২০ জন কিশোর ও তরুণ।

এক মাস আগে দেশে প্রথম করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর এক দিনে আক্রান্তের এটাই সর্বোচ্চ সংখ্যা। আক্রান্তের মধ্যে মোট ৩৩ জন এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদফতরের স্বাস্থ্য বুলেটিনে দেশে করোনাভাইরাস পরিস্থিতির তথ্য তুলে ধরেন আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনাও উপস্থিত ছিলেন এ সময়।

ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ৯৮৮টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় ৫৬৩ ও ঢাকার বাইরে ৪২৫টি নমুনার পরীক্ষা হয়েছে। এখন পর্যন্ত মোট নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ৫ হাজার ১৬৪টি।

নতুন আক্রান্তের মধ্যে পাঁচজন ১১-২০ বছর বয়সী, ২১-৩০ বছরের ১৫ জন, ৩১-৪০ বছরের ১০ জন, ৪১-৫০ বছরের ৭ জন, ৫১-৬০ বছরের ৭ জন। এ ছাড়া আরও ১০ জন আক্রান্ত হয়েছেন, যাদের বয়স ৬০-এর ওপরে। আক্রান্তের মধ্যে ৩৩ জন পুরুষ, ২১ জন নারী। নতুন রোগীর মধ্যে ৩৯ জনই রাজধানী ঢাকার বাসিন্দা, একজন ঢাকার অদূরে এবং বাকিরা অন্যান্য জেলার।

অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা বলেন, দেশে বর্তমানে ১৬ জায়গায় করোনা শনাক্তকরণ টেস্ট করা হচ্ছে। এজন্য পর্যাপ্ত কিট সরবরাহ ও মজুদ রয়েছে। ২১ হাজার কিট বিতরণ হয়েছে এবং ৭১ হাজার কিট এখনো মজুদ রয়েছে। এ পর্যন্ত ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম স্বাস্থ্য অধিদফতরে এসেছে ৬ লাখ ৯১ হাজার ২৯২টি, সরবরাহ করা হয়েছে ৪ লাখ ৭০ হাজার ৭৭৪টি। বর্তমানে মজুদ রয়েছে ২ লাখ ২০ হাজার ৫১৮টি। করোনার আক্রমণ ঠেকাতে বর্তমানে হোম কেয়ারেন্টাইনে রয়েছেন ৭৩৭ জন, প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন ১৩৯ জন। এ ছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় আইসোলেশনে নেওয়া হয়েছে ১৬ জনকে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর