শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ৭ জুন, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৬ জুন, ২০২০ ২৩:৪৫

হটস্পট ধরে লকডাউন

ঢাকা নারায়ণগঞ্জ গাজীপুর নরসিংদীর বিভিন্ন স্পট

নিজামুল হক বিপুল

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে এখন নতুন পদ্ধতিতে লকডাউন আজ-কালের মধ্যেই। তবে প্রথমে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের দুটি এবং ঢাকার বাইরে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও নরসিংদীতে তিনটি স্পট মিলিয়ে মোট পাঁচটি স্পটে আজ-কালের মধ্যেই লকডাউন কার্যক্রম শুরু হবে। এই কার্যক্রম কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে তা নিয়ে এখন বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে আলোচনা চলছে। তাদের মতামত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে। এই পাঁচটি স্পটের এক সপ্তাহের কার্যক্রম মূল্যায়ন করে পরে সারা দেশে ব্যাপকভাবে সংক্রিমত এলাকাগুলোতে লকডাউনে যাবে সরকার। গতকাল এসব বিষয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ বৈঠক হয়েছে। একাধিক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এর আগে শুক্রবার স্বাস্থ্য ও সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ও মিডিয়া সেলের প্রধান মো. হাবিবুর রহমান জানিয়েছিলেন, আজ থেকেই লকডাউন কার্যক্রম শুরু হবে। কিন্তু গতকাল তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে গতকালও স্বাস্থ্যমন্ত্রী, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী, পুলিশের মহাপরিদর্শকসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সচিব, স্বাস্থ্য অধিদফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে দীর্ঘ বৈঠক হয়েছে। কীভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় আক্রান্ত এলাকা লকডাউন করা হবে তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। একটা খসড়া প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে। এখন এটি চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। আজ-কালের মধ্যেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে এবং বাস্তবায়ন কার্যক্রমও শুরু হবে। বৈঠকে অংশগ্রহণকারী ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার মো. মোস্তাফিজুর রহমান গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, লকডাউনের বিষয়ে একটা প্ল্যানিং হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের রাজাবাজার ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ওয়ারী এবং নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও নরসিংদীর একটি করে স্পটকে এই পরিকল্পনার আওতায় আনা হয়েছে। দুই সিটি করপোরেশনের মেয়র ঠিক করবেন তারা কোন প্রক্রিয়ায় লকডাউনে যাবেন। আর বাকি তিন জেলার জেলা প্রশাসকরা রোগীর হার দেখে তিনটি স্পট চূড়ান্ত করেছেন। তিনি বলেন, এখন বিশেজ্ঞদের মতামত পাওয়ার পর আজ-কালের মধ্যেই লকডাউনের একটা সিদ্ধান্ত আসবে। তিনি জানান, সারা দেশে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা হচ্ছে। করোনা আক্রান্ত রোগীর ব্যাপক উপস্থিতি রয়েছে এমন প্রথম পাঁচটি স্পটকে লকডাউন করা হবে। সেগুলোর এক সপ্তাহের কার্যক্রম মূল্যায়ন করে পরবর্তী সময়ে সারা দেশের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। একটি সূত্র জানায়, বৈঠকে এ রকম আলোচনা হয়েছে যে, কোনো এলাকায় ১ লাখ লোকের মধ্যে ৩০ জন রোগী থাকলে সেই এলাকাকে রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করে লকডাউন করা হবে। কিন্তু ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার বলছেন, এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে, কিছু প্রস্তাব এসেছে, কিন্তু এসব বিষয়ে কোনো কিছু চূড়ান্ত হয়নি। অন্যদিকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এন এম জিয়াউল আলম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠকে একটা খসড়া উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তিনি জানান, গতকালের বৈঠকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী, আইসিটি প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, বিশেষজ্ঞরাসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ডিভাইস তৈরি করে দিয়েছি। আর্টিফিসেয়েল ইন্টিলিজেন্সের মাধ্যমে স্ট্যান্ডার্ড অপারেশন প্রসিডিউরের কাজ চলছে। খুব দ্রুত এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে। অবশ্য আইইডিসিআরের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঢাকার যেসব এলাকাকে রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলো পর্যায়ক্রমে লকডাউন করা হবে। তবে প্রথমেই রাজাবাজার ও ওয়ারীতে এই লকডাউন কার্যক্রম বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি জানান, এ ছাড়া মিরপুর, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, মহাখালীসহ বেশ কিছু এলাকাকে রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এদিকে নরসিংদীর জেলা প্রশাসক সৈয়দা ফারজানা কাউনাইন গতকাল রাতে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমার জেলায় অতি ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে মাধবদী পৌরসভা। এ পৌরসভার নয়টি ওয়ার্ডের সব কটিতেই কমবেশি রোগী আছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আজ থেকেই এ পৌরসভাকে লকডাউন করে দেওয়া হবে। ইতিমধ্যে সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। মানুষের জীবন-জীবিকাকে সমন্বয় করে আমরা কাজ করছি।’ তিনি জানান, আজ মাধবদীর প্রবেশ ও বহির্গমন পথ বন্ধ করে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হবে। পৌরসভায় বৈঠক করা হবে। নরসিংদীর ডিসি বলেন, ‘আমরা লকডাউন করলেও যেসব বাড়িতে সন্দেহজনক রোগীর সন্ধান পাওয়া যাবে, তাদের নমুনা সংগ্রহ করা হবে বাড়ি বাড়ি গিয়ে। আমরা অ্যাম্বুলেন্সেরও ব্যবস্থা করে রেখেছি। আর যাদের বাড়িতে খাবারের প্রয়োজন হবে তাদের কাছে আমাদের লোকজন খাবার পৌঁছে দেবে। ইতিমধ্যে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে বেশ কয়েকটি কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে। এসব কমিটি কাজ করবে। আমরা সার্বক্ষণিক মনিটরিং করব।’ গত কয়েক দিনের পরীক্ষায় করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বিষয়টি সরকারকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয়। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ১ জুন সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে স্বরাষ্ট্র, স্বাস্থ্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও বেশ কয়েকজন সচিবকে নিয়ে জরুরি সভা করেন। সভায় উপস্থিত প্রায় সবাই মতামত দেন নতুন করে লকডাউনের। এ সভার পর স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে সারা দেশকে তিনটি জোনে ভাগ করে যেসব এলাকায় সংক্রমণ বেশি সেগুলোতে এলাকাভিত্তিক লকডাউন করা হবে। প্রসঙ্গত, দেশে প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। এরপর সরকার ২৬ মার্চ থেকে সারা দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। এই ছুটি পরে দফায় দফায় বাড়িয়ে ৩০ মে পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়। দীর্ঘ ৬৬ দিনের এই ছুটির মূল উদ্দেশ্যই ছিল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকানো। কিন্তু সরকার সাধারণ ছুুটি দিলেও লকডাউন ঘোষণা না করায় কার্যত ওই ছুটির সময় লোকজনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। এমনকি ছুটিকালীন গার্মেন্ট কারখানার শ্রমিকদের ঢাকায় ডেকে নিয়ে আসে মালিকপক্ষ। তারপর আবার তাদের ফেরতও পাঠায়। এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয় বিভিন্ন মহলে। এরপর ঈদের সময় রাজধানী থেকে লোকজন গ্রামে ছুটে যায় কোনো রকম নিয়ম না মেনেই। আবার ছুটি শেষ হলে গ্রাম থেকে দল বেঁধে মানুষজন ঢাকায় চলে আসে। এসব যাত্রায় কোনো স্বাস্থ্যবিধি মানা হয়নি। এ নিয়েও সমালোচনা আছে। এসব কারণে করোনাভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায়।

 


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর