শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ৭ জুন, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৬ জুন, ২০২০ ২৩:৪৯

এখনো উত্তাল ওয়াশিংটনসহ অনেক রাজ্য

লাবলু আনসার, যুক্তরাষ্ট্র

কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েড হত্যার বিচার এবং বর্ণবৈষম্য বন্ধে বিদ্যমান আইন সংশোধনের দাবিতে ১১ দিনের মতো শুক্রবারও নিউইয়র্ক, ফিলাডেলফিয়া, ওয়াশিংটন ডিসি, লসএঞ্জেলেস, টেক্সাসসহ বিভিন্ন স্থানে শান্তিপূর্ণ মিছিল হয়েছে। নিউইয়র্ক, বাফেলো, ফিলাডেলফিয়া, মিনিয়াপলিসসহ বেশ কটি সিটিতে শুক্রবার রাতেও কারফিউ ছিল। বিক্ষোভ-সমাবেশে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়েন আন্দোলনকারীরা। বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র শ্রম বিভাগ বেকার সংখ্যা হ্রাসের তথ্য প্রকাশের পর ট্রাম্প হোয়াইট হাউস থেকে পাঠানো বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আজ এক মহান (?) দিন। স্বর্গ থেকে জর্জ ফ্লয়েড  নিচে দৃষ্টি প্রসারিত করে ভাবছেন যে, ‘আজ আমার জন্য খুবই মহান (?) একটি দিন। এই দিনের মধ্য দিয়েই বর্ণ-বৈষম্যের চলমান আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটবে।’ এভাবে তিরস্কারের জন্য ট্রাম্পের কঠোর সমালোচনা করা হয় সব মহল থেকেই। এদিকে, কারফিউ এবং বিক্ষোভ চলার সময় বাফেলো, আটলান্টা, মায়ামিতে পুলিশের নির্মম আচরণের আরও কিছু ভিডিও প্রচারিত হয়েছে। জর্জ ফ্লয়েডকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তেমনি পৈশাচিক আচরণের নগ্ন প্রকাশ ঘটেছে এসব ভিডিওতে। এমনি একটি ভিডিওতে নিউইয়র্ক স্টেটের বিশ্বখ্যাত নায়েগ্রা জলপ্রপাত অধ্যুষিত বাফেলো সিটিতে বর্ণবাদবিরোধী শান্তিপূর্ণ মিছিলে ৪ জুন ৭৫ বছর বয়স্ক এক শ্বেতাঙ্গকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে দেখা যায়। কংক্রিটের রাস্তায় উল্টোভাবে পড়ে তার কান থেকে রক্ত বের হতে দেখেও পুলিশ কর্মকর্তারা না দেখার ভান করে ঘটনাস্থল অতিক্রম করেন। পরে মিছিলকারিদের ফোনে এ্যাম্বুলেন্স এসে তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেয়। তার অবস্থা ২৪ ঘন্টা পরও শংকামুক্ত নয় বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ভিডিও দেখে স্টেট গভর্নরের নির্দেশ পাবার আগেই বাফেলো সিটি পুলিশ কমিশনার সংশ্লিষ্ট দুই কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেন। এ নিয়ে তুমুল উত্তেজনার মধ্যেই বাফেলো পুলিশ ডিপার্টমেন্ট ইমার্জেন্সি টিমের দুই কর্মকর্তার ৫৭ সহকর্মী পদত্যাগের হুমকি দিয়েছেন। অর্থাৎ ওই ঘটনাকে তারা অপকর্ম হিসেবে মেনে নিতে চাচ্ছেন না। সিটি মেয়র জানিয়েছেন যে, ভিডিওটির বিষয় নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত চলছে। বাফেলো সিটির আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে যথাযথ বিকল্প ব্যবস্থা অবলম্বন করা হয়েছে। ৫ জুন আরেকটি বড় ধরনের ঘটনা ঘটেছে মিনিয়াপলিস সিটি কাউন্সিলে। সিটি কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট লিসা বেন্ডার জানান, কাউন্সিলের পূর্ণাঙ্গ বৈঠকে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে শুক্রবার বিকালে এটি গৃহীত হয়েছে। ঘাড়ে অথবা গলায় হাঁটু গেড়ে কাউকে গ্রেফতারের প্রক্রিয়া অবলম্বনের বিধি রহিত করার। বিলটি সবমহলে অভিনন্দিত হচ্ছে। বহু পুরনো এই বিধির মাধ্যমেই বর্ণ-বিদ্বেষের টার্গেট কৃষ্ণাঙ্গদের হত্যা করা হয়েছে বিভিন্ন স্থানে। এমন সংস্কারের দাবিতেও সোচ্চার বিক্ষোভ-সমাবেশ।

এদিকে, কারফিউর মধ্যে নিউইয়র্ক সিটিতে, বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশকে নির্দয় আচরণ করতে দেখা গেছে আরেকটি ভিডিওতে। মিনেসোটায় জর্জ ফ্লয়েড মিনিয়াপলিসের যে স্থানে পুলিশের হাতে খুন হন, সেখানে ৪ জুন একটি স্মরণানুষ্ঠান শেষ হওয়ার কয়েক ঘন্টা পর পুলিশের বর্বরতার এসব খবর পাওয়া গেছে।

অন্য আরেক ঘটনায় অ্যারিজোনার পুলিশ আরেক কৃষ্ণাঙ্গ ডিওন জনসনের মৃত্যুর বিস্তারিত প্রকাশ করেছে। জর্জ ফ্লয়েড মারা যাওয়ার দিন ২৫ মে’তেই অ্যারিজোনার ফিনিক্স শহরে মারা যান জনসন। তাকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করেছিল। পুলিশ এক বিবৃতিতে বলেছে, জনসন চালকের আসনে মাতাল অবস্থায় ছিলেন এবং তার গাড়ীর কারণে যান চলাচল আংশিকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। তার সঙ্গে কথা বলার সময় ধস্তাধস্তি শুরু হলে তাকে গুলি করা হয়। পুলিশের অডিও রেকর্ডিং এবং পরিবহন দফতরের  রেকর্ড করা ভিডিও জনসনের পরিবারের হাতে দেওয়ার সময় এ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। বিক্ষোভ মিছিল থেকে বাসায় ফেরার সময় আটলান্টায় টহল পুলিশের এক কর্মকর্তা যুবতীকে নাজেহাল করার ভিডিও প্রকাশের পর তা নিয়েও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে সারা আমেরিকায়। হ্যান্ডকাপ পরানোর চেষ্টায় সেই যুবতীকে কংক্রিটের রাস্তায় ফেলে দেওয়া এবং গুরুতরভাবে আহত করার দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে পথচারীর সেলফোনে।

হোয়াইট হাউসের রাস্তায় ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ : নোবাহিনী নামিয়ে বিক্ষোভকারীদের দমনের হুমকি দিয়ে কারো সাড়া না পেয়ে হোয়াইট হাউসের চারপাশের বেষ্টনি আরো উঁচু করছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ট্রাম্প গর্জে উঠেন সেনা বাহিনী নামিয়ে মুহূর্তেই আন্দোলন থামিয়ে দিতে। কিন্তু তার সে আহবানে কোন স্টেট গভর্ণর এমনকি ওয়াশিংটন ডিসির মেয়রও সাড়া দেননি। এ নিয়ে হতাশ ট্রাম্প তার বুলি পাল্টান। এমন পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন ডিসির মেয়র মুরিয়েল বাউসার  ফোয়েত পার্কের পাশ দিয়ে হোয়াইটে যাবার পুরো রাস্তায় অনেক বড় করে হলুদ অক্ষরে লেখা হয়েছে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ (কৃষ্ণাঙ্গদের জীবনও মূল্যবান)। শুধু তাই নয়, লেফায়েত পার্কের সামনের স্কোয়ারকে শুক্রবার ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার প্লাজা’ হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে। আর এ পেইন্টিংয়ে অংশ নেন সিটি মেয়র অফিসের স্টাফ এবং স্থানীয় অংকন শিল্পীরা।

দেড় মিলিয়নের স্থলে ১৩ মিলিয়ন ডলার : জর্জ ফ্লয়েডের শিশু সন্তানের লেখাপড়া এবং ফ্লয়েডের কফিন মিনিয়াপলিস থেকে নর্থ ক্যারলিনা হয়ে টেক্সাসের হিউস্টনে নেওয়ার খরচ সংগ্রহ করার অভিপ্রায়ে তার ভাই ফিলনিজ ফ্লয়েড ফেসবুকে ‘গো-ফান্ড মি’ শিরোনামে একটি আহ্বান জানান। ২৭ মে ‘অফিসিয়াল জর্জ ফ্লয়েড মেমরিয়্যাল ফান্ড’ সংগ্রহের এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও বিভিন্ন দেশের পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ শুক্রবার পর্যন্ত ১৩ মিলিয়ন ডলার দিয়েছেন। তার লক্ষ্য ছিল মাত্র দেড় মিলিয়ন ডলারের।

ডালাসে অভিনব দৃশ্য : টেক্সাস স্টেটের ডালাস সিটিতে শুক্রবার বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন সেখানকার পুলিশ কর্মকর্তারাও। তারাও আওয়াজ তুলেছেন পুলিশী আইন ঢেলে সাজানোর। নিন্দা জানিয়েছেন বর্ণ-বৈষম্য এবং বর্ণ-বিদ্বেষমূলক আচরণের। আর এমন ঘটনাকে ঐতিহাসিক হিসেবে অভিহিত করেন ডালাস পুলিশের প্রধান রিনী হল। ‘ব্লু ফর ব্ল্যাক লাইফ মেটার’ শীর্ষক এ মিছিলে অংশগ্রহণের সময় কয়েকজন হাঁটু গেড়ে ফ্লয়েডের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণের প্রতিবাদ জানান। প্রসঙ্গত, ২০ ডলারের একটি জাল নোটে জর্জ ফ্লয়েড সিগারেট কিনেন অভিযোগ পেয়ে মিনিয়াপলিস সিটির টহল পুলিশ অকুস্থলে এসে ফ্লয়েডকে গ্রেফতার করে। এরপর হ্যান্ডকাপ পরা অবস্থায়ই তাকে পুলিশের গাড়িতে উঠানো হয়। সেখানে কয়েক মিনিট বাক-বিতন্ডার এক পর্যায়ে ফ্লয়েডকে গাড়ি থেকে বের করেই ধাক্কা দিয়ে সেই গাড়ির পেছনের চাকার নিকটে ফেলে দেয়। শুধু তাই নয়, ডেরেক চৌভিন (৪৪) নামের পুলিশ কর্মকর্তা তার ঘাড়ে হাটু চেপে ধরেন। ভিডিওটি একজন পথচারি তা ধারণ করেন। প্রায় ৯ মিনিটের মতো চেয়ে ছিলেন ফ্লয়েডকে। প্রথম পৌণে তিন মিনিটেই ফ্লয়েড নিস্তেজ হয়ে পড়েছিলেন। এই ঘটনা মানবতাকে ব্যাপকভাবে নাড়া দেয় এবং ২৬ মে থেকেই সারা আমেরিকায় বিক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। গণআন্দোলনের মুখে ২৯ মে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা চৌভিনকে বরখাস্তের পর গ্রেফতার করা হয়। এরপর থার্ড ডিগ্রির হত্যা মামলায় তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু দেশ-বিদেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ায় কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে সেই অভিযোগ উন্নীত করে সেকেন্ড ডিগ্রিতে নেয়। একই সঙ্গে বর্বরোচিত আচরণের সময় সেখানে থাকা অপর তিন পুলিশ কর্মকর্তাকেও বরখাস্তের পর সেকেন্ড ডিগ্রি হত্যা মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। তারা চারজনই মাথাপিছু মিলিয়ন ডলারের জামিন লাভ করলেও দৃশ্যত কারাগার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত মুক্তি পাননি।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর