শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ১ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১ জুলাই, ২০২০ ০০:০৯

লঞ্চ উদ্ধার অভিযান শেষ

আরও এক কিশোরের লাশ উদ্ধার, সাতজনকে আসামি করে মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক

লঞ্চ উদ্ধার অভিযান শেষ
ডুবে যাওয়া মর্নিং বার্ড লঞ্চটিকে গতকাল টেনে তোলা হয় -বাংলাদেশ প্রতিদিন

প্রায় ২৭ ঘণ্টা ধরে চলে শ্বাসরুদ্ধকর উদ্ধার অভিযান। অভিযানের দ্বিতীয় দিনে গতকাল উদ্ধার করা হয় বুড়িগঙ্গায় ডুবে যাওয়া হতভাগ্য লঞ্চ মর্নিং বার্ড। নদীর মাঝখানে প্রায় ৪০ ফুট গভীরে থাকা লঞ্চটির সঙ্গে এয়ার লিফটিং ব্যাগ বেঁধে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ভাসিয়ে তোলা হয় ওপরে। এ সময় গত সোমবার ডুবে যাওয়া ওই লঞ্চের ভিতরে আরও একজনের লাশ পাওয়া যায়। এর প্রায় ৪ ঘণ্টা পর ভেসে ওঠে আরেকটি লাশ। গতকাল বিকাল ৫টায় লঞ্চটির পাশে ওই লাশ ভেসে উঠতে দেখা যায়। এ নিয়ে লঞ্চডুবিতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৩৪-এ। এর আগে দুপুরেই উদ্ধারকাজ স্থগিত করার ঘোষণা দেয় বিআইডব্লিউটিএ। এদিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে যথাযথভাবে কাজ করে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে তদন্ত কমিটি। সোমবার রাতে ময়ূর-২-এর মালিকসহ সাতজনের নাম উল্লেখ করে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় একটি মামলা করেছে নৌপুলিশ।

গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে টাগ বোট দিয়ে ডুবে যাওয়া লঞ্চটি টেনে তোলার চেষ্টা করে বিআইডব্লিউটিএ ও ফায়ার সার্ভিস। দুই ঘণ্টা চেষ্টার পর ওপরের দিকে জাগানো সম্ভব হয় লঞ্চটিকে। ভাসিয়ে তোলার পর দুপুরে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) উদ্ধারকারী ছোট জাহাজ ‘দুরন্ত’ রশি দিয়ে লঞ্চটি সদরঘাটের ওপারে খেজুরবাগ ঘাট এলাকায় টেনে নিয়ে যায়। এরপর ভিতরে শুরু হয় তল্লাশি। এ সময় ভিতরে আটকে থাকা এক কিশোরের লাশ পাওয়া যায়। এর কিছু পর বেলা আড়াইটার দিকে উদ্ধার তৎপরতা স্থগিতের ঘোষণা করা হয়।

উদ্ধারকারীরা বলছেন, লঞ্চটি উল্টে ছিল পানির নিচে। বেলা সাড়ে ১১টায় সেটিকে ভাসিয়ে তোলা হয়। পরে লঞ্চটিতে দুপুর পৌনে ১টার দিকে একটি লাশ পাওয়া যায়। তবে তৎক্ষণাৎ তার নাম-পরিচয় জানা যায়নি। এর আগে সন্দেহ হলে তারা ইঞ্জিনরুমে তল্লাশি চালান। সেখানেই পাওয়া যায় আটকে থাকা লাশটি।

উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক মোস্তফা মোহসীন জানান, লঞ্চটিকে পানির ওপরে তোলার পর ভিতরে তল্লাশি করা হয়। দুপুরে অজ্ঞাত একজনের লাশ পাওয়ার পরই তা স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়।

বিকালে সর্বশেষ উদ্ধার হওয়া লাশের বিষয়ে নৌপুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার আজাদ হোসেন বলেন, ওই ব্যক্তির বয়স আনুমানিক ৪০।

বিআইডব্লিউটিএর যুগ্মপরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন জানান, উদ্ধারকারী জাহাজ ‘প্রত্যয়’ সোমবার পোস্তগোলা ব্রিজে আটকে যাওয়ায় আসতে না পেরে ফিরে যায়। লঞ্চটিকে পুরোপুরি ভাসানো সম্ভব হয়নি, তবে টেনে কেরানীগঞ্জ প্রান্তে রাখা হয়েছে। বেলা আড়াইটার দিকে উদ্ধার অভিযান স্থগিত করা হয়।

লঞ্চ দুর্ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান রফিকুল ইসলাম খান জানান, দুর্ঘটনার প্রাথমিক তদন্ত শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা হয়েছে। গতকাল বিকাল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয় বলে জানান তিনি। আজ বেলা ১১টা থেকে দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীদের আরেক দফা সাক্ষাৎকার নেওয়ার কথা রয়েছে। নির্ধারিত সময়েই তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার কথা জানান কমিটির প্রধান।

সোমবার সকালে সামনে থাকা মর্নিং বার্ড নামে লঞ্চটিকে পেছন দিক দিয়ে ধাক্কা দেয় চাঁদপুরগামী ময়ূর-২। কয়েক সেকেন্ডে লঞ্চটি ডুবে যায়। এ ঘটনায় ময়ূর-২-এর মালিক মোসাদ্দেক হামিদ ফোয়াদ, মাস্টার আবুল বাশার, জাকির হোসেন, স্টাফ শিপন হাওলাদার, শাকিল হোসেন, হৃদয়, সুকানি নাসির মৃধার নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও পাঁচ-ছয় জনের বিরুদ্ধে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় একটি মামলা করেন নৌপুলিশের এসআই শামসুল আলম। এখনো কোনো আসামি গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

নৌপুলিশের এসপি (ঢাকা অঞ্চল) ফরিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, সোমবার রাত আড়াইটায় মামলাটি হয়। যাদের আসামি করা হয়েছে তাদের ঠিকানা সংগ্রহ করে অভিযান চালানো হয়েছে। তারা সবাই পলাতক। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নেওয়া হয়েছে। তারা দেশের যেখানেই থাকুন না কেন আমরা ধরে ফেলব। লঞ্চটি আমরা আলামত হিসেবে জব্দ করেছি।

মুন্সীগঞ্জে স্বজন হারাদের আর্তনাদ, নিখোঁজের সন্ধান মেলেনি এখনো কেউবা ডাক্তার দেখাতে, আবার কেউ যাচ্ছিলেন কর্মস্থলে, কারও উদ্দেশ্য ছিল স্বজনদের সঙ্গে দেখা করা, একটু আনন্দ ভাগাভাগি করা। সব আশা যেন এক মুহূর্তেই কেড়ে নিল ভয়াবহ লঞ্চ দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনার পর নদীর তলদেশ থেকে একে একে উদ্ধার হয় ৩৩টি লাশ। যাদের মধ্যে ৩১ জনের বাড়িই মুন্সীগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকায়। এখনো সন্ধান মেলেনি একাধিক স্বজনের। তাই তাদের ভোটার আইডি বা ছবি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তারা। এদিকে স্বজনহারা পরিবারগুলোতে চলছে শোকের মাতম। স্বজন হারিয়ে কেউ কেউ দিশাহারা হয়ে পাগলের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছেন। মানতে পারছেন না এভাবে মৃত্যুর কবলে পড়তে হবে প্রিয় মানুষগুলোকে। এত লাশের মধ্যে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন একাধিক নারী-পুরুষ। কী ঘটেছে তাদের ভাগ্যে, জানা নেই তাদের। তাই নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে বুড়িগঙ্গা তীরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ছবি আর জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে।

উদ্ধার হওয়া ৩৩ লাশের মধ্যে ৩১ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা সবাই মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা।  ৩১ জনের মধ্যে সদর উপজেলায় ২০ জন, টঙ্গিবাড়ী উপজেলায় ১০ জন এবং শ্রীনগর উপজেলার একজন রয়েছেন। সদরের অধিকাংশ মৃত ব্যক্তি মিরকাদিম পৌরসভা ও রামপাল ইউনিয়নের বাসিন্দা। সোমবার সকাল পৌনে ৮টায় মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিমের কাঠপট্টি ঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়া যাত্রীবাহী মর্নিং বার্ড লঞ্চটি শতাধিক যাত্রী নিয়ে সদরঘাটের ফরাশগঞ্জ এলাকায় সোয়া ৯টার দিকে ময়ূর-২ নামের লঞ্চের ধাক্কায় ডুবে যায়। নিখোঁজ আবদুর রহমান বেপারির (৪৫) ছেলে হাছিবুর রহমান হাছিব জানান, লকডাউনের ফলে আটকে যাওয়া বাসাভাড়া মাফ করার লক্ষ্যে ঢাকায় যাচ্ছিলেন বাবা আবদুর রহমান। পথিমধ্যে লঞ্চ দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। তার আর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে আসা ফকির চাঁন জানান, তিনি ঢাকায় যমুনা ব্যাংকে চাকরি করেন। প্রতিদিনের মতো কর্মস্থলে যাচ্ছিলেন তিনি ও তার সঙ্গে আরও একজন লঞ্চে করে ঢাকায় যাচ্ছিলেন। তিনি লঞ্চে বিকট একটি শব্দ শুনতে পেলেন। মুহূর্তেই লঞ্চটি পানিতে চলে গেল। পানিতে ডুবন্ত অবস্থায় সূর্যের আলো  দেখতে পাচ্ছিলেন। তিনি কোনোরকমে সেখান থেকে বেড়িয়ে আসেন। তবে তার সঙ্গে থাকা ওই ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। ভাগ্যগুণে বেঁচে যান তিনি। আর এক যাত্রী নাজমা আক্তার বলেন, তিনি চিকিৎসা নেওয়ার জন্য ঢাকায় যাচ্ছিলেন। লঞ্চটি যে পাশ দিয়ে ডুবেছিল তার বিপরীত পাশের জানালা দিয়ে বেড়িয়ে আসেন তিনি। তিনি বলেন, চোখের সামনে পরিচিত মুখগুলো মুহূর্তে লাশ হলো। মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক মনিরুজ্জামান তালুকদার বলেন, কতজন যাত্রী মারা গেছেন, কতজন জীবিত ফিরেছেন এমন সঠিক তথ্য এ মুহূর্তে তার কাছে নেই। তবে যারা মারা গেছেন তাদের পরিবারকে সরকারিভাবে যতটুকু সহযোগিতা করা যায় সেটা করা হবে। নিখোঁজদের তালিকা করে তাদের সন্ধান করা হবে। তবে লঞ্চে ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী নেওয়া হলে এবং ফিটনেস ঠিক না থাকলে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর