শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৭ জুলাই, ২০২০ ০০:১৩

মানব পাচারের আরেক ভয়ঙ্কর ফাঁদ

আমেরিকার কথা বলে ভারতে

মাহবুব মমতাজী

ফরিদ উদ্দিন মজুমদারের যাওয়ার কথা ছিল যুক্তরাষ্ট্রে। দুই বছর পর তার পরিবার জানতে পারে আসলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে নেই, আছেন পাশের দেশ ভারতে। অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে তিনি উত্তর প্রদেশের গৌতম বুধ নগর জেলা কারাগারে আটক আছেন। সেখানেই প্রায় ৫ বছর কারাভোগ শেষে চলতি বছরের গত ১০ জানুয়ারি দেশে ফেরেন ফরিদ। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে। 

ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) জানতে পারে, ২০১৫ সালের ৭ আগস্ট ফরিদ ছাড়াও আরও ১৭ জনকে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলে পাঠানোর কথা বলে ভারতে নিয়েছিল মানব পাচারকারীরা। পাচারের শিকার ফরিদসহ অন্তত ৫ বাংলাদেশি গৌতম বুধ নগর জেলা কারাগারেই বন্দী ছিলেন। এই পাচারকারী সিন্ডিকেটের হোতা আক্তারুজ্জামান তালুকদার। তিনি সিলেট কিং ইন্টারন্যাশনালের মালিক। থাকেন দিল্লির নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার মাজারের আশপাশে। তার পুরো পরিবার এখন সেখানে। শুধু শ্বশুরবাড়ির লোকজন থাকেন বাংলাদেশে। তার অধীনে সারা দেশে অনেক ব্রোকার আছে। এ ছাড়াও ১৮ জনকে আমেরিকার কথা বলে ভারতে পাচারে জড়িত আছেন জয়নাল আবেদীন, মহিউদ্দিন ও পারভেজ আলম সাজু। চলতি বছরের শুরুতে জয়নাল আর মহিউদ্দিনকে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করে পিবিআই। এর মধ্যে জয়নাল ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। ২০১৭ সালে পাচারের শিকার এক বাংলাদেশিকে ভারতে কারাগারে দেখতে যান তার বাবা। ওই ব্যক্তির মাধ্যমে ফরিদ তার বাবা আবদুস ছাত্তারের কাছে হাতে লেখা একটি চিঠি পাঠান। সেই চিঠির মাধ্যমেই ছাত্তার জানতে পারেন- তার ছেলে যুক্তরাষ্ট্রে যায়নি। আছে ভারতের কারাগারে বন্দী। আবদুস ছাত্তার ছেলের খোঁজ নিতে জয়নাল আবেদীন ও মহিউদ্দিনের বাড়িতে ছুটে যান। তখন তারা জানান- তার ছেলে উত্তর প্রদেশে কারাগারে আটক আছে। তাকে ছাড়াতে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ লাগবে। পরে যোগাযোগ করলে আক্তারুজ্জামান তালুকদার জামিনে আনার কথা বলে ২ লাখ টাকা নেয়। অথচ তিনি ফরিদের আর জামিন করাননি।  এ ঘটনায় ২০১৭ সালের ৭ মার্চ ৪ জনকে আসামি করে কুমিল্লার আদালতে একটি মামলা করেন আবদুস ছাত্তার। পরে আদালত সেটি নাঙ্গলকোট থানায় পাঠিয়ে দেয় এবং মামলার তদন্ত শুরু করে পিবিআই। তদন্তে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ইমিগ্রেশন এবং এনসিবির মাধ্যমে ফরিদের তথ্য জানার জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানান। প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করে তদন্ত কর্মকর্তারা কারাগারে ফরিদের আটক থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হন। এরপর সেখানে গিয়ে ফরিদের সঙ্গে দেখা করেও কথা বলেন এবং তাকে মুক্ত করে ফিরিয়ে আনার আইনগত প্রচেষ্টাও চালান। চলতি বছরের ৫ মার্চ সংস্থাটির কুমিল্লা জেলা ইউনিটের পরিদর্শক মতিউর রহমান মামলার চার্জশিট দাখিল করেন। তবে এক কারাগারে ৫ জনের খোঁজ মিললেও অন্যরা কে কোথায় কোন কারাগারে আটক আছেন সে সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত এখনো সংগ্রহ করতে পারেননি তদন্ত কর্মকর্তারা। তারা তদন্ত করে জানতে পারেন, জয়নাল আবেদীনের ভাই যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে লোক নেন বলে ফরিদকে তিনি জানান। আর সেখানে যেতে ১০ লাখ টাকা খরচ হবে। এরমধ্যে ৭ লাখ টাকা আগে দিতে হবে, আর বাকি ৩ লাখ টাকা ওইদেশে গিয়ে দিতে হবে বলেও জানানো হয়। ভাই আক্তার হোসেনকে বিদেশে পাঠানোর সুবাদে আক্তারুজ্জামান তালুকদারের সঙ্গে পরিচয় হয় জয়নালের। তখন আক্তারুজ্জামান তালুকদারের সিলেট কিং ইন্টারন্যাশনালের অফিস ছিল রাজধানীর বনশ্রী কেন্দ্রীয় মসজিদের কাছে সি-ব্লকের মেইন রোডে অবস্থিত সাউথ ইস্ট ব্যাংক ভবনের তৃতীয় তলায়। ওই অফিসে ইলিয়াস, সেলিম, সাজু ও সিরাজ ব্রোকার হিসেবে কাজ করতেন। ফরিদকেও এই অফিসে নিয়ে আসেন জয়নাল। প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের কথা বললেও পরে ব্রাজিলে পাঠানো হবে বলে জানানো হয়। ফরিদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার জন্য আক্তারুজ্জামান তালুকদারের ওই অফিস থেকে জয়নালকে ৫০ হাজার টাকাও দেওয়া হয়েছিল। ওই বছরের ৭ আগস্ট ফরিদসহ মোট ১৮ জনকে রাজধানীর শ্যামলী থেকে বাসে করে হিলি স্থলবন্দরে নেওয়া হয়। সেখানে একটি হোটেলে থাকার পরদিন সীমান্ত পার করিয়ে ভারতে কলকাতায় নিয়ে যান আক্তারুজ্জামান তালুকদার। কলকতায় স্বর্ণ মজুমদার নামে এক ব্যক্তির বাসায় রাখেন। এরপর ছোট ছোট দলে ভাগ করে ট্রেনে করে দিল্লি এবং উত্তর প্রদেশে নেওয়া হয়। দিল্লিতে কয়েকটি বাসায় ৭/৮ জনে ভাগ করে রাখা হয়। এরপর ফরিদসহ অন্যদের অবৈধভাবে অনুপ্রবেশের অভিযোগ দিয়ে ভারতীয় পুলিশের হাতে তুলে দেন আক্তারুজ্জামান। সিলেট কিং ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সির নাম ব্যবহার করে কৌশলে বিদেশে যাওয়ার লোভ দিয়ে ভারতে পাচার করে মোটা অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করতেন।

পিবিআইর প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার এ প্রতিবেদককে জানান, নতুন কৌশলে পাচারকারী এই সিন্ডিকেটের হোতাকে তারা চিহ্নিত করতে পেরেছেন। যথাযথ প্রক্রিয়ায় তাকে গ্রেফতার করতে তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। আর কেউ এ ধরনের পাচার হয়ে ভারতের কারাগারগুলোতে বন্দী আছে কিনা সেসব বিষয়েও তথ্য-উপাত্ত নেওয়া হচ্ছে।

 


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর