শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৭ জুলাই, ২০২০ ০০:১৬

জীবন-জীবিকা নিয়ে বিপাকে মানুষ

বেড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বাস ভাড়া, বিদ্যুৎ পানির বিল দ্বিগুণ, যাচ্ছে সরকারি-বেসরকারি চাকরি

মানিক মুনতাসির

জীবন-জীবিকা নিয়ে বিপাকে মানুষ
বেচা-বিক্রি কমে গেছে দোকানে -বাংলাদেশ প্রতিদিন

রাজধানী ঢাকা, বন্দর নগরী চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জসহ সারা দেশের মানুষ উপার্জন নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। জীবন বাজি রেখে জীবিকার জন্য কাজে যাচ্ছে মানুষ। কিন্তু মহামারী করোনার আঘাতে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পসহ সামগ্রিক উৎপাদন ও অর্থনীতি ধসে পড়েছে। ফলে ৭০ ভাগ মানুষের উপার্জন কমে গেছে। অথচ কমেনি জীবনযাত্রার ব্যয়। উল্টো মানুষের উপার্জন কমলেও বেড়েছে জীবনযাত্রার খরচ। কেননা গত কয়েক মাসে অব্যাহতভাবে বেড়েছে চাল, ডাল, তেলসহ প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্য, মাছ, মাংস ও শাকসবজির দাম। এরই মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার যুক্তি দেখিয়ে দ্বিগুণ করা হয়েছে বাস ভাড়া। বেড়েছে  রিকশা ভাড়াও। মিটারে যায় না কোনো সিএনজি অটোরিকশা। ফলে সেখানেও বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে। মধ্যবিত্তের চলাফেরার ভরসা হয়ে আসা উবার, পাঠাও প্রায় বন্ধই রয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে এসব রাইড শেয়ারিং সেবা চালু করা হয়েছে নামেমাত্র। এতে মানুষের যাতায়াত খরচ দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আবার বর্ধিত পানির বিলও পরিশোধ করতে হচ্ছে। এদিকে টানা দুই মাসের বেশি সাধারণ ছুটি থাকার সময় বিদ্যুৎ মিটারের রিডিং না নিয়েই অনুমাননির্ভর ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল ঠুকে দেওয়া হয়েছে গ্রাহকদের নামে। সারা দেশের মানুষ বিদ্যুৎ বিল নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। যার বিল হওয়ার কথা ৫০০ টাকা, তার বিল এসেছে দুই হাজার টাকা। আবার ভুতুড়ে এই বিদ্যুৎ বিলের ব্যাপারে বিদ্যুৎ অফিসে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না গ্রাহক। আবার বিল পরিশোধের জন্য বারবার নোটিস করছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এতে বাধ্য হয়ে সেই বাড়তি ভুতুড়ে বিলই জমা দিতে হচ্ছে। যদিও এর জের ধরে ইতিমধ্যে বিদ্যুৎ বিভাগের কিছু কর্মকর্তাকে শোকজ করা হয়েছে। বাড়তি বিদ্যুৎ সমন্বয়ের ঘোষণাও করা হয়েছে। কিন্তু এটা আসলে আদৌ সমন্বয় হবে কিনা-তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন গ্রাহকরা।

এদিকে কভিড-১৯ এর প্রভাবে অচল হয়ে পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাত। বিপুল পরিমাণ লোকসান গুনছেন উদ্যোক্তারা। ফলে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে কস্ট কাটিংয়ের পথে হাঁটছেন অনেকেই। এর ফলে চাকরি হারাচ্ছেন অনেকেই। আবার রোজগার কমে যাওয়ায় যেমন বিপাকে পড়েছে মানুষ, তেমন চাকরি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী। অনেকেই নিয়মিত বাসা ভাড়া পরিশোধ করতে পারছেন না। মানুষ বাসা ছেড়ে দিচ্ছে। ফলে ইতিমধ্যে বিপুলসংখ্যক বাসা খালি হয়ে গেছে। কেউ কেউ বাসা বদলে অপেক্ষাকৃত কম খরচের বাসায় যাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার ঢাকা ছেড়ে গ্রামেই চলে যাচ্ছেন। বাড়ি ভাড়ার ওপর নির্ভরশীল অনেক বাড়ির মালিকও পড়েছেন বিপাকে।

এদিকে বর্ধিত পানির বিলের ওপর হাই কোর্টের স্থগিতাদেশ তুলে নেওয়ায় এখন থেকে দিতে হবে বর্ধিত বিলও। যা রাজধানীবাসীর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কভিড-১৯ এর প্রকোপে গত কয়েক মাসে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। স্বাস্থ্যবিধি মানতে গিয়েও খরচ বেড়েছে। অথচ আয় বাড়েনি। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিপিআরসির হিসাবে করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে ৭০ ভাগ মানুষের আয় কমে গেছে। আর দরিদ্রের হার অন্তত ৫ শতাংশ বেড়েছে বলে ধারণা করছে পিপিআরসি। জানা গেছে, করোনাভাইরাসের প্রভাবে কাজ হারানোর পর এখন বাসস্থানও হারানো শুরু করেছে মানুষ। অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের হাত ধরে মানবিক বিপর্যয় নিয়ে এসেছে করোনাভাইরাস। অনিশ্চিত জীবন নিয়ে ঢাকা ছেড়েছে বহুজন। ভাড়ার আয় বন্ধ হওয়ায় বিপাকে আছেন অনেক বাড়িওয়ালা। তবে এই বিপদ শুধু ভাড়াটিয়া আর বাড়ির মালিকেরই নয়, বরং গোটা অর্থনীতির।

বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা, শহর ছাড়ার পথ ধরেই দীর্ঘস্থায়ী হবে দেশের বেকার সমস্যা। কারণ অনেক মানুষ আছেন যারা বাসা ছেড়েছেন। আবার তাদের যাওয়ারও জায়গা নেই। গ্রামে বাবার ভিটায় ফিরে গেলেও কাজ পাবে কিনা-তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। আবার অনেকের তো বাবার ভিটেবাড়িও নেই। ঢাকায় ফুটপাথে ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করত। থাকত ভাড়া বাসায়। তাদের অনেকেই এখন ঢাকার ভাড়া বাসা ছেড়ে গ্রামে চলে যাচ্ছেন। এর ফলে ঢাকার আবাসিক এলাকার দেয়ালগুলো ঢেকে গেছে টু-লেট বিজ্ঞপ্তিতে। এর মাত্রা বাড়ছে প্রতিদিনই। জীবন-জীবিকার লড়াইয়ে টিকতে না পেরে ভাড়া বাসা ছাড়ার দিন গুনছেন নতুন অনেকেই। ভাড়াটিয়া পরিষদ বলছে, কাজ হারিয়ে ইতিমধ্যে অন্তত ৫০ হাজার মানুষ ঢাকা ছেড়েছে। তাদের প্রত্যেকের প্রত্যক্ষ অবদানে ভর করেই দ্রুত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির স্বপ্ন দেখছিল বাংলাদেশ। কিন্তু সেটা ছিল না মোটেই টেকসই পদ্ধতি।

জানা গেছে, বাংলাদেশের মানুষের আয় কমেছে অর্ধেকেরও বেশি। কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় উল্টো আরও বেড়েছে। কেননা স্বাস্থ্য পরিচর্যা আর স্বাস্থ্যবিধি মানতে গিয়ে মানুুষের দৈনন্দিন খরচ বেড়েছে। অন্যদিকে বাস ভাড়া, রিকশা ভাড়াসহ প্রায় সব ধরনের যাতায়াত খরচ বেড়েছে। একইভাবে জরুরি ওষুধ, ভোগ্যপণ্যসহ প্রায় সব ধরনের জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। দুই মাস আগে গরিবের ডাল ভাতের সঙ্গী মোটা মসুর ডাল ছিল ৬০ টাকা কেজি। এখন সেটা ৮০ টাকা। আর এ সময়ে মোটা চালের দামও বেড়েছে কেজিতে ১০ টাকা পর্যন্ত। এমনকি হাত ধোয়ার লিকুইড সাবান ও কাপড় বিভিন্ন স্যানিটাইজারের দামও অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। ফলে সাধারণ মানুষে জীবন ও জীবিকার হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। অনেকেই আবার সঞ্চয় ভেঙে সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করছে। ফলে অনেক মানুষই রাজধানী ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে যাচ্ছে। এদিকে খোদ সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএস বলছে, করোনাভাইরাস মহামারীর আঘাতে অন্তত ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে। আর বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ব্র্যাক ও পিপিআরসি বলছে, আগে দেশের ২০ শতাংশ মানুষ দরিদ্র ছিল। এখন সেটা আরও ৫ শতাংশ বেড়ে ২৫ শতাংশে উঠেছে। সামনের দিনে এই সংখ্যা আরও বাড়বে বলে মনে করে সংস্থা দুুটি। ফলে করোনা-পরবর্তী সময়ে মানুষের কাজের সুযোগ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষকে কাজ দিতে না পারলে দারিদ্র্যসীমার ভয়াবহতার দিকে এগিয়ে যাবে। এতে আমাদের সব ধরনের উন্নয়ন কার্যক্রমই বাধাগ্রস্ত হবে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ও ব্র্যাকের চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, করোনাভাইরাস মহামারীর এই সংকটে সবাই এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। মানুষ সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় পড়েছে জীবন ও জীবিকা নিয়ে। আবার এরই মধ্যে মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে কর্ম হারানোর আতঙ্ক। ফলে মানুষ এখন চরম উদ্বিগ্ন। তিনি আরও বলেন, এই মহামারীতে আমরা শুধু অর্থনৈতিক ধাক্কার কথাই বলছি কিন্তু হিউম্যান ক্যাপিটাল ধাক্কার কথা বলছি না। বহু মানুষ তাদের কাজ, আবাসস্থল থেকে ড্রপআউট হয়ে যাচ্ছে। তাদের তো আবার ফেরাতে হবে। এটা নিয়ে ভাবতে হবে। না হলে তো আবারও আমরা দরিদ্র দেশেই পরিণত হব। নতুন করে যারা দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে তাদের নিয়ে ভাবতে হবে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, মানুষ বহুমাত্রিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। সবচেয়ে বড় সংকট হলো জীবন এবং জীবিকার। যারা কর্ম হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন আর কর্ম হারিয়েছেন তারা আবার নতুন করে দরিদ্রের খাতায় নাম লেখাচ্ছেন। ফলে সামনের দিকে দারিদ্র্যের হার বেড়ে যাবে। এটা থেকে বের হতে অনেক সময়ের প্রয়োজন হবে বলে তিনি মনে করেন।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর