শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৭ জুলাই, ২০২০ ০০:১৭

ডব্লিউটিসির নৈরাজ্য

নিজস্ব লাইটার জাহাজে পণ্য পরিবহনে বাধায় আতঙ্কে আমদানিকারকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও চট্টগ্রাম

নাব্য কম হওয়ার কারণে দূর সমুদ্রে মাদার ভেসেল নোঙর করা হয়। আর সেই জাহাজ থেকে আমদানি করা পণ্য ছোট বা লাইটার জাহাজে দেশের ৩৭টি ঘাট ও শিল্প মালিকদের কারখানা ঘাটে নিয়ে খালাস করা হয়। এসব পণ্যের বড় অংশ সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামাল, ইস্পাতের কাঁচামাল, কয়লা, সার ও ভোগ্য পণ্য। তবে উপকূল অতিক্রমের অনুমতিপত্র থাকার পরও মালবাহী নৌযানকে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের (ডব্লিউটিসি) ছাড়পত্র নেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করায় অভ্যন্তরীণ রুটে পণ্য পরিবহনে নৈরাজ্য দেখা দিয়েছে। ডব্লিউটিসির এই নৈরাজ্যে অভ্যন্তরীণ নৌরুটে পণ্য পরিবহনে বিশৃঙ্খলা ও সাপ্লাই চেন ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নিজেদের লাইটার জাহাজের পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা থাকলেও অন্যের মুখ চেয়ে থাকতে হচ্ছে শিল্প উদ্যোক্তা ও আমদানিকারকদের।

সূত্র জানায়, উদ্যোক্তাদের আমদানি পণ্য নিজেদের জাহাজে নিজ কারখানায় পরিবহনে বাঁধা দিচ্ছে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল (ডব্লিউটিসি)। কর্ণফুলী নদী থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন নৌঘাটে নিয়ে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। লাইসেন্স ও পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ছিনিয়ে নিয়ে জাহাজ আটক করা হচ্ছে। এ ধরনের বেপরোয়া কর্মকাে  নদীপথে পণ্য পরিবহনে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। বাধা পাচ্ছে ভোগ্যপণ্য ও শিল্প কারখানার পণ্য। সূত্র জানায়, ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের এই নৈরাজ্যের মূলে রয়েছে নৌপরিবহন অধিদফতরের এক আদেশ। গত ৪ জুন জারি করা মহাপরিচালক কমোডর সৈয়দ আরিফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই সার্কুলারে বলা হয়, অভ্যন্তরীণ মালবাহী নৌযানসমূহের অনুকূলে উপকূল অতিক্রমের অনুমতিপত্র (বে-ক্রসিং) থাকা সত্ত্বেও যদি কোনো অভ্যন্তরীণ মালবাহী নৌযান ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের ছাড়পত্র ব্যতীত মালামাল পরিবহন করে তাহলে ওইসব মালবাহী নৌযানের মালিক ও এজেন্টদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হবে।

অভিযোগ উঠেছে, নিজেদের নিয়ন্ত্রণ খর্ব হয়ে যাওয়ায় জোর করে সব লাইটার জাহাজ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের অধীনে নিয়ে আসার চক্রান্ত চলছে। অথচ সংস্থাটির নেতারাই ডব্লিউটিসির বাইরে জাহাজ চালাচ্ছেন। অধিদফতরের আদেশ পেয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন ডব্লিউটিসি নেতারা। এর আগে ২৯ জুন নৌপরিবহন অধিদফতরের মহাপরিচালকের সঙ্গে বৈঠক করেন শিল্প মালিক ও বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার অ্যাসোসিয়েশন। এ সময় মাদার ভেসেল থেকে ডব্লিউটিসির মাধ্যমে লাইটার জাহাজে পণ্য খালাসের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরা হয়। আমদানিকারকরা বলেন, কোনো মালিকের জাহাজ কি কার্গো লোড করবে তার জন্য উব্লিউটিসি ও মালিকরাই যথেষ্ট। নৌপরিবহন অধিদফতরের মহাপরিচালকের কারও পক্ষ নেওয়ার দরকার নেই। জানা যায়, মাদার ভেসেলের জন্য ডব্লিউটিসি থেকে ভাড়া করা জাহাজে নানা সমস্যা। ভাড়া বেশি হলেও লাইটার জাহাজসমূহ ক্রটিপূর্ণ ও মানহীন। বীমা নেই। জাহাজের মাস্টার ও নাবিকদের অনেকে কার্গো চুরিতে যুক্ত। অভিযোগ করার পরও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। আমদানিকারকরা বলছেন, লাইটার জাহাজ চাওয়া হলে যথাসময়ে পাওয়া যায় না। ডব্লিউটিসির অনীহার কারণে মাদার ভেসেলকে বসিয়ে রেখে খোয়াতে হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা। এতে বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে। আমদানি ব্যয় বাড়ায় চাপ পড়ছে ভোক্তার ওপর। নদীপথে পণ্য পরিবহনে ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা আনতে জাহাজ মালিকদের সংগঠনগুলো ২০০৩ সালে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল গঠন করে। পণ্য পরিবহনে ডব্লিউটিসি থেকে লাইটার জাহাজ ভাড়া নিতে হতো। ২০১৩ সালে লাইটার জাহাজের চরম সংকটে একটি জাহাজ বরাদ্দ পেতে একমাসের বেশি সময় অপেক্ষায় থাকতে হতো। ঠিকমতো লাইটার জাহাজ বরাদ্দ না পেয়ে পণ্য পরিবহনে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন দেশের বড় শিল্প গ্রুপগুলো। তখন অন্তত ২৫ শিল্প মালিক নিজেদের বিনিয়োগে ছোট জাহাজ তৈরি করেন। একেকটি জাহাজ তৈরিতে খরচ হয় ১০ কোটি টাকার বেশি। তখন থেকেই নিজেদের জাহাজেই নিজেদের পণ্য পরিবহন শুরু করেন জাহাজ মালিকরা। ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের ছাড়পত্র ছাড়া মালামাল পরিবহন করা যাবে না- এই মর্মে সার্কুলার জারি করায় কোটি কোটি টাকা খরচ করে লাইটার জাহাজ বানিয়েও পণ্য আনতে বাধা পাচ্ছেন শিল্প উদ্যোক্তারা। এই অবস্থায় ডব্লিউটিসির ছাড়পত্র ছাড়া লাইটার জাহাজে পণ্য খালাস না করার আদেশ বাতিল করতে সম্প্রতি নৌপরিবহন অধিদফতরে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমএ) নৌপরিবহন অধিদফতরের মহাপরিচালককে পাঠানো চিঠিতে বলেছে, ডব্লিউটিসির অদক্ষতা ও উপকূল বাণিজ্য জ্ঞানের অভাবে তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে লাইটার জাহাজের মাস্টারদের ওপর ডব্লিউটিসির কোনো কর্তৃত্ব নেই। তাদের অদক্ষতায় পণ্য পরিবহনের সাপ্লাই চেন বাধা পাচ্ছে। বাড়তি ব্যয়ের কারণে স্থানীয় বাজারে পণ্যের বেশি দাম পড়ছে। আমদানিকারকরাও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। অনিয়মের কারণে ডব্লিউটিসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সময়ের দাবি হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। দেশের বড় ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী বলছেন, লাইটার জাহাজ বরাদ্দ পেতে ভয়ানক সংকটের সময় বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছিলাম। তখন বাধ্য হয়ে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে লাইটার জাহাজ কেনা হয়। এসব জাহাজে নিজেদের পণ্যই পরিবহন করি। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে যা করা হচ্ছে তাতে আমাদের পক্ষে আর পণ্য পরিবহন চালু রাখা সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কায় আছি। পদে পদে হয়রানি করা হচ্ছে। নির্ধারিত গন্তব্যে ভোগ্যপণ্য পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। পণ্য পরিবহনের সাপ্লাই চেন ব্যাহত হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রামের এক জাহাজ মালিক বলেন, গতকাল কর্ণফুলী নদীর ১৫ নম্বর ঘাটে গিয়ে একদল লোক লাঠিসোটা নিয়ে জাহাজ কর্মীদের হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। জাহাজে উঠে ডব্লিউটিসির ছাড়পত্র চাইছে; গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ছিনিয়ে নিচ্ছে। এটা হতে পারে না। এটাকে আমি বলব নৈরাজ্য। তিনি বলেন, ডব্লিউটিসির শীর্ষ নেতারাই জাহাজের সিরিয়াল মানে না। আগে নেতাদের জাহাজ সিরিয়ালে আনতে হবে। তারপরই শৃঙ্খলা ফিরবে। প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলসের এমডি আমিরুল হক বলছেন, পণ্য পরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের প্রয়োজন আছে; কিন্তু নীতিমালা ঠিক করে সব স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে এটি পরিচালনা করতে হবে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর