শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ২৩:২৯

হাসপাতালে স্বজনদের আহাজারি রোগীদের আর্তনাদ

মাহবুব মমতাজী

শেফালি বেগম তখনো তার স্বামী কাঞ্চন হাওলাদারের (৫০) মুখটা দেখেননি। শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের ঠিক কোন জায়গায় কাঞ্চন আছেন তাও জানেন না। খুলনা থেকে স্বামীর খবরে বার্ন ইনস্টিটিউটে এলেও তখনো জানেন না কেমন আছেন তার প্রিয়জন। বাইরে থেকে স্বামীকে একটিবার দেখার কত যে চেষ্টা স্ত্রীর! আহাজারি করতে করতে বলেন, ‘আমাকে ভিতরে যেতে দিচ্ছে না। আমি একটু দেখব।’ শেফালি একা নন। শুক্রবার রাতে নারায়ণগঞ্জের মসজিদে গ্যাসলাইন বিস্ফোরণের আগুনে পোড়া মানুষগুলোর স্বজনদের প্রত্যেকের একই অবস্থা। কেউ চিৎকার করে কাঁদছেন, কেউ কাঁদছেন ডুকরে।

এমন আহাজারিতে ভারি হয়ে যায় শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের চারপাশ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে মৃতের সংখ্যা। প্রিয়জন হারানোর বেদনা বুকে নিয়ে অনেকেই অপেক্ষা করতে থাকেন লাশের জন্য। বিস্ফোরণের আগুনে শরীরের বেশির ভাগ পুড়ে যাওয়ায় কারোরই লাশ চেনার মতো পরিস্থিতি ছিল না। হাসপাতালে আনার সময় জানা নাম-পরিচয়ের সূত্র ধরে হস্তান্তর করা হয় লাশ। অপেক্ষার প্রহর গোনার মধ্যে গতকাল বেলা সাড়ে ৩টায় খবর আসে শেফালির স্বামী কাঞ্চন হাওলাদার আর বেঁচে নেই। এ খবরে চিৎকার করে কান্না শুরু করেন আর বারবার মূর্ছা যেতে থাকেন শেফালি।

বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে গিয়ে জানা যায়, বাবার সঙ্গে নামাজ আদায় করতে গিয়ে ঝলসে গিয়েছিল রহিমার একমাত্র সন্তান সাত বছরের জুবায়ের। ছোট্ট শরীর এ ধকল সইতে না পারায় গতকাল সকালেই কোল খালি হয়েছে রহিমার। এখন অপেক্ষা স্বামীর খবরের। জুবায়েরের বাবা জুলহাসও মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। জুলহাস ফরাজী নারায়ণগঞ্জে পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন। স্ত্রী রহিমা বেগমও গার্মেন্ট কর্মী। রহিমা বলেন, ‘ও তো মারা গেছে। ওর বাবার অবস্থা অনেক খারাপ। আমার একটাই মাত্র ছেলে। আল্লাহর কাছে তো বহু প্রার্থনা করলাম। কোনো লাভ হলো না। সবই তো হারিয়ে ফেললাম!’ বাবার সঙ্গে মসজিদে নামাজ আদায় করতে যাওয়ার সময় মা রহিমাকে জুবায়ের বলেছিল, ‘মা, টিভি বন্ধ কোরো না।’ ফিরে এসে আবার বসে যাবে টিভির সামনে- এই ভেবে টিভি বন্ধ করেননি মা। এর ২০ মিনিট পর রহিমা জানতে পারেন সেই হৃদয়বিদারক খবর। একমাত্র সন্তান কখনই আর ফিরবে না বাসায়। পাগলের মতো মসজিদের দিকে ছুটে যান রহিমা। গিয়ে দেখেন মসজিদ বিধ্বস্ত। একই ঘটনায় পুড়ে মারা গেছেন দুই ভাই সাব্বির (২১) ও জুবায়ের (১৮)। সঙ্গে থাকা আরেক ভাই ইয়াসিন ফরজ নামাজ আদায় শেষে মসজিদ থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। এর কিছুক্ষণ পর বিস্ফোরণ ঘটে। দুই ছেলের মৃত্যুর খবর গতকাল বেলা ১২টায় জানতে পারেন বাবা নুর উদ্দিন আর মা কুলসুম বেগম। হাসপাতালে দুই ছেলে হারানো মা-বাবা চিৎকার করে কাঁদছিলেন। স্বজনের খোঁজে থাকা একজন বলেন, ‘(বার্ন ইনস্টিটিউটের নিচতলায়) ৩৭ জনের নাম আছে। ওপরে নাকি ৪৫ জনের নাম পেয়েছে। কিন্তু আমার রোগীকে আমি পাচ্ছি না।’ আরেকজন বলেন, ‘এতটুকু শুধু জানি বেঁচে আছে। দেখতে দিচ্ছে না। বাকিটা আল্লাহ জানেন।’ শুক্রবার রাতে নারায়ণগঞ্জের মসজিদে গ্যাসলাইনের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে দগ্ধদের আনা হয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। আপনজনের খোঁজে রাত থেকেই অপেক্ষায় থাকেন স্বজনরা। এ পর্যন্ত এক শিশু ও মুয়াজ্জিনসহ ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া দগ্ধ আরও ২০ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন বার্ন ইনস্টিটিউটের প্রধান সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন। বেশির ভাগেরই শ্বাসনালিসহ শরীরের ৯০ শতাংশের বেশি পুড়ে গেছে বলেও জানান তিনি।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর