শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১২ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১১ মার্চ, ২০২১ ২৩:১৯

করোনা নিয়ে আবারও উৎকণ্ঠা

বেড়েছে মৃত্যু ও সংক্রমণ, ভ্যাকসিন নিয়ে নিয়ম মানছে না কেউই

শামীম আহমেদ

করোনা নিয়ে আবারও উৎকণ্ঠা

দেশে করোনা সংক্রমণের এক বছরের মাথায় এসে আবারও বাড়ছে ভাইরাসটি নিয়ে উৎকণ্ঠা। দেশে শনাক্ত হয়েছে অধিক সংক্রমণ ক্ষমতাসম্পন্ন করোনাভাইরাসের নতুন স্টেইন। মার্চের শুরু থেকে করোনা সংক্রমণ আবারও বাড়তে শুরু করেছে। দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা কখনো কমছে, দিনের ব্যবধানে আবার বেড়ে দ্বিগুণ হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আবারও দেশের সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালকে প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠান সীমিত করতে চিঠি দেওয়া হয়েছে জেলায় জেলায়।

দুই মাস পর গত বুধবার প্রথম হাজারের অধিক নতুন রোগী শনাক্তের তথ্য জানানো হয়। এর আগে সর্বশেষ ১০ জানুয়ারি এক দিনে সহস্রাধিক রোগী শনাক্তের তথ্য দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদফতর। এরপর থেকে হাজারের নিচেই ছিল দৈনিক শনাক্ত রোগী। গতকাল দ্বিতীয় দিনের মতো সহস্রাধিক (১০৫১ জন) নতুন রোগী শনাক্তের তথ্য জানানো হয়। সংক্রমণ হার ছিল ৫ দশমিক ৮২ শতাংশ। অথচ ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে সংক্রমণ হার ছিল ৪ শতাংশের নিচে। এর মধ্যে ১৯ দিনই ছিল ৩ শতাংশের নিচে। মার্চের ১ তারিখেই সংক্রমণ হার হঠাৎ বেড়ে ৪ শতাংশ ছাড়ায়। বুধবার সংক্রমণ হার দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৯৮ শতাংশে যা ৫৮ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ। হাসপাতালেও বাড়ছে করোনা রোগীর সংখ্যা। গতকাল আইসিইউতে সংকটাপন্ন রোগী ভর্তি ছিলেন ২২৪ জন। আগের দিন ভর্তি ছিলেন ২০৯ জন। এক দিনের ব্যবধানে আইসিইউতে রোগী বেড়েছে ১৫ জন। গত ১০ ফেব্রুয়ারি আইসিইউতে ভর্তি ছিলেন ১৬৫ জন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা নেওয়ার পর অনেকে স্বাস্থ্যবিধি মানা একেবারেই ছেড়ে দিয়েছেন। এতে ওই ব্যক্তি নিজেকেও ঝুঁকিতে ফেলছেন। অন্যদের সংক্রমিত করছেন। কারণ, করোনার বিরুদ্ধে সর্বাধিক অ্যান্টিবডি তৈরি হয় টিকার দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার ১৪ দিন পর। এ ছাড়া দেশে শনাক্ত হওয়া করোনার নতুন স্টেইন (পরিবর্তিত রূপ) বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তাই দ্রুত সবাইকে টিকা নিতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে।

এদিকে করোনা সংক্রমণ নিয়ে খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক গতকাল শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, দেশে দৈনিক শনাক্ত রোগীর হার ২ শতাংশের ঘরে নেমে গিয়েছিল। এখন তা   আবার বেড়ে ৬ শতাংশের কাছাকাছি চলে গেছে। এটা আশঙ্কাজনক। আমরা একটু বেপরোয়া হয়ে গেছি। আমরা মাস্ক ব্যবহার করছি না, কম করছি। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে কুণ্ঠাবোধ করছি। অনেক বেশি সামাজিক অনুষ্ঠান করছি, যার মাধ্যমে সংক্রমণ আবার বেড়ে গেছে। টিকা নিয়ে এখন মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানছে না, যা বিপদ ডেকে আনছে। জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে এক অনুষ্ঠান শেষে তিনি আরও জানান, সংক্রমণ ঠেকাতে গত বুধবার সারা দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি- বেসরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে তিনি বৈঠক করেছেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও কর্মসূচি সীমিত করতে জেলা পর্যায়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কম গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান স্থগিত করতে বলা হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে আবারও প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে।

এদিকে গত ২৭ জানুয়ারি দেশে শুরু হয় গণটিকা কার্যক্রম। গতকাল পর্যন্ত টিকার প্রথম ডোজ নিয়েছেন ৪২ লাখ ১৮ হাজার ১২৭ জন। এখনো দেশের ৯৭ ভাগের বেশি মানুষ টিকা কার্যক্রমের বাইরে রয়েছেন। অথচ টিকার প্রথম ডোজ নিয়েই অনেকের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানায় অনীহা দেখা গেছে। এমনকি টিকা নিতে গিয়ে মাস্ক খুলে ছবি তুলতে দেখা গেছে অনেককে। প্রতিদিনই এমন অনেকের ছবি যুক্ত হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। অনেকে শুধু অফিসের নির্দেশ মানতে অফিসকালীন মাস্ক ব্যবহার করছেন। হাত ধোয়া বা স্যানিটাইজার ব্যবহার অনেকটা উঠে গেছে। কুশল বিনিময়ে ফিরে এসেছে আগের মতোই করমর্দন।

প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক, ইউজিসি অধ্যাপক ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো টিকা শতভাগ নিরাপত্তা দেবে বলে প্রমাণিত হয়নি। তাই যিনি টিকা নিয়েছেন তাকেও স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। এ ছাড়া টিকা গ্রহণকারী নিজেকে সুরক্ষিত মনে করলেও তিনি ভাইরাস বহন করতে পারেন, অন্যদের সংক্রমিত করতে পারেন। এ ছাড়া দেশে করোনাভাইরাসের নতুন ধরন শনাক্ত হয়েছে। এটি আগেরটির চেয়ে বেশি সংক্রামক। এটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিমানবন্দরগুলোতে বাড়তি সতর্কতা নিতে হবে। বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশফেরত কারও মধ্যে করোনা থাকলে তার নমুনা সংগ্রহের পর জিনোম সিকোয়েন্স করতে হবে। নতুন ধরন হলে তার কন্ট্রাক ট্রেস করতে হবে। এ ছাড়া টিকা দিলেও স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। কারণ টিকার কার্যকারিতা কত দিন থাকবে সে বিষয়ে এখনো গবেষণা হয়নি।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, করোনার টিকার প্রথম ডোজ নেওয়ার তিন সপ্তাহ পর কিছুটা অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। সর্বোচ্চ অ্যান্টিবডি তৈরি হয় দ্বিতীয় ডোজের ১৪ দিনের মাথায়। তাই টিকা নিয়েই নিজেকে সুরক্ষিত মনে করার সুযোগ নেই। যত দিন ৮০ ভাগ মানুষ টিকার আওতায় না আসে আর করোনা সারা বিশ্বে সাধারণ সর্দি-জ্বরে পরিণত না হয়, ততদিন স্বাস্থ্যবিধি মানতেই হবে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৫১ জনের দেহে সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। মারা গেছেন ৬ জন। সুস্থ হয়েছেন ১ হাজার ৩০৭ জন। গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশে মোট করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে ৫ লাখ ৫৪ হাজার ১৫৬ জন। মারা গেছেন ৮ হাজার ৫০২ জন। সুস্থ হয়ে উঠেছেন ৫ লাখ ৭ হাজার ৯২০ জন।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর