শিরোনাম
প্রকাশ : ৫ জুলাই, ২০২০ ০৮:৫৭
আপডেট : ৫ জুলাই, ২০২০ ১০:৪৭

চীনের সঙ্গে উত্তেজনা: ভারতের সামনে এখন কোন কোন পথ খোলা, কী হতে পারে পরিণতি?

অনলাইন ডেস্ক

চীনের সঙ্গে উত্তেজনা: ভারতের সামনে এখন কোন কোন পথ খোলা, কী হতে পারে পরিণতি?

পূর্ব লাদাখে ভারতীয় এবং চীনা সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষপূর্ণ আবহের নবম সপ্তাহ চলছে। দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর মধ্যে কথোপকথন, কর্পস কম্যান্ডার স্তরে তিন দফার বৈঠক এবং সামরিক ও কূটনৈতিক স্তরে একাধিক অন্যান্য বৈঠক সত্ত্বেও কাটেনি অচলাবস্থা। 

শুক্রবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, “আমাদের সেনাবাহিনীর রোষ এবং উত্তাপ প্রত্যক্ষ করেছে ভারতের দুশমনরা।”

এ সময় তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “শান্তিরক্ষার প্রতি ভারতের দায়বদ্ধতাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা উচিত নয়”।

বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর পূর্বাবস্থা ফিরিয়ে আনতে কী কী করতে পারে ভারত?

বিকল্প ১: জোর করে চীনাদের হটিয়ে দেওয়া, তারা যা কিছু নির্মাণ করেছে তা ভেঙে দেওয়া 

সবচেয়ে সোজাসাপ্টা উপায় হল, গত আট সপ্তাহে যে যে নতুন এলাকা দখল করেছে চীন, সেখান থেকে তাদের গায়ের জোরে সরিয়ে দিক ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার ভারতীয় অংশে যেসব পরিকাঠামো নির্মাণ করেছে চীন, তা ধ্বংস করে দিক।

তবে এর ফলে সরাসরি যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী। গত ১৫ জুন পিপি১৪ নামক পর্যবেক্ষণ পোস্টের কাছ থেকে চীনাদের হটানোর যে সীমিত প্রচেষ্টা করা হয়, তার জেরেই সংঘর্ষে প্রাণ যায় ২০ জন ভারতীয়।

প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার ভারতীয় অংশে যে সমস্ত এলাকায় অনুপ্রবেশ করেছে চীনা বাহিনী, সেসব এলাকায় ভূখণ্ড অথবা পরিকাঠামোজনিত সমস্যায় খুব একটা স্বস্তিতে নাও থাকতে পারে ভারতীয় সেনা। ফলে নির্দিষ্ট এলাকা দখলের অভিযান সফল নাও হতে পারে। তাছাড়া, এমন কিছু এলাকায় চীনা অনুপ্রবেশ ঘটেছে, যেগুলোর ওপর উভয় দেশই দাবি জানিয়ে রেখেছে, ফলে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা নির্ধারণ আজও সম্ভব হয়নি। সুতরাং সরাসরি যুদ্ধের পথে হাঁটলে আন্তর্জাতিক স্তরে সমর্থন পাওয়া কঠিন হবে দিল্লির পক্ষে।

সম্ভাবনা: ক্ষীণ

বিকল্প ২: ‘দেওয়া নেওয়া’ নীতি

প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর এমন বেশ কিছু এলাকা রয়েছে, যেগুলোতে কড়া পাহারা রাখেনি চীন, অতএব সেখানে প্রবেশ করে চীনা ভূখণ্ডের কিছু অংশ দখল করে নিতে পারে ভারতীয়রা। পরবর্তীতে আলোচনায় বসে একে অপরের ভূখণ্ড দেওয়া নেওয়া করে নিলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এতে সীমান্তে পূর্বাবস্থা ফিরে আসবে। এই বিকল্পের কথা আলোচিত হয়েছে উচ্চতম স্তরে – বিশেষ করে ২০১২ সালে রচিত ‘Non-alignment 2.0’ শীর্ষক নীতি দলিলে – এবং এও মনে করা হয় যে এই মর্মে ‘ওয়ার গেমস’-এর মাধ্যমে অনুশীলনও করেছে ভারতীয় সেনা।

কৌশলগত বিষয় বিশেষজ্ঞ অ্যাশলে টেলিস বলেছেন, ২০১৩ সালে দেপসাং এলাকায় চীনা অনুপ্রবেশ ঘটার তিন সপ্তাহের মধ্যে উল্টে যায় পাশা, যখন চুমারে চীনা ভূখণ্ড দখল করে কিছু অস্থায়ী নির্মাণকাজ শুরু করে দেয় ভারতীয় সেনা বাহিনী। এর ফলে অবধারিত হয়ে পড়ে আলোচনা এবং উভয়পক্ষই নিজ নিজ অবস্থানে ফিরে যেতে রাজি হয়। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘quid pro quo’, অর্থাৎ ‘গিভ অ্যান্ড টেক’।

সেই পথ এখনও খোলা, কারণ লাদাখ থেকে অরুণাচল প্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার পুরো অংশ সশরীরে পাহারা দেওয়া চীনের পক্ষেও সম্ভব নয়। তবে এই ধরনের প্ররোচণামূলক পদক্ষেপের একটা সময়সীমা থাকে, যা নিয়ে আট সপ্তাহ পর হয়তো আর ভেবে লাভ নেই। তাছাড়া এ ক্ষেত্রেও সম্মুখ সমরের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে, কারণ চীন এই পদক্ষেপকে বৃহত্তর সামরিক আক্রমণ অথবা প্ররোচণা হিসেবে দেখতে পারে।

সম্ভাবনা: ক্ষীণ, তবে সম্ভব


বিকল্প ৩: বর্তমান পরিস্থিতি বজায় রেখে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া

এক্ষেত্রে ভারতীয় সেনা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর তাদের বর্তমান অবস্থান বজায় রাখে (পরিভাষায় যাকে বলে ‘holds the line’), এবং নিশ্চিত করে যে চীনা বাহিনী আরও গভীরে যাতে প্রবেশ না করতে পারে। এর ফলে এখন যে জায়গায় আছে, সেখানেই থমকে যাবে চীনারা এবং সেই সুযোগে সম্ভাব্য পরিণামের কথা মাথায় রেখে নিজেদের রক্ষণভাগ মজবুত করে নেবে ভারত। তাছাড়া নিজেদের গোলাবারুদ এবং রসদের ভাণ্ডারও পর্যাপ্ত পরিমাণে বাড়িয়ে নিতে পারে তারা।

পাশাপাশি চলতে পারে আলোচনা, প্রয়োজনে উচ্চতম রাজনৈতিক স্তরেও, যাতে পূর্বাবস্থায় ফিরতে রাজি হয় চীন। সঙ্গে চলতে থাক চীনের বিরুদ্ধে অসামরিক পদক্ষেপ, মূলত অর্থনীতি এবং বাণিজ্যের ক্ষেত্রে, যার কিছুটা আভাস দেখা গেছে সম্প্রতি। এর ফলে নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে চীনকে স্পষ্ট বার্তা দিতে পারে নয়া দিল্লি, আবার বিশ্বের কাছেও বার্তা দিতে পারে যে দায়িত্বশীল দেশ হিসেবে কোনও হঠকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে না ভারত।

সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসী মনোভাব প্রদর্শন করে আন্তর্জাতিক মহলে যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে চীন, তারও সুযোগ নেওয়া যেতে পারে। এর ফলে জন্ম নিতে পারে নতুন কিছু কূটনৈতিক, নিরাপত্তা, এবং বাণিজ্য জোট, যা চাপে ফেলবে চীনকে।

তবে এই পদক্ষেপের নেতিবাচক দিক হল এর দীর্ঘসূত্রিতা, যার ফলে অচলাবস্থা গড়াতে পারে শীতকাল পর্যন্ত, যা বড় রকমের আর্থিক এবং পরিকাঠামোগত বোঝা হয়ে দাঁড়াবে ভারতীয় সেনা বাহিনীর ওপর। এছাড়াও দীর্ঘদিন প্রবল উত্তেজনার আবহে একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা দুই বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে অকস্মাৎ ছোটখাটো ঘটনা ঘটলেও তা অচিরেই অতি বৃহৎ আকার ধারণ করতে পারে। সর্বোপরি এবং সবচেয়ে বড় ঝুঁকি এই যে, ভারতীয়রা যতই নিজেদের অবস্থান বজায় রাখুক, চীন এক ইঞ্চিও জমি না ছাড়তে পারে। বরং চীনাদের অপ্রতিহত সৈন্য মোতায়েন করা এবং নতুন নির্মাণের কাজের ফলে চিরতরে বদলে যেতে পারে স্থিতাবস্থা।

সম্ভাবনা: সবচেয়ে বেশি

বিকল্প ৪: সীমিত পরিসরে যুদ্ধ

এখানে সীমিত বলতে ভৌগোলিক অর্থে – শুধুমাত্র লাদাখে – অথবা সময়ের নিরিখে – কয়েকদিন চালিয়ে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করতে পারে ভারত। এই পদক্ষেপ অত্যন্ত দুঃসাহসী, কেননা, এক্ষেত্রে রীতিমতো প্রস্তুত এক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে হবে। তাছাড়া চীন তাদের বিভিন্ন এলাকার সামরিক কমান্ড একত্রিত করেছে, যেখানে গোটা ভারত-চীন সীমান্তকে পশ্চিমী কমান্ডের অধীনে একটি অভিন্ন ক্ষেত্র হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। ফলে ভারতের ইচ্ছানুযায়ী যুদ্ধক্ষেত্র সীমিত নাও থাকতে পারে এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী চরম পরীক্ষার সম্মুখীন হতে পারে।

এই বিকল্পের ক্ষেত্রে প্রয়োজন সামরিক ক্ষমতার সম্পূর্ণ প্রয়োগ, যা কোভিড-পরবর্তী সময়ে ভারতের অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। কোনও পক্ষ নেওয়ার প্রবৃত্তি হবে না বিশ্বের অন্যান্য দেশের, বরং পাকিস্তান এই সুযোগে আরও একটি ফ্রন্ট খুলে দিতে পারে। একমাত্র ইতিবাচক দিক হল যে চীনকে কড়া বার্তা পাঠানো হবে – কারণ অধিকতর ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে এই যুদ্ধ নিশ্চিতভাবে জিততে হবে চীনকে, যেখানে ভারতকে সরাসরি না জিতেও স্রেফ অপরাজিত থেকেই নিজেদের জয়ী প্রতিপন্ন করতে হতে পারে।

সম্ভাবনা: অতি ক্ষীণ

সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

বিডি প্রতিদিন/কালাম


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর