২৪ অক্টোবর, ২০২১ ০৫:৫২

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)

মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)

জন্মের মতো আনন্দ পৃথিবীতে নেই। জন্ম মানে সৃষ্টি। সৃষ্টি মানে উল্লাস। এ উল্লাস বা আনন্দ স্বয়ং স্রষ্টার। তাই তো যখনই আল্লাহতায়ালা তাঁর প্রিয় হাবিবের সঙ্গে পূর্ববর্তী নবীদের জন্ম ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করেছেন, সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মাবুদ রব্বানা গেয়ে উঠেছেন শুভ জন্মদিনের গান। তবে আমাদের এবং মহান আল্লাহর সংগীতের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য আছে।

সুরা মারিয়ামের ১৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা হজরত ইয়াহইয়া (আ.)-এর জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে বলেন, ‘ওয়াসালামুন আলাইহি ইয়াওমা উলিদা ওয়াইয়ামা ইয়ামুতু ওয়া ইয়াওমা ইউবআছু হাইয়া। অর্থাৎ শুভ এবং শান্তি বর্ষিত হোক তাঁর প্রতি যেদিন সে জন্মগ্রহণ করেছে, যেদিন সে মারা যাবে, আবার যেদিন তাঁকে জীবিত অবস্থায় ওঠানো হবে।’ 

মজার ব্যাপার হলো, আমরা শুধু জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাই, কিন্তু আল্লাহ জন্ম-মৃত্যু এবং পুনরুত্থান দিনের শুভেচ্ছাও জানিয়েছেন তাঁর প্রিয় বান্দাদের। সুরা মারিয়ামের পুরোটাই নবীদের জন্মের ইতিহাস নিয়ে। ইয়াহইয়া (আ.) ছাড়াও হজরত ইসা ও মুসা (আ.)-এর জন্ম সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে এ সুরায়। প্রত্যেক নবীর জন্মের সময়কে উল্লেখ করেই আল্লাহতায়ালা শুভেচ্ছা জানিয়েছেন নিজস্ব নিয়মে।

আল কোরআনে রসুল (সা.)-এর জন্ম সম্পর্কেও আলোচনা করা হয়েছে। তবে এখানেও একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে। অন্যান্য নবীর দুনিয়ায় আগমন কোন পরিবেশে কীভাবে হয়েছে সে সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু আমাদের পেয়ারা নবীর বেলায় আলমে আরওয়াহ তথা রুহের জগতে তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের আলোচনার মাধ্যমে হজরতের জন্ম ইতিহাস অধ্যায়ের সূচনা করেছেন আল্লাহতায়ালা। 

সুরা আলে ইমরানের ৮১ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘স্মরণ কর যখন রুহের জগতে আমি নবীদের থেকে অঙ্গীকার নিয়েছি- তোমরা সবাই ওয়াদা কর, আমার পক্ষ থেকে তোমাদের যে কিতাব এবং হিকমাহ দেওয়া হবে, এরপর তোমাদের কাছে কোনো সত্যায়নকারী রসুল এলে অবশ্যই তাঁকে বিশ্বাস করবে এবং তাঁকে সাহায্য করবে। তোমরা কি আমার সঙ্গে ওয়াদা করছ এবং এ প্রতিশ্রুতি রক্ষার গুরুদায়িত্ব নিতে প্রস্তুত আছ? সব নবীর রুহ একযোগে বলে উঠল- আমরা স্বীকার করলাম। আল্লাহ বলেন, তবে তোমরা সাক্ষী থাক, আমিও তোমাদের সঙ্গে সাক্ষী রইলাম।’ 

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ বলেন, রুহের জগতেই আল্লাহতায়ালা সব নবী থেকে রসুল (সা.)-এর রিসালাত মেনে নেওয়ার স্বীকৃতি নিয়ে নিয়েছেন। শুধু তাই নয়, তাঁদের জীবদ্দশায় রসুল (সা.)-এর স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য অপেক্ষা থাকার গুরুদায়িত্বও তাঁদের কাঁধে পড়েছে। প্রসঙ্গত, রুহের জগতে ওই অঙ্গীকারের পর রসুল (সা.)-এর জীবদ্দশায়ও মিরাজের রাতে বাইতুল মুকাদ্দাসে সব নবীর ইমামতির মাধ্যমে ইমামুল মুরসালিনের মর্যাদায় ভূষিত হন তিনি। 

পূর্ববর্তী সব নবী জীবনভর সেই সত্যায়নকারী রসুলের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন সুরা সাফের ৬ নম্বর আয়াত তার মজবুত দলিল। আল্লাহ বলেন, ‘স্মরণ কর! মারিয়ামপুত্র ইসা বলেছিল, হে বনি ইসরাইল! আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর প্রেরিত রসুল। আমি তাওরাতের সত্যায়নকারী এবং আমি সুসংবাদ দিচ্ছি যে আমার পরে আহমাদ নামে একজন রসুল আসবেন। কিন্তু যখন সে রসুল সত্যের সুস্পষ্ট প্রমাণসহ হাজির হলো, তখন ইনজিল কিতাবের পরবর্তী অনুসারীরা বলল, এ-তো স্রেফ জাদু!’ 

মজার ব্যাপার হলো, উলুল আজম পয়গম্বরগণ চাইতেন সেই সত্যায়নকারী রসুলের উম্মত হওয়ার দুর্লভ সৌভাগ্য যেন তাঁদের নসিবে জোটে। যদি তা-ও না হয় অন্তত তাঁর বংশে যেন সেই রসুলের বিলাদাত তথা জন্ম হয়। উদাহরণস্বরূপ সাইয়েদনা ইবরাহিম (আ.)-এর কথা বলা যায়। তাঁর মর্যাদা সম্পর্কে কোরআনের অসংখ্য আয়াত থেকে দুটি উল্লেখ করছি।

সুরা বাকারার ১২৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘স্মরণ কর! ইবরাহিমকে তাঁর প্রতিপালক কিছু বিষয়ে পরীক্ষা নিয়েছিলেন। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর আল্লাহ বললেন, আমি তোমাকে মানব জাতির নেতা মনোনীত করেছি।’ একই সুরার ১৩০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘নির্বোধ ছাড়া ইবরাহিমের ধর্মাদর্শ থেকে কে মুখ ফেরাবে? পৃথিবীতে আমি তাঁকে নেতা মনোনীত করেছি। 

আর আখিরাতেও সে হবে সৎকর্মশীল ন্যায়পরায়ণদের একজন।’ মানব জাতির নেতা এবং উলুল আজম পয়গম্বর সাইয়েদেনা ইবরাহিম (আ.) সীমাহীন কাকুতি-মিনতি করে সেই সত্যায়নকারী রসুলের জন্ম তাঁর বংশে হওয়ার জন্য দোয়া করেছেন। সে বর্ণনা বিস্তারিত এসেছে সুরা বাকারার ১২৭-১২৯ নম্বর আয়াতে। 

আল্লাহ বলেন, ‘যখন ইবরাহিম ও ইসমাইল কাবাঘরের দেয়াল তুলছিল তখন তাঁরা দোয়া করেছিল, হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদের এ কাজ কবুল কর! নিশ্চয়ই তুমি সব শোনো, সব জানো। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের পুরোপুরি তোমাতে সমর্পিত কর এবং আমাদের বংশধর থেকে এমন একটি জাতির উত্থান ঘটাও যারা তোমাতে পুরোপুরি সমর্পিত হবে। 

আমাদের ইবাদতের নিয়ম পদ্ধতি শিখিয়ে দাও! আমাদের দোষ-ত্রুটি ক্ষমা কর। নিশ্চয়ই তুমি অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। হে আমাদের প্রতিপালক! এ জাতির মধ্য থেকে তাদের কাছে এমন এক রসুল প্রেরণ কর যে তোমার আয়াত পাঠ করবে, তাদের কিতাবের জ্ঞান ও হিকমা শিক্ষা দেবে এবং তাদের জীবনকে পরিশুদ্ধ করবে। নিশ্চয়ই তুমি মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’

ইবরাহিম (আ.)-এর দোয়ার ফলেই কাবার মুতাওয়াল্লি আবদুল মুত্তালিবের বংশে আবদুল্লাহর ঘরে রসুল মুহাম্মদের জন্ম। সে ঘোষণাও এসেছে কোরআনে, ‘তিনি নিরক্ষরদের মধ্য থেকে একজনকে রসুল হিসেবে তাদের কাছে পাঠিয়েছেন সত্যের বাণী প্রচারের জন্য। সে আমার আয়াত শুনিয়ে তাদের অন্তর পরিশুদ্ধ ও জীবন পরিশীলিত করে এবং কিতাব ও হিকমা শিক্ষা দেয়, যদিও এর আগে তারা ঘোর বিভ্রান্তি ও অবিদ্যায় নিমজ্জিত ছিল।

এ রসুলকে প্রেরণ করা হয়েছে অনাগত মানুষের জন্য, যারা এখনো সত্যবাণীর সঙ্গে পরিচিত হয়নি। আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ সুরা জুমুয়া, আয়াত ২। সুবহানাল্লাহ! ইবরাহিম (আ.)-এর দোয়া অক্ষরে অক্ষরে কবুল করেছেন আল্লাহতায়ালা।

লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মুফাস্সির সোসাইটি।

বিডি প্রতিদিন/আবু জাফর

এই রকম আরও টপিক

সর্বশেষ খবর