Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper

শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা
আপলোড : ৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ ২৩:৩৯

মাদকাসক্ত বাবার ভয়ঙ্কর কাণ্ড

ছোট ছেলেকে হত্যা, বড় ছেলেকে জিম্মি করে ছয় ঘণ্টার নাটকীয়তার অবসানে র‌্যাব-পুলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

মাদকাসক্ত বাবার ভয়ঙ্কর কাণ্ড
সন্তানের লাশ নিয়ে মায়ের কান্না। আটক বাবা

রাজধানীর বাংলামোটরের এক বাসায় শিশু সন্তান সাফায়েতকে (আড়াই বছর) খুন করে নুরুজ্জামান কাজল নামের এক বাবা দা হাতে আরেক সন্তানকে হত্যার হুমকি দিয়ে ৬ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর নাটক করেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত ধরা দিতে হয়েছে তাকে।

দা হাতে সন্তানকে জিম্মি করার খবরে গতকাল সকাল ৮টা থেকে ১৬ লিংক রোড বাংলামোটরের ওই বাসার সামনে অবস্থান নেয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, গণমাধ্যম কর্মীসহ আশপাশের উৎসুক জনতা। পুলিশ-র‌্যাবের পক্ষ থেকে দফায় দফায় শিশুদের বাবা নূরুজ্জামান কাজলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। অবশেষে ৬ ঘণ্টা পর জানাজার নামাজের কথা বলে কাজলকে বাইরে নিয়ে আসে পুলিশ। এরপরই তাকে আটক করা হয়। শেষ হয় রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার। বাসার ভিতর থেকে কাফনের কাপড়ে মোড়ানো সাফায়েতের লাশ খুঁজে পায় পুলিশ। সেই সঙ্গে উদ্ধার করা হয় সাড়ে তিন বছরের বড় সন্তান সুরাইতকে। ছোট সন্তানের লাশ পাঠানো হয় মর্গে। আর বড়জনকে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয় হাসপাতালে। রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মারুফ হোসেন সরদার বলেন, আমরা খবর পেয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘটনাস্থলে আসি। আমরা নিশ্চিত হই ভিতরে একজনের লাশ আছে। ভিতরে ছোট একটা বাচ্চা ছিল, মসজিদের একজন হুজুর ছিলেন। তাদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আমরা কোনো ধরনের অ্যাকশনে যাইনি। কারণ, এতে ক্যাজুয়ালিটির শঙ্কা ছিল। আমরা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছি। বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে জীবিতদের সুস্থভাবে উদ্ধারের চেষ্টা করেছি। সর্বশেষ আমরা দুপুরের নামাজের পর বাচ্চার জানাজার কথা বলে তাকে বাইরে নিয়ে আসার চেষ্টা করি। এতে কাজ হয়। কাজল বেরিয়ে আসেন। সঙ্গে সঙ্গে আমরা আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে তাকে ধরে ফেলি। কোনো ধরনের ক্যাজুয়ালিটি ছাড়া অভিযান সমাপ্ত করতে সক্ষম হই।

ঢামেক মর্গে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লাশের ময়নাতদন্ত হয়নি। আজ ময়নাতদন্ত হবে বলে জানিয়েছেন ফরেনসিক বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ।

জানা গেছে, বাংলামোটরের রাহাত টাওয়ার সংলগ্ন ১৬ নম্বর লিংক রোডের দ্বিতল বাসার মালিক প্রয়াত মনু মেম্বার। নিচ তলায় তিনটি দোকান ভাড়া দেওয়া হলেও উপর তলার টিনশেডের বাসায় তার চার সন্তান তাদের মাকে নিয়ে বসবাস করতেন। ২০১৪ সালের ১৭ জুন মারা যান মনু মেম্বার। মাদকাসক্ত কাজলের অত্যাচার এবং সামাজিক মর্যাদার কথা চিন্তা করে গত ৫-৭ মাস ধরে অন্য তিন ভাই নূরে আলম, উজ্জ্বল ও সাকিব তাদের পরিবার নিয়ে অন্যত্র চলে যান। তাদের বৃদ্ধা মা আমেনা বেগম তার মেয়ে আন্নি, মিলন এবং মিলির বাসায় থাকতে শুরু করেন। পরিবারের অন্য সদস্যরা অন্যত্র চলে যাওয়ায় স্ত্রী প্রিয়া আক্তার মালিহা আরও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকেন। প্রায়ই মারধর করতেন কাজল। এক পর্যায়ে গত ঈদুল আজহার পর পুলিশ ও এলাকাবাসীর সহায়তায় মালিহাকে উদ্ধার করে তার বাবা নিয়ে যান। তবে দুই সন্তান সুরাইত ও সাফায়েতকে নিজের কাছেই রেখে দেন কাজল। এ ঘটনায় শাহবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করা হয়েছিল। কাজলের ছোট ভাই নূর সাকিব সাদনান জানান, চার মাস আগে তাকে মারধর করেন কাজল। পালাতে গিয়ে তার পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায়। এরপর থেকেই তিনি বাসা ছেড়ে চলে যান। তবে গত তিন মাস ধরে কাজল তার দুই ছেলেকে কলা এবং পাউরুটি খাইয়েছেন। মাঝেমধ্যে বাইরের দারোয়ানকে দিয়ে ভাত আনাতেন বাইরের হোটেল থেকে। গত কয়েকদিন ধরে জন্ডিসে আক্রান্ত ছিল ছোট ছেলে সাফায়েত। কাজলের স্বজনদের ধারণা, জন্ডিসের কারণে গতকাল সকালে সাফায়েত মারা গেছে। নুরুজ্জামানের মা আমেনা বেগম বলেন, সকালে আমার ছেলে ফোন করে বলল, ‘তোমার নাতি নাই। আমার নাতির জন্ডিস হইছিল। ডাক্তারও দেখাইছে। আমার ছেলে ওরে মারে নাই। আপনারা ভুল বলছেন।’ এলাকার টাইলস ব্যবসায়ী রাশেদুর রহমান সুমন বলেন, দুই-তিন মাস ধরে দুই ছেলেকে নিয়ে একাই বাসায় থাকতেন কাজল। কাউকে বাসায় যেতে দিতেন না। শুনেছি মাদক গ্রহণ করতেন। কিন্তু আমি নিজে কখনো মাদক নিতে দেখিনি। কেন এমনটি করল তা বুঝতে পারছি না। তবে মাথায় একটু সমস্যা ছিল তার।

নিজেই মাইকে মৃত্যুর খবর প্রচার করেন, কবর খোঁড়ার ব্যবস্থা করেন : গতকাল ভোরে কাজল নিজেই মসজিদে গিয়ে ছেলে মৃত্যুর সংবাদ মাইকে প্রচার করেন। এরপর আজিমপুর কবরস্থানে মরদেহ দাফনের ব্যবস্থা করে আসেন। সঙ্গে নিয়ে আসেন কাফনের কাপড়। এরপর পাশের মসজিদের খাদেম গফফার এবং ইমাম মাওলানা আজহারুল ইসলামকে নিয়ে বাসায় যান। এরপর থেকে ইমাম ও মৃত সন্তানসহ আরেক ছেলেকে নিয়ে ভিতরেই অবস্থান করছিলেন। এরই মধ্যে পুলিশ ভিতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে ক্ষিপ্ত হন তিনি।

শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল হাসান বলেন, থানায় আনার পর কাজলের সঙ্গে দফায় দফায় কথা বলার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে তিনি একেক সময় একেক কথা বলছেন। কাজল যে মাদকে ভয়াবহ রকমের আসক্ত তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

লাশের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পোস্টমর্টেম না করে কিছু বলা যাচ্ছে না। কোনো রক্তের দাগও প্রাথমিকভাবে পাওয়া যায়নি।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর