শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৭ অক্টোবর, ২০২০ ২৩:৫৬

৩৫ একর জমির ৩০ একরই বেদখল

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল

জয়শ্রী ভাদুড়ী

৩৫ একর জমির ৩০ একরই বেদখল

হাসপাতালের দেয়াল পাঁচ জায়গায় ভেঙে বানানো হয়েছে সদর দরজা। বেলা ৩টা বাজতেই হাসপাতাল চত্বরে সবজি, মাছ, মুরগির বাজার বসে। সাততলা বস্তির বাসিন্দাদের বিনোদন ও অবসর যাপনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল। মহাখালীতে হাসপাতালের ৩৫ একর জায়গার ৩০ একর দখল করে গড়ে উঠেছে সাততলা বস্তি। অবশিষ্ট ৫ একরের অবস্থাও জরাজীর্ণ।

মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে গিয়ে জানা যায়, ১৯৬২ সালে মহাখালীতে ট্রপিক্যাল মেডিসিন ইনস্টিটিউট নামে একটি প্রতিষ্ঠান চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন হাসপাতাল সংক্রামক রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থা জেনারেল হাসপাতালে না রেখে একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল করার দাবি জানায়। সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ট্রপিক্যাল মেডিসিন ইনস্টিটিউটের বদলে ৩৫ একর জমি এবং সাততলা ভবন নিয়ে যাত্রা করে মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল। কিন্তু  এখন হাসপাতালের সাততলা ভবন আর স্টাফ কোয়ার্টার নিয়ে সাকল্যে হাসপাতালের দখলে আছে মাত্র ৫ একর জায়গা। আর বাকি ৩০ একর ঘিরে গড়ে উঠেছে বস্তি, কাঁচাবাজার ও খাবার হোটেল। এখন এই সাততলা বস্তির নামেই মানুষকে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল চেনাতে হয়। গত বৃহস্পতিবার সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের দেয়াল ঘেঁষে গড়ে            উঠেছে দোচালা-চারচালা টিনের খুপরি ঘর। একটা ঘরের সঙ্গে এক ইঞ্চি ফাঁক না রেখেই তোলা হয়েছে আরেকটা ঘর। এভাবে হাসপাতালের জায়গা দখল করে বিশাল এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছে ঘিঞ্জি বস্তি। হাসপাতালের দেয়াল ভেঙে বানানো হয়েছে পকেট গেট। হাসপাতালের ভিতরে আম গাছের চারপাশে বাঁধানো বেদিতে বসে খোশগল্পে মেতেছেন বস্তির নারী-পুরুষরা। মাঝের ফাঁকা জায়গায় চলছে খেলাধুলা। এর মধ্যেই চিকিৎসা নিতে আসছেন রোগীরা। হাসপাতালের এক গেট দিয়ে ঢুকে আরেক গেট দিয়ে বস্তির ভিতরে যাতায়াত চলে ২৪ ঘণ্টা।

বস্তির ভিতর গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ ঘরেই ফ্যান চলছে, উচ্চস্বরে সাউন্ডবক্স থেকে ভেসে আসছে গান। এসব বস্তিঘরের কোনো হোল্ডিং নম্বর না থাকলেও রয়েছে গ্যাসের লাইন ও বিদ্যুতের মিটার। এ ছাড়া হাসপাতালের পাশের বিদ্যুতের পোল থেকেও অজস্র অবৈধ সংযোগ গিয়ে ঢুকেছে বস্তির ঘরগুলোতে। আর এসব লাইন থেকে ভাড়া নিয়ে চার্জ দেওয়া হচ্ছে এ রুটে চলাচলকারী ইজিবাইক আর মোটরচালিত রিকশায়। ঢাকায় এ দুই যান চলাচল অবৈধ ঘোষণা করা হলেও মহাখালী জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের মোড় থেকে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল পর্যন্ত রুটে যাতায়াতের জন্য রয়েছে শুধু এই দুটি বাহন। বস্তিতে দুই রুম নিয়ে আছেন বাসিন্দা ফিরোজা বেগম। তিনি বলেন, ‘বড় রুমের ভাড়া ১৪০০ টাকা আর ছোট রুমের ৮০০ টাকা। পাশের ঘরের বাসিন্দার সঙ্গে ভাগে বিদ্যুতের বিল দিই ৩০০ টাকা। এই মোট ২৫০০ টাকা। রফিক নামের একজন এই ভাড়া তুলে নিয়ে যায়। আমি বাসাবাড়িতে কাজ করি আর আমার স্বামী ভাড়ায় চার্জার রিকশা চালায়। তবে নিজেদের ঘরের বিদ্যুৎ সংযোগে রিকশা চার্জ দেওয়া যায় না। রিকশা মালিকের গ্যারেজে চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। এজন্য প্রতিদিন বিল দিতে হয়।’

হাসপাতালের দেয়াল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে কাঁচাবাজার। দুপুর গড়িয়ে বিকাল পড়তেই হাসপাতালের ভিতরে বসে দোকান। শুধু টিনের ঘর করেই থেমে নেই দখল। হাসপাতাল এলাকার পশ্চিম পাশের জমি দখল করে ইট ও রড দিয়ে ঘর বানানো হচ্ছে। এই নোংরা-দূষিত পরিবেশে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল নিজেই সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত। কথা হয় খিলক্ষেত এলাকার জাফর আলীর সঙ্গে। ছেলের শরীরে হাম ওঠায় তাকে নিয়ে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এসেছেন তিনি। জানতে চাইলে বললেন, ‘ছেলের শরীরে হাম উঠে বিপজ্জনক আকার ধারণ করেছে। চিকিৎসকরা হাসপাতালে ভর্তি করার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু এই নোংরা পরিবেশ দেখে এখানে ভর্তি করাতে ভয় পাচ্ছি।’

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. সুলতান মাহমুদ সুমন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, হাসপাতালের ৩৫ একর জায়গার ৩০ একরই দখল করে গড়ে উঠেছে বস্তি। আমরা মন্ত্রণালয়ে জানিয়েছি। তারা কয়েকবার পরিদর্শনও করে গেছে। হাসপাতালের দেয়াল ভেঙে পকেট গেট বানিয়েছে, বিকাল হলেই ভিতরে বাজার বসায়। কিছু বললে রাতে এসে হাসপাতালের লাইট, এসির বাইরের অংশ, ফ্যান এসব চুরি করে নিয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, হাসপাতালের দুই গেট দিয়ে বস্তির লোকজন রাতভর যাতায়াত করে। একবার আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে বড় লোহার গেট করে বিকালে তালাবদ্ধ করে দিতাম। কয়েক দিন যেতেই দেখি তালা এবং তালা আটকানোর ছিটকানি উধাও হয়ে গেছে। হাসপাতালের পাশের পুলিশ ফাঁড়িতে জানালেও তারা কোনো ব্যবস্থা নেয় না।


আপনার মন্তব্য