শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৯ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৮ মার্চ, ২০২১ ২৩:২৯

পরিবর্তনের লড়াইয়ে নারী শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা

প্রয়োজন সমান সুযোগ ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রয়োজন সমান সুযোগ ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন
নারী দিবস উপলক্ষে গতকাল গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা -বাংলাদেশ প্রতিদিন

দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের নারীদের অগ্রযাত্রা উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশে নারী নেতৃত্ব এখন বিশ্বের কাছে রোল মডেল। এমনকি চ্যালেঞ্জিং পেশাতেও নারীরা নিজেদের প্রমাণ করেছেন। এদেশের নারীরা ক্রমেই লিঙ্গ বৈষম্য কাটিয়ে উঠছেন। এমনকি নারীরা কাজের ক্ষেত্রে তার পুরুষ সহকর্মীর তুলনায় সব সময়ই নিবেদিত। এত কিছুর পরও সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গায় নারী এখনো পিছিয়ে আছে। প্রতিবাদ করার ক্ষেত্রে মেয়েদের সাহসের ঘাটতি আছে। করোনাকালীন সময়ে নারীর প্রতি সহিংসতাও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ জন্য সবক্ষেত্রে শুধু নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লে হবে না, তারা সমান সুযোগ পাচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করতে হবে। নারীর প্রতি সমাজে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। গতকাল আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে ‘পরিবর্তনের লড়াইয়ে নারী’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের কনফারেন্স রুমে বাংলাদেশ প্রতিদিন ও বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেল নিউজ টোয়েন্টিফোর এর আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নূরজাহান বেগম মুক্তা বলেন- সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দেশের নারীদের অগ্রযাত্রা প্রশংসার যোগ্য। নারীর লড়াই অনাদিকাল থেকেই চলছে। আমরা লিঙ্গ বৈষম্য কাটিয়ে উঠেছি। কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনকূটনীতি অনুবিভাগের পরিচালক আরিফা রহমান রুমা বলেন, নারীর কাজের জন্য কোনো কোটা বা সহানুভূতির প্রয়োজন নেই। হাঁটতে চলতে গিয়ে নারীরা প্রতিনিয়ত অবমাননার শিকার হচ্ছেন। তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। শুধুমাত্র নারী হওয়ার কারণে সম্পত্তির ক্ষেত্রে নারীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ডা. জাহানারা আরজু বলেছেন, চ্যালেঞ্জিং পেশায় নারীরা নিজেদের প্রমাণ করেছেন। কর্মক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব নিয়ে সচেতন হতে হবে। নারীর অধিকার এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রহিমা আক্তার লাকী বলেছেন, সব প্রতিকূলতা পার করে নারীদের টিকে থাকতে হবে। সবক্ষেত্রে শুধু নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লে হবে না। তারা সমান সুযোগ পাচ্ছেন কি না সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেডের হেড অব নেটওয়ার্ক সেলিনা আলম বলেন, সামাজিকভাবে ব্যাংকিং পেশায় যে নারীরা আছেন তারা সম্মানজনক পেশায় জড়িত বলে ধারণা করা হয়। তাদের একটু ভিন্ন দৃষ্টিতেই দেখা হয়। নারীরা কাজের ক্ষেত্রে পুরুষ সহকর্মীর তুলনায় সবসময়ই নিবেদিত। তবে মেয়েদের সাহসের ঘাটতি আছে। কাজের ক্ষেত্রে কিছু বিরূপ জায়গা থাকবেই আর এই পরিস্থিতি বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।

ইউনাইটেড হাসপাতালের কমিউনিকেশন অ্যান্ড বিজনেস ডেভেলপমেন্ট বিভাগের পরিচালক ডা. শাগুফা আনোয়ার বলেন, প্রতি তিনজন নারী হৃদরোগীর মধ্যে একজন মারা যান। প্রতি দুজন শনাক্ত ব্রেস্ট ক্যান্সার রোগীর মধ্যে একজন মারা যান। প্রতি ১০০ নারীর মধ্যে শতকরা ৭০ শতাংশ নারী হাড়ক্ষয়জনিত রোগের ঝুঁকিতে থাকেন। প্রতি ১০০ নারীর মধ্যে ৩০ জন নারী স্ট্রোকের ঝুঁকিতে থাকেন। কাজেই নারীকে তার স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ড. সুমাইয়া মামুন সিমরান বলেন, নারীর পুষ্টি বিষয়ে সমাজে অনেকটা সচেতনতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু নারীর ভাবনা প্রকাশ করার অধিকার থাকতে হবে। মা হিসেবে সন্তানদের নারীকে সম্মান করা শেখাতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান খন্দকার ফারজানা রহমান বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলার নারীদের এই অগ্রযাত্রা উল্লেখযোগ্য। কিন্তু নারীর প্রতি সহিংসতা থামেনি। অর্থনৈতিকভাবে নারীকে ক্ষমতায়িত করতে স্বামীর সম্পত্তিতে স্ত্রীর সমান অধিকার বিষয়ক আইনের দাবি জানান তিনি।

ক্রীড়া সংগঠক ও ব্যবসায়ী নাফিসা কামাল বলেন, বছরের ৩৬৫ দিন আমি একজন গর্বিত বাংলাদেশি নারী। বাংলাদেশের নারী নেতৃত্ব এখন বিশ্বের কাছে রোল মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নারীরা এখন নেতৃত্ব প্রদানে পিছিয়ে আছে। তবে ক্রীড়াঙ্গনেও নারীরা ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়। ক্রীড়াঙ্গনে নারীরা এখনো অনিরাপদ। আমাদের নারী ক্রিকেটারদেরও ভাষ্য, তারা প্রশিক্ষণের সময় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। দুঃখজনক যে নারী ক্রীড়াবিদদের অধিকার আদায়ে এখনো কোনো সংগঠন তৈরি হয়নি।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের শিক্ষক অনিমা রায় বলেন, যে নারীরা ভুক্তভোগী তাদের একটি দরজা বন্ধ হলে আরেকটি দরজা খুলে দিতে হবে। যে নারী পরিবারের সবাইকে ভালোবেসে আগলে রাখেন তাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করে দিতে হবে।

নারী অধিকারকর্মী মাহফুজা মালা বলেন, উচ্চশিক্ষায় নারীদের প্রবেশাধিকার বেড়েছে। কর্মক্ষেত্রেও নারীর যোগদান বেড়েছে। অ্যাসিড সন্ত্রাস রুখে দেওয়ার ক্ষেত্রে সফলতা দেখছি। করোনাকালীন সময়ে নারীর প্রতি সহিংসতা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু করোনাকালীন সময়ে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আমরা প্রতিবাদ করতে পারছি না। মহামারীর প্রথম ১০ মাসে এক হাজারেরও বেশি নারী ধর্ষণের শিকার হয়। এর মধ্যে চারশরও বেশি দলগত ধর্ষণের শিকার হয়। আবার ধর্ষণের পর একজন ভিকটিমকে যে বিচার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয় নারীর জন্য তা অনুকূল নয়। নারীর সুবিচার পাওয়ার হার খুব কম। বাল্যবিয়ের ক্ষেত্রে এখনো আমাদের অনেক কাজ করার আছে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গায় নারী এখনো পিছিয়ে আছে।

জনপ্রিয় অভিনেত্রী মৌটুসী বিশ্বাস বলেন, জীবন চলার পথে আমরা পুরুষের অনেক সহযোগিতা পাই। তবে পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন করতে হবে। সন্তানদের বড় করার সময় ছেলেমেয়ে ভেদে বৈষম্য করা যাবে না। মানুষ হওয়ার শিক্ষা বাড়ি থেকে শুরু হতে হবে।

বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজাম বলেন, নারী দিবস শুধু এক দিনের নয়, প্রতিটি দিনই নারীর দিন। প্রতি দিনই নারীর সংগ্রামের দিন। নারী বা পুরুষ নয়, মূল্যায়নের অংশে সবাইকে মানুষ হিসেবে মনে করতে হবে। আজ শুধু দেশে নয় গোটা বিশ্বে নারী কিন্তু আর আগের জায়গায় নেই। গ্রামের অবকাঠামোর উন্নয়নের কথা যদি বলি কিংবা শহরের বিশাল ভবন নির্মাণ এমনকি মধ্যপ্রাচ্যে যে নারীরা রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবে কাজ করছেন তারা আমাদের জিডিপিতে যে অবদান রাখছেন তার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ গড়ে উঠছে। নারীর সংগ্রাম অনেক আগের। নারীর প্রতি সামাজিক ও আর্থিক বৈষম্য আগেও ছিল তা আগামীতেও থাকবে। যারা এখনো অনগ্রসর নারী তাদের জন্য কীভাবে কাজ করা যায় সেটিই আমাদের লড়াই হবে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) নাসির উদ্দিন আহমদ বলেন, নারীরা অনেক এগিয়েছেন। কিন্তু এখনো নৌকায় করে বাংলাদেশের নারীকে কেন সাগর পাড়ি দিতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যে নারীরা বর্ণনাতীত নির্যাতনের শিকার হন। নারী শ্রমিকরা যেসব দেশে আছেন সে দেশগুলোর দূতাবাসে নারী কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ভাবতে হবে।

কথাশিল্পী ও কালের কণ্ঠের সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন ধন্যবাদ প্রস্তাবনা দিয়ে বলেন, নারীর পরিবর্তনের যে লড়াইয়ের কথা আমরা বলছি এই লড়াই আসলে অনেক দিন আগেই শুরু হয়েছে। কিন্তু আমাদের লড়াইয়ের গতি খুব তীব্র না। আমরা এখনো নারীর প্রতি সম্মান দেখাতে শিখিনি। আসুন নারীকে সম্মান করার যে বিষয় তার চর্চা ঘর থেকে শুরু করি।

নিউজ টোয়েন্টিফোরের প্রধান বার্তা সম্পাদক শাহনাজ মুন্নী অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর