শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ২৬ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৫ জুলাই, ২০২১ ২৩:৪১

রক্তের দাগের শেষ মাথায় খুনির সন্ধান

মির্জা মেহেদী তমাল

রক্তের দাগের শেষ মাথায় খুনির সন্ধান
Google News

খোলা একটি টয়লেটের রিংয়ে পা উপুড় করা অবস্থায় পাওয়া যায় জুলেখা বেগমের লাশ। জুলেখার গলায় একটি গামছা পেঁচানো। পুলিশ লাশটি ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখছে। পুলিশের ধারণা, ৪৫ বছরের জুলেখা বেগমকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। শরীরে কোনো জখমের চিহ্ন নেই। তবে ল্যাট্রিনের পাশে ছিল ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। লাশের গা থেকে কোনো রক্ত ঝরেনি। তাহলে এই রক্ত কার? এ প্রশ্নের জবাব খুঁজতে পুলিশ রক্তের দাগের পিছু নেয়। ২০২০ সালের ১৪ আগস্ট রাতে লাশ উদ্ধারের পর পুলিশ খুনির সন্ধানে মাঠে নামে। ঘটনাটি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ এলাকার। রাত ১১টা থেকে পুলিশ রক্তের দাগের পিছু নেয়। এগিয়ে যেতে থাকে পুলিশ। কিন্তু কিছুদূর এগিয়ে যেতেই আর রক্তের দাগ নেই! তাহলে রক্তের পরবর্তী চিহ্ন কোন দিকে যেতে পারে। তখন আবার চারদিকেই রক্তের দাগের খোঁজ করতে থাকে। কিছুদূর পর আবারও পাওয়া যায় রক্তের দাগ। পুুলিশ পিছু নিতে থাকে। কিন্তু আবারও সেই একই সমস্যা। আবারও নেই রক্তের দাগ। আবার খোঁজ চারপাশজুড়ে। পুলিশের দল খুঁজে পায় রক্তের ফোঁটার দাগ। এভাবেই পুলিশ রক্তের দাগের পেছনে ছুটতে থাকে। দীর্ঘ চার ঘণ্টা এভাবেই পুলিশ রক্তের দাগের পেছনে ছুটে একটি গরুর খামারের কাছে গিয়ে হাজির। পুলিশ দেখতে পায় রক্তের দাগ চলে গেছে খামারের ভিতরে। পুলিশ নিশ্চিত, খুনির অবস্থান খামারেই। তখনই পুলিশ অভিযান চালাতে চায় না। দিনের আলোর অপেক্ষায় পুলিশ। সকাল হয়। ইতিমধ্যে পুলিশের আরও কিছু সদস্য সেখানে এসে হাজির। সকাল ১০টায় মোল্লাটিলা এলাকার ওই গরুর খামারে অভিযান চালায় পুলিশ। পুলিশ ভিতরে গিয়েই দেখতে পায় সদ্য পা কাটা এক যুবক বসে আছে। তার নাম রোকন ওরফে কালু। পাশেই বসা ছিল তার বন্ধু ইন্দ্র। পুলিশ দুজনকে সেখানেই জেরা করে। কিন্তু বেশিক্ষণ সময় লাগেনি। খুনের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করে নেয়। কালু ও ইন্দ্রর তথ্য মতে, সেখান থেকে আরও এক যুবককে গ্রেফতার করে। এই তিনজনই আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হওয়া জুলেখা তার দুই ছেলেকে নিয়ে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের মাইজগাঁওয়ের মোল্লাটিলা এলাকার একটি ভাড়া করা বাসায় থাকতেন। দুই ছেলে ওয়ার্কশপে কাজ করেন। প্রতিদিন সকালে কাজে যান, কাজ শেষে ঘরে ফেরেন সন্ধ্যায়। ঘরে ফিরে দৈনিক রোজগারের টাকা মায়ের হাতে তুলে দিতেন। জুলেখা তার দুই ছেলের রোজগার থেকে কিছু টাকা জমিয়ে রাখতেন। এই টাকা দিয়ে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিনে দেবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন জুলেখা। জুলেখা তত দিনে ৮ হাজার ৮৬৮ টাকা জমিয়েছিলেন। এ কথা জুলেখা তার ছেলে রুমনকে জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আর কিছু টাকা জমাতে পারলে, তোদের একটি অটো কিনে দিব। তাহলে তোদের কষ্ট অনেক কমবে। রুমন তার মায়ের এই সিদ্ধান্তের কথা শুনে অবাক হন। সে নিজেও জানত না, তাদের মা তাদের জন্য টাকা জমাচ্ছেন। খুশিতে এ কথা রুমন তার বন্ধু কালুকে বলেছিলেন।

১৪ আগস্ট সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে মা জুলেখাকে পায়নি দুই ছেলে। ঘর তছনছ থাকায় প্রতিবেশীদের নিয়ে মাকে খোঁজাখুঁজি করতে থাকে। ঘর থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে একটি খোলা ল্যাট্রিনের মধ্যে মায়ের লাশ তারা খুঁজে পায়। ফেঞ্চুগঞ্জ থানা পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। রাত ১১টার দিকে পুলিশ এসে লাশটি উদ্ধার করে। গ্রেফতারকৃত কালু পুলিশকে বলেছে, জুলেখার ছেলে রুমন তার বন্ধু। টাকা জমানোর কথা জানতে পেরেছিল রুমনের কাছ থেকেই। রুমন কথায় কথায় টাকা জমানোর কথা বলেছিল কালুর কাছে। কালু সেই টাকা চুরির পরিকল্পনা আঁটে। সন্ধ্যার পর সেই টাকা চুরি করতে জুলেখার ঘরে ঢোকে তারা তিনজন। এ সময় জুলেখা বাধা দিলে তাকে গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করে লাশ ল্যাট্রিনে ফেলে দেয় তারা। লাশ ফেলার সময় কালুর বাঁ পায়ে কাচের টুকরার আঘাতে কেটে যায়। কাটা পা থেকে রক্ত ঝরছিল, যা দেখে পুলিশ খুনি শনাক্ত করে।

এই বিভাগের আরও খবর