শনিবার, ৩১ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ টা

বন্যায় তলিয়ে যাচ্ছে নতুন নতুন এলাকা

টানা বৃষ্টিতে ডুবে গেছে চিংড়ি ঘের, ভোগান্তি পানিবন্দী মানুষের

প্রতিদিন ডেস্ক

বন্যায় তলিয়ে যাচ্ছে নতুন নতুন এলাকা

ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের কিছু এলাকায় নতুন করে বন্যা দেখা দিয়েছে। কক্সবাজারে মাতামুহুরী নদীতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চকরিয়া পৌর শহর রক্ষা বাঁধ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বাগেরহাটে টানা বৃষ্টিতে ডুবে গেছে ১৭ হাজার চিংড়ি ঘের ও পুকুর।

চকরিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি জানান, চকরিয়ায় মাতামুহুরী নদীতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে পৌর শহর রক্ষা বাঁধ ভাঙার উপক্রম হয়েছে। উজান থেকে নেমে আসা পানির ধাক্কায় বাঁধটির টলমলে অবস্থা।  ফাটল ধরেছে বাঁধে। যে কোনো সময় ভেঙে যেতে পারে বাঁধটি। গত এক সপ্তাহে অন্তত ৫০ গজ ভূমিসহ ছয়টি ঘর বিলীন হয়ে গেছে। এ অবস্থায় শহর রক্ষা বাঁধের অপর পাশের বাসিন্দারা রয়েছেন চরম আতঙ্কে। তাদের এখন ঘুম হারাম অবস্থা। নারী-পুরুষ একাট্টা হয়ে বাঁধ পাহারা দিচ্ছেন। ভাঙন বাঁধ পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ায় আতঙ্ক আরও বেড়ে গেছে তাদের। ফলে শতাধিক ঘরের সদস্য মালামাল অন্যত্র নিয়ে গেছেন। সরেজমিন ঘুরে ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টানা চার দিনের ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা বন্যার পানির তোড়ে বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে হঠাৎ করে শহর রক্ষা বাঁধে ফাটল দেখা দেয়। এর কিছুক্ষণ পর বাঁধের একটি অংশ নদীর              পানিতে তলিয়ে যায়। এতে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে বাঁধ সংলগ্ন স্থানীয় বাসিন্দারা। পরে স্থানীয় এমপি ও মেয়রসহ বিভিন্ন জনপ্রতিনিধিদের খবর দেন। সঙ্গে সঙ্গে তারা ঘটনাস্থলে এসে স্থানীয়দের সহায়তার বালুর বস্তা ও মাটি ফেলে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা চালান। এ দিন রাতে কোনো রকমে বাঁধটি রক্ষা করা হলেও কতক্ষণ টিকে থাকবে তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা এহেছানুল হক বলেন, জরুরি ভিত্তিতে বাঁধটি স্থায়ীভাবে টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা না হলে শত শত পরিবার আশ্রয়স্থল হারিয়ে পথে বসবে। আর এসব আশ্রয়হীন পরিবারগুলোকে পুনর্বাসন করার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানান। স্থানীয়ভাবে লোকজনের সহায়তায় বালুর বস্তা বাঁধের ওপর ফেলে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা করা হচ্ছে।

কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজার জেলায় বন্যায় ৪ লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। পাহাড়ি ঢলে আরও নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। টানা বর্ষণ কমে এলেও থেমে থেমে বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। জেলার ৫১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় ৫২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। দুর্ভোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। ঢলের পানিতে ভেসে গিয়ে চকরিয়া ও পেকুয়ায় আরও ২ শিশু মারা গেছে। কক্সবাজারে ভারী বর্ষণে পাহাড়ধস ও ঢলের পানিতে ডুবে গত চার দিনে ৬ রোহিঙ্গাসহ ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলার প্রধান নদী বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। চকরিয়া ও পেকুয়ায় মাতামুহুরী নদীর উভয় পাশে বেড়িবাঁধ ভেঙে বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে আশপাশের এলাকা। চকরিয়া উপজেলা সরকারি খাদ্য গুদাম বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। রামু ও সদরের বাঁকখালী নদীর উভয় পাড়ে বিশাল এলাকা বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে রামু-ঈদগড় সড়ক ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। পানিবন্দী এসব মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। রামু-ঈদগড় সড়কের পানের ছড়া ঢালায় বিরাট অংশ ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কক্সবাজার- টেকনাফ সড়কের মিঠাছড়ি এলাকা পানিতে ডুবে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।

বাগেরহাট প্রতিনিধি জানান, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে তিন দিন ধরে বাগেরহাটে অবিরাম বৃষ্টি হয়েছে। তবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে এর বেগ কমে আসে। এ অবস্থায় শরণখোলা উপজেলার ৭০ হাজারের অধিক মানুষসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে লাখো মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। শরণখোলা উপজেলা প্রশাসন থেকে বলা হয়েছে, উপজেলার ৯০ ভাগ মানুষ এখনো পানিবন্দী রয়েছেন। উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধের মধ্যে থাকায় ও নদীর পানিতে উচ্চতা থাকায় বৃষ্টির পানি নামতে না পারায় জলাবদ্ধতা কমছে না। মোংলা, রামপাল, মোরেলগঞ্জ ও বাগেরহাট সদর উপজেলার নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করলেও এসব উপজেলায় ৭০ হাজারের অধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে আছেন। এদিকে উপকূলীয় বাগেরহাটে টানা বৃষ্টির পানিতে ১৭ হাজার চিংড়ি ঘের ও পুকুর ভেসে গেছে। বাগেরহাট জেলা চিংড়ি চাষি সমিতির সভাপতি ফকির মহিতুল ইসলাম বলেন, বাগেরহাটে টানা বৃষ্টির পানিতে কয়েক হাজার মাছের ঘের ভেসে গেছে। এতে ২০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে চাষিদের।

বাগেরহাট মৎস্য বিভাগের বিভাগীয় মৎস্য কর্মকর্তা (ডিএফও) এ এস এম রাসেল বলেন, গত দুই দিনের অতিবৃষ্টি ও প্রবল জোয়ারের পানিতে জেলার ৪৭টি ইউনিয়নে ১৭ হাজার চিংড়ি ঘের ও পুকুরের মাছ পানিতে ভেসে গেছে। সব মিলিয়ে মাছের ঘের ভেসে ১১ কোটি টাকার ক্ষতির হিসাব পেয়েছি। বৃষ্টিপাতের ধারা অব্যাহত থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এই মৎস্য কর্মকর্তা।

মঠবাড়িয়া (পিরোজপুর) প্রতিনিধি জানান, মঠবাড়িয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলে প্রবল ভারী বর্ষণ ও লঘুচাপের প্রভাবে সৃষ্ট জলাবদ্ধ পানিতে ডুবে মুনিরা (৪) নামে এক শিশুর মৃতু হয়েছে। গতকাল সকালে দক্ষিণ বড় মাছুয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। মুনিরা ওই গ্রামের জসীম আকনের মেয়ে। জানা গেছে, প্রবল ভারী বর্ষণ ও লঘুচাপের প্রভাবে উপকূলের অধিকাংশ বাড়ির উঠোন/আঙিনা তলিয়ে গেছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্রবল বর্ষণ ও লঘুচাপের প্রভাবে উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় প্রায় ১২০০ হেক্টর জমির আউশ ফসল (পাকা ধান) ও ৪১০ হেক্টর জমির আমন মৌসুমের বীজতলা পানিতে তলিয়ে রয়েছে। ৩৫০ হেক্টর জমির শসা, চাল কুমড়া, পেপে, করল্লাসহ বিভিন্ন প্রজাতির সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া শতাধিক হেক্টর জমির বিভিন্ন ফল বাগান আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।