বুধবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ টা

খুন বনানীতে লাশ গাজীপুরে

মির্জা মেহেদী তমাল

খুন বনানীতে লাশ গাজীপুরে

গাজীপুরের কালীগঞ্জের উলুখোলা রায়েরদিয়া সড়কের পাশে বাঁশঝাড়ে বস্তাবন্দী পোড়া লাশ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় মানুষ। তারা উলুখোলা পুলিশ ফাঁড়িতে খবর দেয়। পুলিশ গিয়ে লাশ উদ্ধার করে। পরনের প্যান্ট ও কোমরের বেল্ট দেখে পরিবারের সদস্যরা লাশটি শনাক্ত করেন। লাশ পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) পরিদর্শক মামুন ইমরান খানের। যেটি ২০১৮ সালের ১০ জুলাই উদ্ধারের পর হতবাক পুলিশ প্রশাসন। একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে এভাবে হত্যার পর আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হলো কেন? কী এমন অপরাধ করেছিলেন পুলিশের এই কর্মকর্তা? খুনি কারা? এমন নানা প্রশ্ন নিয়ে পুলিশ তদন্ত শুরু করে।

মামুনের পরিবার বলছে, ৮ জুলাই অফিস শেষে ঢাকার বাসাবোর বাসায় ফেরেন বিকালে। সন্ধ্যার দিকে মোটরসাইকেল নিয়ে বেরিয়ে যান। এরপর মামুনের কোনো খবর নেই। ঢাকার নবাবগঞ্জের রাজরামপুরের মৃত আজহার আলী খানের ছয় ছেলেমেয়ের মধ্যে সবার ছোট মামুন লেখাপড়া করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে।

২০০৫ সালে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর তিনি শান্তিরক্ষা মিশনেও দায়িত্ব পালন করেন। খুন হওয়ার সময় তার কর্মস্থল ছিল শান্তিনগরে পুলিশের বিশেষ শাখার ট্রেনিং স্কুল। অবিবাহিত মামুন বড় ভাই জাহাঙ্গীরের সঙ্গে থাকতেন তার সবুজবাগের বাসায়। কৈশোর থেকেই অভিনয়ের ঝোঁক ছিল মামুনের। টেলিভিশনে কয়েকটি নাটকে অভিনয়ও করেছেন তিনি। অপরাধ বিষয়ক ক্রাইম ফিকশন নামে সিরিজ নাটকে নিয়মিত অভিনয় করতেন তিনি। পুলিশ তদন্ত করতে গিয়ে সন্ধান পায় ভয়ংকর এক চক্রের। যারা অভিজাত এলাকায় আস্তানা গেড়ে ব্ল্যাকমেলিং করে আসছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে। তদন্তে বেরিয়ে আসে বিভিন্ন অপরাধমূলক নাটকে অভিনয়ের সূত্র ধরে যাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল, তাদের ফাঁদে পড়েই খুন হন মামুন। বেরিয়ে এসেছে খুনের আদ্যোপান্ত। বন্ধু রহমত উল্লাহর সঙ্গে চক্রের দাওয়াতে গিয়েই মামুন খুনের শিকার হন। রহমত উল্লাহ পেশায় একজন প্রকৌশলী। মামুনের সঙ্গে তার চার থেকে পাঁচ বছর ধরে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। তারা দুজনে বিভিন্ন নাটক ও সিরিয়ালে অভিনয় করতেন। তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ জানতে পারে ভয়ংকর ওই চক্রের লিডার হলেন রবিউল। তার বাসা বনানীতে। চক্রে আরও রয়েছে রবিউলের স্ত্রী সুরাইয়া আক্তার কেয়া, স্বপন সরকার, দিদার পাঠান, মিজান শেখ, আতিক হাসান, সারোয়ার হোসেন এবং আরও দুই কিশোরী। টেলিভিশনে একটি ক্রাইম ফিকশনে অভিনয়ের সূত্র ধরে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার রহমত উল্লাহর সঙ্গে পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয় পুলিশ কর্মকর্তা মামুনের। নাটকের সূত্রেই তাদের সঙ্গে এক কিশোরীর পরিচয় হয়, যে রবিউলের চক্রের একজন সদস্য। রবিউলের স্ত্রী কেয়াকে ওই কিশোরী এক দিন বলে, রহমত উল্লাহকে ফাঁদে ফেলে মোটা টাকা আদায় করা সম্ভব। তার টাকা পয়সা বেশ আছে। সে অনুযায়ী তৈরি হয় জন্মদিনের নাটকের ছক। ২০১৮ সালের ৮ জুলাই সন্ধ্যায় বনানীর বাসায় ওই কিশোরীর ‘জন্মদিনের অনুষ্ঠানে’ দাওয়াত দেওয়া হয় রহমত উল্লাহকে। দাওয়াত পেয়ে রহমত উল্লাহ তার বন্ধু মামুনকেও সঙ্গী হতে অনুরোধ জানায়। মামুন রাজি হন। মোটরসাইকেল নিয়ে সন্ধ্যায় হাজির হন মামুন। তারা একত্র হয়ে ওই বাড়ির সামনে অপেক্ষা করেন। ওই কিশোরী দুজন নারীকে সঙ্গে নিয়ে তাদের সঙ্গে দেখা করতে আসে। দুই নারীর একজনকে বোন, অন্যজনকে ভাবি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়ে রহমত ও মামুনকে বাসার ভিতরে নিয়ে যায়। বাসায় গিয়ে তারা (রহমত উল্লাহ ও মামুন) দেখেন, জন্মদিনের কোনো আয়োজন নেই। রহমত উল্লাহ তখন ওই কিশোরীকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘তোমাদের নাকি বার্থডে পার্টি, কিন্তু কিছু তো দেখছি না।’ রবিউলের স্ত্রী কেয়া তখন বলেন, ‘প্রতিদিন আমাদের পার্টি এরকমই হয়। একটু পরই দেখতে পাবেন।’

কেয়া ওই ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর স্বপন, দিদার, আতিক ও মিজান ঘরে ঢোকেন। শুরু হয় পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। তারা মামুন ও রহমতের উদ্দেশে বলে, ‘বাজে উদ্দেশ্য নিয়ে তোরা এখানে এসেছিস।’ মামুন প্রতিবাদ করলে সঙ্গে সঙ্গে ওই চারজন তাকে মারতে শুরু করে। তাদের একজন বলে, ‘ওই ওদের হাত-পা বেঁধে ফেল। মেয়েদের সঙ্গে ছবি তুলে টাকা আদায় করা হবে।’ স্বপন, আতিক ও দিদার তখন মামুনকে চেপে ধরে এবং তার হাত-পা বেঁধে ফেলে। মামুন তখন নিজের পরিচয় দিয়ে বলেন, আমি পুলিশের লোক। তোদের বিপদ করে ফেলব। তখন বাসার লোকজন ঘাবড়ে যায়। মিজান মামুনের মুখ চেপে ধরে। মামুন তার হাতে কামড় বসিয়ে দেন। তখন মিজান ও দিদার পেছন থেকে মামুনের ঘাড়ে আঘাত করে এবং আতিক জোরে লাথি মারলে মামুন সংজ্ঞা হারান। রহমত উল্লাহকেও তখন বেঁধে ফেলে রাখা হয়। রাত ১২টার দিকে স্বপন বুঝতে পারে, মামুনের হাত-পা শক্ত হয়ে গেছে। রবিউলকে সে ফোনে বিষয়টি জানায়। এরপর রবিউলের পরামর্শে স্বপন, আতিক ও দিদার ধারালো অস্ত্র দিয়ে মামুনের পায়ের আঙুল কেটে পরীক্ষা করে। রক্ত বের না হওয়ায় তারা নিশ্চিত হয়, পুলিশ কর্মকর্তা মামুনের মৃত্যু হয়েছে। স্বপন আর দিদার তখন রবিউলকে ফোন করে বড় একটি ট্রলি বা বস্তা নিয়ে আসতে বলে। সকাল ৭টার দিকে স্বপন, দিদার ও আতিক লিফট দিয়ে মামুনের লাশ নিচে নামিয়ে আনে। মামুনের বন্ধু রহমত উল্লাহকে তাদের সঙ্গে থাকতে বলে তার প্রাইভেট কার বের করতে বলে। গাড়িতে লাশ তোলা হয়। রহমত উল্লাহই তার গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যান। দিদার, আতিক, স্বপন ও মিজানও ছিলেন ওই গাড়িতে। দলের নেতা রবিউল মোটরসাইকেলে যান সামনে সামনে। গাড়িটি গাজীপুর কালীগঞ্জের উলুখোলায় বাঁশঝাড়ের সামনে পৌঁছলে, স্বপন গাড়ি থামাতে বলে। গাড়ি থেকে লাশ নামিয়ে বাঁশঝাড়ের মধ্যে নিয়ে রাখে। আতিক ও স্বপন পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর রহমত উল্লাহ গাড়ি চালিয়ে ঢাকায় ফিরে আসেন। তিন দিন পর রায়েরদিয়া সড়কের পাশের ওই জংলা এলাকায় বস্তাবন্দী পোড়া লাশ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা উলুখোলা পুলিশ ফাঁড়িতে খবর দেয়। পরে পুলিশ গিয়ে লাশ উদ্ধার করে, পরনের প্যান্ট ও কোমরের বেল্ট দেখে পরিবারের সদস্যরা মামুনের পরিচয় শনাক্ত করেন। তদন্তে নেমে প্রথমেই রহমত উল্লাহকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। পরে গ্রেফতার করা হয় সুরাইয়া আক্তার কেয়া, মিজান শেখ ও দুই কিশোরীকে। পরে তাদের মধ্যে তিনজনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যা রহস্য স্পষ্ট হয়। মিজান ও কেয়াকে গ্রেফতারের পর তাদের জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার আবদুল বাতেন বলেছিলেন, ‘ওই চক্রের টার্গেট ছিল রহমত উল্লাহকে ওই বাসায় আটকে ছবি তুলে ব্ল্যাকমেল করে তার কাছ থেকে টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেওয়া। কিন্তু মামুন যাওয়ায় এবং নিজেকে পুলিশ বলায় তাদের সব পরিকল্পনা এলোমেলো হয়ে যায়।’ পুলিশ এ মামলায় ১০ জনকে আসামি করে আদালতে চার্জশিট দিয়েছে।

এই রকম আরও টপিক