শনিবার, ২ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ টা

জীবন হয়ে উঠছে অ্যাপনির্ভর

অর্থ লেনদেন, যানবাহন সেবা, খাবার ওষুধ ও বাজারের অর্ডার সব হয়ে যাচ্ছে এক ক্লিকে

জিন্নাতুন নূর

জীবন হয়ে উঠছে অ্যাপনির্ভর

বেসরকারি কর্মকর্তা এহসানুল আজিম রাজধানীর বাসাবো এলাকায় তিন বন্ধুসহ একটি ভাড়া বাসায় থাকেন। সম্প্রতি করোনা আক্রান্ত হয়ে ঘরেই আইসোলেশনে আছেন। পরিবারের কেউ সঙ্গে না থাকায় ‘ফুডপান্ডা’ ‘পাঠাও ফুড’ থেকে খাবার অর্ডার করে খাচ্ছেন। এহসানুল বলেন, ‘আমার করোনা হওয়ায় বন্ধুরা বাইরে খাচ্ছে। বুয়াকে আপাতত বাসায় আসতে নিষেধ করেছি। ফুডপান্ডা অ্যাপে পছন্দের খাবার অর্ডার করলে আধা ঘণ্টার মধ্যে ঘরের সামনে পৌঁছে যাচ্ছে। আবার ‘বিকাশ’ অ্যাপ ব্যবহার করে খাবারের দাম পরিশোধ করছি। ফলে ডেলিভারি ম্যানকে হাতে নগদ টাকা দেওয়ার ঝামেলাও থাকছে না। শুধু খাবার নয়, ‘আরোগ্য’ নামের এক অ্যাপের মাধ্যমে ওষুধ আনিয়েছি ঘরে বসেই। মিরপুর ডিওএইচএসের বাসিন্দা মো. রেজওয়ান একজন বাইকার। সম্প্রতি অফিস থেকে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন। পায়ে প্লাস্টার থাকায় চিকিৎসকের কাছে নিয়মিত ফলোআপ চিকিৎসার জন্য কীভাবে যাবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন। শেষ পর্যন্ত ‘উবার’ অ্যাপ ডাউনলোড করেন। এক মাস ধরে তিনি এই অ্যাপে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন।  রেজওয়ান জানান, সুস্থ হলেও আগামীতে প্রয়োজন ছাড়াও অ্যাপভিত্তিক রাইড নিয়েই গন্তব্যে যাবেন। এতে তিনি অনেকটা নির্ভার হয়ে যাতায়াত করতে পারবেন বলে মনে করছেন।

মোহাম্মদপুরের এনজিও কর্মকর্তা নীলিমা আক্তার। তিন মাসের গর্ভবতী এই নারীর কর্মস্থল পল্টনে। আগে গণপরিবহনে যাতায়াত করলেও নিজের ও সন্তানের সুরক্ষার কথা ভেবে এখন আর বাসে-রিকশায় যাতায়াত করছেন না। ‘ও-ভাই’ নামক মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে সিএনজি অটোরিকশায় তার কর্মস্থলে যাচ্ছেন। নীলিমা বলেন, ‘নিজের এখনো কোনো ব্যক্তিগত গাড়ি কেনা হয়নি। এ জন্য আমার জন্য ও-ভাই নামক সিএনজিচালিত অটোরিকশার সেবাটিই এখন সবদিক থেকে সাশ্রয়ী এবং উপযুক্ত।’ পল্লবীর গৃহিণী তানিয়া আক্তার। স্বামীর কর্মস্থল ঢাকার বাইরে হওয়ায় ঘরের বাজার-সদাইসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য এই গৃহিণীকে একাই বাজার বা পাড়ার দোকান থেকে কিনে আনতে হতো। সম্প্রতি তিনি ‘চালডাল’ নামক অ্যাপ ব্যবহার শুরু করেছেন। এর ফলে কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে ফলমূল ও বাচ্চার খাবার সবই তিনি প্রয়োজন মতো অ্যাপটিতে অর্ডার দিয়ে সকালে নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য বুঝে পাচ্ছেন।  

ব্যবহারকারীরা বলছেন, মানুষের জীবন ক্রমেই অ্যাপনির্ভর হয়ে উঠছে। একসময় যেসব সেবা পেতে একজনকে ঘরের বাইরে বের হতে হতো তা এখন মানুষ ঘরে বসেই মোবাইলে ডাউনলোড করা অ্যাপের একটি  ক্লিকেই হয়ে যাচ্ছে। কয়েক বছর আগেও মানুষ চিন্তা করতে পারেনি জীবন এত সহজ হয়ে উঠবে। আগে যেখানে ব্যাংকের লাইনে দাঁড়িয়ে মানুষকে অর্থ তুলতে হতো এখন মোবাইল ব্যাংকিং ও ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের কারণে আর ব্যাংকে দাঁড়িয়ে টাকা ওঠানোর প্রয়োজন নেই। স্ব স্ব ব্যাংকের অ্যাপ থেকেই ডিজিটাল মাধ্যমে টাকা প্রয়োজন মতো খরচ করা যাচ্ছে। ‘বিকাশ’ ও ‘নগদ’-এর মতো অ্যাপগুলো মানুষের জীবন-যাত্রাকে আরও একধাপ সহজ করে তুলেছে। দেশের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় দ্রুত সময়ের মধ্যে অর্থের লেনদেন যেমন হচ্ছে তেমনি মোবাইল রিচার্জ, বিদ্যুৎ-পানি ও গ্যাসের বিল দেওয়ার কাজগুলোও এই অ্যাপগুলোর কারণে সহজ হয়ে উঠেছে। আবার বাস, প্লেন ও রেলের যাতায়াতের জন্য টিকিট কাটতে মানুষ এখন ‘সহজ’, বিভিন্ন এয়ারলাইনস অ্যাপ, ‘রেল সেবা’-এর মতো অ্যাপগুলো ব্যবহার করছেন। একসময় যেখানে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য যাত্রীকে কমলাপুর, এয়ারপোর্টসহ রাজধানীর বিভিন্ন বাস টার্মিনালে সশরীরে যেতে হতো সেখানে এখন যাত্রীরা মোবাইল অ্যাপের এক ক্লিকেই কাক্সিক্ষত টিকিট পেয়ে যাচ্ছেন।

এর বাইরে সরকারি বিভিন্ন সেবা পেতেও মানুষজন এখন মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করছেন। সর্বশেষ করোনাভাইরাসের টিকা নিতে ‘সুরক্ষা’ অ্যাপ ঘটিয়েছে এক বিশালযজ্ঞ। সহজে ঘরে বসে কয়েক কোটি মানুষ এর মাধ্যমে নিবন্ধন করতে পেরেছেন। এর বাইরে সরকারি সেবা গ্রহণের জন্য রয়েছে আরও কয়েক শ অ্যাপ।

জানতে চাইলে তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড.  মোহাম্মদ কায়কোবাদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, প্রযুক্তি মানুষের জীবনে যেমন নানা ধরনের স্বাচ্ছন্দ্য আনে, তেমনি জীবনে ঝামেলাযুক্তও করে। যেমন বাংলাদেশে যখন প্রথম মোবাইল ফোন এলো, তখন আমাদের পক্ষে প্রত্যেকের পরিচয় শনাক্ত করে মোবাইল দেওয়া সম্ভব হয়নি। এর ফলে অনেক অপব্যবহার হয়েছে। ঘনবসতির এই দেশে দুর্বৃত্তায়নে থাকা মানুষের সংখ্যাও কম নয়। তাই এসব প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের খুবই সতর্ক হতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমাদের অর্থ যেন আরেকজন নিয়ে না যায় সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন, আজকে বিভিন্ন ধরনের বিল থেকে শুরু করে নানান ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনও করা হচ্ছে বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে। সেক্ষেত্রে অ্যাপে নিজের গচ্ছিত অর্থের তথ্যও শেয়ার করতে হয় বা হচ্ছে। তবে অস্থিরচিত্তের নতুন প্রজন্ম কোথায় কী তথ্য শেয়ার করছে সে বিষয়ে যথেষ্ট সতর্ক থাকতে হবে। মোটকথা যতক্ষণ পর্যন্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে প্রযুক্তির ব্যবহার করা যায় ততক্ষণ পর্যন্ত এটা শুভ ও স্বাচ্ছন্দ্যের।

সর্বশেষ খবর