শিরোনাম
প্রকাশ : ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:৪৬

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মিয়ানমার নেটওয়ার্ক

ব্যবহার হচ্ছে ট্রেসলেস অ্যাপ, জ্যামার দিয়ে ঠেকানোর চিন্তা, জাতিসংঘ চায় স্যাটেলাইট ফোন

রুকনুজ্জামান অঞ্জন

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মিয়ানমার নেটওয়ার্ক

রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে গত সেপ্টেম্বরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মোবাইল যোগাযোগ নিষ্ক্রিয় করার জন্য দেশের মোবাইল কোম্পানিগুলোকে সিম বিক্রি ও থ্রি-জি, ফোর-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিল বিটিআরসি। এর ফল হয়েছে উল্টো।

এখন ক্যাম্প এলাকায় কর্মরত সরকারি-বেসরকারি, জাতিসংঘ এজেন্সিসহ বিদেশি সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা মোবাইলে যোগাযোগ করতে না পারলেও রোহিঙ্গারা দিব্যি মোবাইলে ইন্টারনেট কানেকশন দিয়ে দেশে-বিদেশে যোগাযোগ করছে। এ ক্ষেত্রে তারা পাশের মিয়ানমারের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছে। আর ওই নেটওয়ার্ক দিয়ে রোহিঙ্গারা এমন কিছু অ্যাপ (ট্রেসলেস) ব্যবহার করছে, যা দেশীয় প্রযুক্তির মাধ্যমে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। ঝুঁকি রয়েছে আরও। টেকনাফ, উখিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশের মোবাইল ফোন কোম্পানির টাওয়ারগুলোর আওতা মিয়ানমারের ভিতরে ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত বলে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ নেটওয়ার্কের কারণে বাংলাদেশি বিভিন্ন মোবাইল ফোন অপারেটরের সিমকার্ড ব্যবহার হচ্ছে মিয়ানমারের ভিতরেও। সীমান্ত এলাকায় অন্য দেশের নেটওয়ার্ক ব্যবহারের ফলে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাজনিত হুমকি আরও বেড়েছে বলে মনে করছে সরকারের নিরাপত্তা সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসন। এ অবস্থায় তারা সেখানে (রোহিঙ্গা ক্যাম্পে) মোবাইল সেবা ও ইন্টারনেট কানেকশন বন্ধ করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। গত ২৬ মার্চ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত ‘মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক প্রত্যাবাসিত মিয়ানমারের নাগরিক (রোহিঙ্গা)-সংক্রান্ত জাতীয় টাস্কফোর্স’-এর সভায় এ প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনা হয়। তবে বিষয়টি যেহেতু রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত, সে কারণে ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয় : মোবাইল সেবা ও থ্রি-জি, ফোর-জি নেটওয়ার্ক বন্ধের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন জাতীয় কোর কমিটিতে পাঠানো হবে। ওই কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসারে নেওয়া হবে পরবর্তী পদক্ষেপ। প্রশাসনের সংশ্লিষ্টরা জানান, ভিন্ন দেশের নেটওয়ার্ক দিয়ে রোহিঙ্গারা এমন কিছু মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করছে যা বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোও চিহ্নিত করতে পারছে না। এটি সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সীমান্তের এপারে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে যেসব কর্মকা- পরিচালিত হয়, তা মুহূর্তে সম্প্রচার হয়ে যায় নাফ নদের ওপারে। শুধু তাই নয়, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নেতৃস্থানীয়রা তাদের বিষয়ে বাংলাদেশ বা আন্তর্জাতিক কোনো সিদ্ধান্ত বা সুপারিশসংক্রান্ত তথ্যও ওপারে থাকা লোকজনের সঙ্গে বিনিময় করছে ওই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে। আবার এপারে অবস্থিত ক্যাম্পগুলোয় যেভাবে মিয়ানমার নেটওয়ার্ক ব্যবহৃত হচ্ছে, ঠিক সেভাবেই বাংলাদেশের মোবাইল কোম্পানিগুলোর সিম ব্যবহার করে এ দেশের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছে নাফের ওপারে বসবাসরত মিয়ানমারের নাগরিক।

রাষ্ট্রের জন্য পুরো বিষয়টিকে এখন বড় ধরনের ঝুঁকি বলে মনে করা হচ্ছে।
বিষয়টি স্বীকার করে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক কামাল হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, রাষ্ট্রীয় ঝুঁকির কথা বিবেচনা করেই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দেশীয় অপারেটরের মোবাইল সিম বন্ধ ও থ্রি-জি, ফোর-জি সুবিধা সীমিত করা হয়েছিল। এখন সমস্যা হয়েছে সেখানে সরকারি-বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা যোগাযোগ করতে না পারলেও তারা (রোহিঙ্গা) ঠিকই যোগাযোগ করছে। মিয়ানমারের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ক্যাম্প থেকে যোগাযোগ চলছে। এটি বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। জেলা প্রশাসক আরও জানান, আমরা পাশের দেশটির নেটওয়ার্ক বন্ধের বিষয়ে প্রস্তাব দিয়েছি। এখন এটি কীভাবে বন্ধ করা যায় তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এমন হতে পারে, এ ধরনের নেটওয়ার্ক বন্ধে ‘জ্যামার’ স্থাপন করা হতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে পাশের এলাকার মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যায় কিনা তাও দেখতে হবে।

জাতিসংঘ চায় স্যাটেলাইট ফোন : রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দেশীয় অপারেটরগুলো মোবাইল সংযোগ বন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে সেখানে কর্মরত জাতিসংঘ সংস্থার (ইউএনএফপিএ) প্রতিনিধিরা স্যাটেলাইট টেলিফোন ব্যবহার করতে চাইছেন। তারা এ ধরনের ফোন আমদানির বিষয়ে ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের (আইটিইউ) সঙ্গে যোগাযোগও করেছেন। তবে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ জাতিসংঘ এজেন্সির আইটিইউর সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২৬ জানুয়ারির সভায় ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের প্রতিনিধি এ ইস্যুতে বলেন, জাতিসংঘের কোনো এজেন্সি যদি ক্যাম্প এলাকায় স্যাটেলাইট ফোন ব্যবহার করতে চায় তবে এ বিষয়ে তারা বাংলাদেশ সরকারের কাছে আবেদন করবে, কিন্তু সরকারকে পাশ কাটিয়ে তারা এ যন্ত্র আমদানির জন্য আইটিইউর অনুমোদন চেয়েছে। এ বিষয়ে সভায় পররাষ্ট্র সচিব জানিয়েছেন, তিনি জাতিসংঘের (ইউএনআরসি) কাছে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইবেন।


বিডি প্রতিদিন/ ওয়াসিফ


আপনার মন্তব্য