শিরোনাম
প্রকাশ : ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১৪:০৮

কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ে 'নজরুল চেয়ার' প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ

এনআরবি নিউজ, নিউইয়র্ক থেকে :


কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ে 'নজরুল চেয়ার' প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ
কাজী নজরুল চেয়ার প্রতিষ্ঠার অনুষ্ঠানে সমবেত সঙ্গীতে স্থানীয় শিল্পীরা।

বাংলাদেশের জাতীয় কবি নজরুলের সাহিত্যকে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত করার অভিপ্রায়ে যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যে ‘ইউনিভার্সিটি অব কানেকটিকাট’-এ ‘নজরুল চেয়ার’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে গত শনিবার নিউইয়র্কে তহবিল সংগ্রহের এক অনুষ্ঠান হয়েছে। ‘ইউনিভার্সিটি অব কানেকটিকাট’-এর নজরুল এনডাউমেন্ট কমিটি, নর্থ আমেরিকা নজরুল কনফারেন্স কমিটি এবং নজরুল একাডেমি সম্মিলিতভাবে এই অনুষ্ঠানের হোস্ট করে। এতে কাজী নজরুলের কাব্য-ভক্ত, সঙ্গীতানুরাগী এবং সমাজকর্মীরা অংশ নেন। বেশ কয়েকজন বিদেশী শিক্ষাবিদ এবং ছাত্র-ছাত্রীও ছিলেন এ অনুষ্ঠানে। 

উদ্যোক্তারা এ সময় উল্লেখ করেন যে, নজরুল চেয়ার প্রতিষ্ঠায় দুই মিলিয়ন তথা ১৬ কোটি টাকা প্রয়োজন। এ অনুষ্ঠানে সংগৃহীত হয়েছে ৩৪ হাজার ৫৫০ ডলার। অনুষ্ঠানের হোস্টরা বলেছেন যে, আরো কিছু অর্থের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। 

দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া সত্বেও বিপুলসংখ্যক নজরুল ভক্তের সমাগম ঘটেছিল। অনুষ্ঠানমালার মধ্যে ছিল প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শনী, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। 

নজরুল চেয়ার প্রতিষ্ঠার এ আয়োজনের অন্যতম উদ্যোক্তা এবং নজরুল একাডেমীর সভাপতি সৈয়দ টিপু সুলতানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানের অতিথি ছিলেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন এবং নিউইয়র্কে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল শামীম আহসান। আলোচনায় অংশ নেন ‘কাজী নজরুল ইসলাম চেয়ার’ প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্যোক্তা নজরুল গবেষক ড. গুলশান আরা কাজী, কাজী শাহজাহান বেলাল, উত্তর আমেরিকা নজরুল কনফারেন্স কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদ ও নজরুল এনডাউমেন্ট কমিটির অন্যতম সদস্য ও প্রয়াত চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ।

রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী সৃষ্ট সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে কাজী নজরুলের চেতনা ভূমিকা রাখতে পারে। তাই বিশ্ব শান্তির জন্য নজরুল চর্চা জরুরি।  যদিও কাজটি সহজ নয়, চ্যালেঞ্জের।’ মাসুদ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারীরা আন্তরিক অর্থে এগিয়ে এলে এ মহৎ উদ্যোগের বাস্তবায়ন ঘটানো সহজ হবে।’ 

‘বাংলাদেশ মিশনের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের ১৯২টি দেশের প্রতিনিধির কাছে কবি নজরুলকে তুলে ধরার চেষ্টা করবো। তাদের সহযোগিতা কামনা করবো। এজন্য আমরা সবাই মিলে জাতিসংঘে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারি’-উল্লেখ করেন রাষ্ট্রদূত মাসুদ।

কন্সাল জেনারেল শামীম আহসান বলেন, ‘বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল আমাদের অন্তরের মাঝে গভীরভাবে আছেন। তিনি সমগ্র মানবতার কবি, সবার কবি। কবি নজরুল বাংলাদেশের জন্য যে কত বড় সম্পদ তা বলে শেষ করা যাবে না। তিনি সমগ্র বিশ্বের সম্পদ। তাকে তুলে ধরা মানেই বাংলাদেশকে তুলে ধরা।’ 

ড. গুলশান আরা কাজী বলেন, ‘আজ মৌসুমের প্রথম বরফ পড়েছে। এটি একটি সিম্বলিক রাত এই জন্যই যে, কবি নজরুলের জন্মদিনের রাতটি ছিল একটি ঝঞ্জাবহুল রাত।’ তিনি বলেন, ‘বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে শুরু আমাদের ঐতিহাসিক যাত্রা পথের নতুন মাইলফলক। কেননা, এই বিজয়ের মাসেই আমরা কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজী নজরুল চেয়ার প্রতিষ্ঠার যাত্রা শুরু করেছি।’

নজরুল গবেষক গুলশান আরা বলেন, ‘নজরুল সকল বাঙালির গর্বের ধন। তাই তার নামে কিছু করতে গেলে কোনো প্রতিবন্ধকতাই বাধার সৃষ্টি করতে পারবে না। আমাদের ভিশন-মিশন হচ্ছে নজরুলকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া।’

‘তবে সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই মহতি উদ্যোগ সফল হবে না। আশার কথা হচ্ছে যে, অনেক আমেরিকান আমাদের এই উদ্যোগে সাড়া দিয়েছেন, উৎসাহ দিচ্ছেন।’

কম্যুনিটি এ্যাক্টিভিস্ট কাজী বেলাল বলেন, ‘সবার সাহায্য পেলে কাজী নজরুল ইসলাম চেয়ার প্রতিষ্ঠা কোন সমস্যা হবে না। চেয়ার তো বটেই, আমরা নজরুলকে চেয়ারের উপরে পৃথিবীতে সবার মাঝে পৌঁছে দিতে চাই।’ বেলাল উল্লেখ করেন, ‘১৯৮৫ সালে প্রবাসে কবি নজরুলকে নিয়ে কাজ শুরু করেছি। ১৯৯০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম নজরুল কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়।’

ডা. জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘কবি নজরুলকে পরিচিত করা মানেই বিশ্বের কাছে আমাদেরকে পরিচিত করা। তার আদর্শ বাস্তবায়িত হলে বিশ্বে শান্তি আসবে।’ জিয়াউদ্দিন বলেন, ‘১৯৯০ সালে নর্থ আমেরিকা নজরুল কনফারেন্সের আয়োজন করা হয়। দিনে দিনে নজরুল ভক্তের সংখ্যা বাড়ছে বলেই আমরা কবি নজরুলকে বিশ্বব্যাপী তুলে ধরার সাহস পাচ্ছি।’

ক্যাথরিন মাসুদ বলেন, ‘বাংলাদেশের সাথে নতুন করে যোগাযোগ করইে নজরুল কনফারেন্স কমিটির সাথে পরিচয় হয়। আর সেই সূত্র ধরেই নজরুল চেয়ার প্রতিষ্ঠার জন্য কিছু করতে চাই। আজ নিউইয়র্কে বাংলাদেশের হৃদয় পেয়েছি। কবি নজরুলের জন্য যা করার তাই করবো, যেখানে যাওয়ার যাবো। তার টানে আমরা স্বপ্ন দেখছি, কবি নজরুলকে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি।’

ক্যাথরিন আরও বলেন, ‘কবি নজরুল চেয়ার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাকে তুলে ধরার এটাই বড় সুযোগ। সবাই মিলে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।’

অনুষ্ঠানে বিশিষ্টজনদের মধ্যে ছিলেন রাজনীতিক ও অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন, রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন, জেবিবিএর সভাপতি জাকারিয়া মাসুদ জিকো প্রমুখ।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নজরুল একাডেমীর শিল্পীরা সঙ্গীত পরিবেশন করেন। অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্ব উপস্থাপনায় ছিলেন শাহ আলম দুলাল ও মতলব আলী।

উল্লেখ্য যে, যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম প্রান্ত তথা লসএঞ্জেলেসে ‘ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি’র নর্থরীজ ক্যাম্পাসে ২০০২ সাল থেকে ‘নজরুল লেকচার’ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ বছরের লেকচার ("the afterlife of Kazi nazrul islam's words of resistance") অনুষ্ঠিত হয় গত ২৪ সেপ্টেম্বর ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট ইউনিয়নের ‘দ্য পাসেনা রুম’-এ। প্রায় ৩০০ ছাত্র-ছাত্রী এতে অংশ নেন। এর মধ্যে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ছিলেন মাত্র ৩ জন। অর্থাৎ ভিনদেশিদের মধ্যে নজরুলকে জানার আগ্রহ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। 

ক্লাসের স্পিকার ছিলেন কানেকটিকাট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিশিষ্ট নজরুল গবেষক ড. সুফিয়া উদ্দিন। তিনি নজরুল সাহিত্যকর্ম ও সংগ্রামী জীবন নিয়ে লেকচার প্রদান করেন। 

এখানেও ‘নজরুল চেয়ার’ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়ে গঠিত ‘নজরুল এনডাউমেন্ট কমিটি’ নিরলসভাবে কাজ করছে। প্রবাসীদের সংগঠন ‘তরঙ্গ অব ক্যালিফোর্নিয়া’র এ উদ্যোগে এগিয়ে এসেছে ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট অথরিটি।

‘তরঙ্গ অব ক্যালিফোর্নিয়া’র প্রেসিডেন্ট শিপার চৌধুরী ১৩ ডিসেম্বর বুধবার রাতে এ সংবাদদাতাকে বলেন, ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে 'নজরুল চেয়ার' স্থাপনের জন্য নজরুল এনডাউমেন্ট ফান্ডে ৪ লাখ ডলার থাকতে হবে। ইতিমধ্যে এক লাখ ডলার সংগ্রহ হয়ে গেছে।’ বিশ্বের যে কোনো জায়গা থেকে এই ফান্ডে কেউ অংশ নিতে চাইলে তরঙ্গের সাথে যোগাযোগ করার জন্য বলেছেন শিপার চৌধুরী। ‘তহবিল সংগ্রহের লক্ষ্যে লস এঞ্জেলেসে আগামী বছরের মে মাসে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে’-জানান শিপার।

ইউনিভার্সিটির হিউম্যানিটিজ ডিভিশনের তত্বাবধানে নজরুল লেকচার পরিচালনা করছেন রিলিজিয়াস ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান ড. ফিলিস হারমেন। এই লেকচার প্রোগ্রামে একবার অংশ নিয়েছিলেন প্রখ্যাত নজরুল গবেষক এবং বস্টনে অবস্থিত ইউনিভাসিটি অব ম্যাসেচুসেটস'র প্রভোস্ট, এবং ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. উইন্সটন ই ল্যাঙ্গলী। এরপর নজরুলের জীবন-কর্ম নিয়ে এই অধ্যাপকের লেখা  ‘কাজী নজরুল ইসলাম : দ্য ভয়েস অব পয়েট্রি এ্যান্ড দ্য স্ট্রাগ্ল ফর হিউম্যান হোলনেস’ গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে বাংলা একাডেমি।

বিডি-প্রতিদিন/১৪ ডিসেম্বর, ২০১৭/মাহবুব


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর