শিরোনাম
প্রকাশ : ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ১০:৪৯
আপডেট : ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ১০:৫১

টরেন্টোর চিঠি

পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা কি আসলে সম্ভব নয়!

শওগাত আলী সাগর

পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা কি আসলে সম্ভব নয়!
যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবির মতোই পাকিস্তানের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবিটি জনপ্রিয়। দুটি দাবির সঙ্গেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ-প্রিয় মানুষের আবেগ এবং আকাঙ্ক্ষা জড়িত। কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষে পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা কি সম্ভব? এই প্রশ্ন নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা কখনো চোখে পড়েনি। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী জাতীয় সংসদে বলেছেন, ‘টানাপড়েন হলেই যে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে এমন নয়। যুদ্ধের সময়ও অনেক দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকে।’ পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা সম্ভব কিনা, সেই আলোচনার সঙ্গে রাষ্ট্রের সক্ষমতার সম্পর্ক জড়িত। সম্পর্ক ছিন্ন করার মতো যথেষ্ট কারণ থাকলেই একটি দেশ আরেকটি দেশের সঙ্গে আজকাল সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলছে না। ইয়েমেনে সৈন্য মোতায়েনের প্রশ্নে রাশিয়ার সঙ্গে কানাডা আমেরিকাসহ ইউরোপীয় দেশগুলোর স্নায়ুযুদ্ধ এতটাই প্রবল হয়েছে যে, পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেছে, কিন্তু রাশিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার মতো সিদ্ধান্ত কোনো দেশই নেয়নি। কানাডার কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হারপার আন্তর্জাতিক ফোরামে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের উপস্থিতিতে অংশ নিতে সম্মত হননি। এক বছরের ব্যবধানে লিবারেল প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো পুতিনের সঙ্গে হ্যান্ডশেকও করেছেন। পশ্চিমাদের কাছে  ইরানও এক সময় ‘অস্পৃশ্য’ ছিল। সেই ইরান এখন আবার পশ্চিমাদের প্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করেছে। বাঙালিদের কাছে পাকিস্তান একটি ঘৃণিত শব্দ। কেবল যে বাঙালিদের কাছেই তা কিন্তু নয়। বহির্বিশ্বে যেখানেই পাকিস্তানিদের বসবাস তাদের অনেককে ঘিরে নানা প্রশ্ন, নানা সমস্যার কথা শোনা যায়। ব্যক্তিগত পর্যায়ে বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেও পাকিস্তানিরা তেমন আদরণীয় নয়। সেখানে পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রটিকে বন্ধু ভাবার কোনো সুযোগই তো নেই। আর পাকিস্তান কখনই বাংলাদেশের বন্ধু হবে না, হতে পারেও না। কিন্তু রাষ্ট্রের সম্পর্ক ব্যক্তিগত সম্পর্ক দ্বারা তাড়িত হয় না, এমনকি বর্তমান বিশ্বে রাষ্ট্রের আদর্শবোধ দ্বারাও নয়। সেটি হলে কিউবা আর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মাখামাখি শুরু হতো না। আন্তর্জাতিক নানা পরিস্থিতি, বিশ্ব পরিমণ্ডলে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সম্পর্কের সমীকরণ ইত্যাদি নানা বিষয়ের সঙ্গে এগুলো জড়িত। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এগুলো বাস্তবতা। বলা যায়, এটিই এখনকার বিশ্ব বাস্তবতা। শেখ হাসিনার বদলে ইমরান এইচ সরকার প্রধানমন্ত্রী হলেও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ সেটি বোঝে বলেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলতে পেরেছেন, ‘আপাতত কিছু করতে চাচ্ছি না। ভবিষ্যৎ বলে দেবে এটা কোন দিকে যাবে। সময়টা বিবেচনা করতে হবে। সব কথার শেষ কথা হলো, জাতীয় স্বার্থটা মাথায় রাখতে হবে। সেই বিষয়টা বিবেচনা করে আমরা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক মূল্যায়ন করে থাকি এবং পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করি। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এই বিষয় প্রযোজ্য হবে।’ একটা বিষয় কিন্তু পরিষ্কার। আমরা যত কথাই বলি না কেন, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার মতো কঠিন অবস্থানে বাংলাদেশ যাচ্ছে না। আবারও বলি— যাওয়া সম্ভবও নয়। এটি ‘সুশীল-কুশীলতার’ প্রশ্ন নয়। এটা বাংলাদেশের সক্ষমতার প্রশ্ন, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং সেই কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থানের প্রশ্ন। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার প্রশ্নে বাংলাদেশের সক্ষমতা বিচারের আগে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থানটাও বিবেচনা করা দরকার। এটা সত্য যে, পাকিস্তান তাদের দূতাবাসকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বাংলাদেশবিরোধী তত্পরতা চালাচ্ছে। বাংলাদেশ শক্তভাবে পাকিস্তানি কূটনীতিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারছে না। বরং পাকিস্তান অন্যায়ভাবে পাকিস্তানে বাংলাদেশের কূটনীতিকদের হেনস্তা করছে। সেখানেও বাংলাদেশ জোরালোভাবে প্রতিবাদ জানাতে পারছে না। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ-পাকিস্তানের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণে এটা পরিষ্কার যে, পাকিস্তান বেশি ঔদ্ধত্য দেখিয়েছে, অধিকতর অপরাধমূলক কাজ করেছে, কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করেছে। কিন্তু সেই অর্থে বাংলাদেশ এগুলোর বিরুদ্ধে শক্তভাবে দাঁড়াতে পারেনি। মাঠে-ময়দানে, সাধারণের মাঝে পাকিস্তানের নানা অপকর্মের বিরুদ্ধে যতটা ক্ষোভ-বিক্ষোভ আছে, রাষ্ট্র তার পুরোটা ধারণও করতে পারছে না। পাকিস্তানও সম্ভবত বাংলাদেশকে ‘সক্ষম’ রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনায় নিচ্ছে না। পাকিস্তানের সঙ্গে যে সংকট চলছে, সেটাকে এখনো কিন্তু আমরা কূটনৈতিক সমস্যা হিসেবে বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারিনি। দুটি দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সমস্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করার আগে সম্পর্ক ছিন্ন করার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় কিনা, সেটাও ভাবা দরকার। কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা-না রাখাটা এখন আর কেবল দুটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় মাত্র নয়, যেমন কোনো দেশে গণতন্ত্র থাকল কি থাকল না- সেটিও কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। পাকিস্তানের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে বরং কৌশলী হওয়া ভালো, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় হলে যে কোনো দেশের সঙ্গেই মাথা উঁচু করে কথা বলা যায়। বাংলাদেশ বরং পাকিস্তানের সঙ্গে বিজয়ী হিসেবে মাথা উঁচু করে কথা বলতে শিখুক। 
 
লেখক : টরেন্টোর বাংলা পত্রিকা ‘নতুনদেশ’ এর প্রধান সম্পাদক

আপনার মন্তব্য