শিরোনাম
প্রকাশ : ২৫ মে, ২০২০ ১৫:১১

মগের মুল্লুকে আমাদের বসবাস?

আরিফুর রহমান দোলন

মগের মুল্লুকে আমাদের বসবাস?
আরিফুর রহমান দোলন

কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে ফেলছি আমরা। ঘন ঘন সিদ্ধান্ত বদল করে প্রমাণ দিচ্ছি যে সুচিন্তিত, পরিপক্ক সিদ্ধান্ত দেওয়ায় আমাদের ঘাটতি আছে। একবার বলছি, ঢাকায় কেউ ঢুকতে পারবে না, বেরোতেও পারবে না। পুলিশ ব্যারিকেড আছে। সবাইকে আটকাবে। 

পরক্ষণেই ঘোষণা, আপনার কি ব্যক্তিগত গাড়ি আছে? তাহলে আপনি ঈদ উপলক্ষে গ্রামে যেতে পারবেন। ব্যস, অমনি গ্রামে যাওয়ার ধুম লেগে গেল। ভাড়ায়চালিত মাইক্রোবাস আর ছোট গাড়িও রাতারাতি ব্যক্তিগত গাড়ির মর্যাদা পেয়ে গেল, ক্ষেত্রবিশেষ পুলিশের বদান্যতায়। ফেরিঘাট, মহাসড়কগুলোতে উপচে পড়া ভিড়। 

কীসের সামাজিক দূরত্ব। কীসের স্বাস্থ্যবিধি। আর কীসের করোনা ভীতি। এক একজন যে রীতিমতো মৃত্যুদূত হয়ে ফিরছেন গ্রামে। কিন্তু কারো মধ্যে সেই অপরাধবোধ, সচেতনতা কিংবা লজ্জাবোধ নেই। নেই নাগরিক দায়িত্ব পালনের কোনো তাগিদ।

করোনা কাণ্ডের পর একের পর এক স্ববিরোধী আর বিভ্রান্তিমূলক সিদ্ধান্ত আসছে। নির্বাচিত, রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নির্ভর হয়ে চলছে সবকিছু। কোথায় যেন একটা ছন্দ পতনের সুর আছে। 

শুনেছি বাংলাদেশে এক সময় মগদের খুব উপদ্রুব ছিল। সে প্রায় ৪০০ বছর আগের কথা। আজকের মিয়ানমার থেকে আসা মগ জলদস্যুরা সে সময় বাংলাদেশের এক বিস্তীর্ণ এলাকায় রীতিমতো ত্রাসের রাজত্ব বানিয়ে রাখে। ফরাসি পর্যটক বার্নিয়ের সে কথা বর্ণনা করে লুণ্ঠন ও অত্যাচারের যে বিবরণ দিয়েছেন তা পড়লে যে কারোরই রক্ত হিম হয়ে আসবে। ১৬৬৬ সালে শায়েস্তা খান চট্টগ্রাম জয় করার পর মগদের সন্ত্রাসের অবসান হয়। 

প্রয়াত মন্ত্রী, সাংসদ, সংবিধান বিশেষজ্ঞ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত একবার (২০১৪ সালে) অভিযোগের সুরে বলেছিলেন, দেশটা একদম মগের মুল্লুক হয়ে উঠেছে। নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত সাত খুনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অকর্মন্যতার দিকে আঙ্গুল তুলে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, মানুষ অভিযোগ নিয়ে আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর কাছে যাচ্ছে, আর তারা বসে বসে হিসাব-নিকাশ করছে কার অভিযোগ নেবে, কারটা নেবে না। ‘এটা কি মগের মুল্লুক?’

আমাদের আলোচ্য বিষয় অবশ্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকাণ্ড নয়। বরং করোনা পরবর্তী বাংলাদেশের ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, হাসপাতাল ঘুরে ঘুরে কোভিড-১৯ আক্রান্ত নন এমন রোগীও বিনা চিকিৎসায় মারা যাওয়া এবং স্ববিরোধী কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়েই কথা বলতে চাই।

২৩ মে চট্টগ্রামের একটি খবরের কাগজে দেখলাম আমেরিকা প্রবাসী হিমাংশু কুমার দাস চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হতে না পেরে বিনা চিকিৎসায় হাসপাতালের গেটেই মারা গেছেন। তিনি হৃদরোগ আক্রান্ত ছিলেন কোনোভাবেই কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত ছিলেন না। 

তার মেয়ে আইনজীবী দিতি দাস গণমাধ্যমকে বলেছেন, জরুরি ভিত্তিতে বাবাকে আইসিইউতে নেয়ার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগী নিয়ে হাসপাতালের ভেতরেই তাদের ঢুকতে দেয়নি। জবাবে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক অসীম কুমার নাথ নিয়মের দোহাই দিয়েছেন। বলেছেন, রোগীকে জরুরি বিভাগে না নিয়ে সরাসরি আইসিইউতে আসায় ভর্তি করা যায়নি।

কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন সরকারের অতিরিক্ত সচিব গৌতম আইচ সরকার। তিনিও কার্যত মারা গেছেন বিনা চিকিৎসায়। নির্ধারিত বা পছন্দের একাধিক হাসপাতালে ভর্তি না নেওয়ায় কোভিড-১৯ আক্রান্তদের জন্য নির্ধারিত কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তির পর মৃত্যু হয় পদস্থ এই সরকারি কর্মকর্তার। তার চিকিৎসক কন্যা সুস্মিতা আইচের বক্তব্য অনুযায়ী, ল্যাবএইড হাসপাতালে ডায়ালাইসিসের সময় প্রেসার বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি শ্বাসকষ্ট শুরু হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের ফোন করে। তখন ল্যাবএইড হাসপাতালে রোগীকে ভর্তি করতে বললে জানানো হয়, তাদের কনসালটেন্ট নেই। আইসিইউ সাপোর্ট দেওয়া যাবে না। এই রোগী এখানে ভর্তি সম্ভব নয়। 

ডায়ালাইসিস করে রোগীকে ছেড়ে দিলে তাকে ভর্তির জন্য আনা হয় ইউনাইটেড হাসপাতালে। তারা ভর্তি নেয়নি। এরপর রোগীকে নেওয়া হয় ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজে। 

ইউনিভার্সেল মেডিকেল হাসপাতাল নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার অজুহাতে স্কয়ার হাসপাতালে রোগীকে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে। সেখানেও রোগী ভর্তি নেয়নি, তারা নন কোভিড সার্টিফিকেট চায় ও নানা প্রশ্ন করতে থাকে। এরপর একে একে স্কয়ার হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, মিরপুরের রিজেন্ট হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ঘুরে কোথাও অতিরিক্ত সচিব গৌতম আইচ সরকারকে ভর্তি করানো যায়নি। 

কার্যত এভাবেই চিকিৎসার অভাবে মারা গেছেন সরকারের অতিরিক্ত এই সচিব। তার মতো একই পরিস্থিতির শিকার বহু পরিবার। কিছু কিছু ঘটনা পত্রিকার পাতায়, টেলিভিশন, নিউজ পোর্টাল ও সামাজিক গণমাধ্যমের কারণে আমরা জানতে পারছি। কিন্তু আড়ালে থেকে যাচ্ছে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর এমন অসংখ্য কাহিনী। যার সবগুলোই হৃদয়বিদারক, মর্মস্পর্শী, করুন, অমানবিক এবং মহান পেশা চিকিৎসা সেবার আদর্শের পরিপন্থী।

গণতান্ত্রিক একটি রাষ্ট্রে একের পর এক বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু এটা কি কোন স্বাভাবিক ঘটনা? এটা কি কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায়? একের পর এক এ ধরনের অমানবিক ঘটনার কোন বিহিত, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোন ব্যবস্থাও কি নিতে দেখেছি আমরা? না কোন দৃষ্টান্ত নেই।

বাগাড়ম্বর, বক্তৃতা, বিবৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছেন নীতিনির্ধারকেরা। কেন এই ছাড় দেওয়া, কেন এই উদাসীনতা! সত্যিই বোঝা দূরূহ।

২৯ এপ্রিল গণমাধ্যমের সাথে আলাপকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছিলেন, কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের মধ্যে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও প্রাইভেট চেম্বারগুলো থেকে রোগীরা সেবা না পেয়ে ফিরে গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেছিলেন, ‘প্রাইভেট হাসপাতাল কাজ কম করছে। ক্লিনিক ও চেম্বারগুলো অনেকাংশে বন্ধ আছে। আমরা সামাজিক গণমাধ্যমে জানতে পারছি। আমরা নিজেরাও দেখতে পাচ্ছি। আমরা কিন্তু বিষয়টি লক্ষ্য রাখছি। পরবর্তীকালে যা যা ব্যবস্থা নেওয়ার নেওয়া হবে- এই ছিল আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর হুঁশিয়ার। 

কিন্তু মন্ত্রী এই হুঁশিয়ারিতে ভয় পেয়ে যে সংশ্লিষ্টরা নড়েচড়ে একটু বসবেন এমন ঘটনা ঘটেনি। এটাই অবাক করার মতো। তার মানে, সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হয়তো জানে যে, মন্ত্রী একটু আধটু এরকম বলবেন ঠিকই। কিন্তু আদতে কোন ব্যবস্থাই নেওয়া হবে না।

নীতি নির্ধারকদের কথা ও কাজে যদি মিল পাওয়া না যায় এবং সে কারণে সাধারণ মানুষ যদি ভুক্তভোগী হয় তাহলে সার্বিকভাবে যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়। তার সুদূর প্রসারী নেতিবাচক ফলাফল ভোগ করতে হয় কিন্তু ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলকেই। ভয়ানক সংক্রামক ব্যাধি কোভিড-১৯ এর সামাজিক সংক্রমণ এখন ব্যাপকতা পেয়েছে। সংক্রমণ যাতে কম ছড়ায় সেজন্য প্রতিটি নাগরিকের যেমন দায়িত্ব রয়েছে তেমনি নাগরিককে বাধ্য করার সর্বাত্মক দায়ও রাষ্ট্রের। আমাদের সরকার প্রধানের শতভাগ আন্তরিকতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, সততা আর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব সত্ত্বেও করোনা কাণ্ডে আমাদের দুর্বল ব্যবস্থাপনা ভাবিয়ে তুলছে সবাইকে।
 
সম্ভবত বাংলাদেশই বিশ্বে একমাত্র দেশ যে করোনাভাইরাসের পর দীর্ঘ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করলেও আনুষ্ঠানিকভাবে লকডাউন ঘোষণা দেয়নি। ফলে শুরু থেকেই সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা ঢিলেঢালা ভাব ছিল। এরপর তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ, খোলা রাখা নিয়ে কত কাণ্ড। বিপন্ন শ্রমিকদের গায়ে গা ঠেসে গ্রামে ফেরা আবার কর্মস্থলে ফেরার সেসব দৃশ্য আমরা গণমাধ্যম আর সামাজিক গণমাধ্যমে দেখেছি। এরপর শহর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। এরপর এলো ঈদ উপলক্ষে মার্কেট, দোকানপাট খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত। 

দিন কয়েক বলা হলো, ঢাকা থেকে আর কেউ বের হতে পারবে না, ঢাকায় ঢুকতেও দেওয়া হবে না কাউকে। কারণ এতে করোনা সামাজিক সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে। 

পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া, শিমুলিয়া-কাঁঠালিয়া ঘাটে ফেরিও বন্ধ থাকলো ১/২ দিন। এরপর মহাসমারোহে ঘোষণা করা হলো, ঈদে অবশ্যই গ্রামে যেতে পারবেন যদি আপনার ব্যক্তিগত গাড়ি থাকে। ব্যস, শুরু হয়ে গেল ধুন্ধমার। দুর্বার গতিতে গ্রামে ছুটলেন আমাদের প্রিয় নাগরিকেরা। ঢিলেঢালা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বেপরোয়া নাগরিকদের রুখবে সাধ্য কার!

সরকার শক্ত হলে, প্রকৃতই লকডাউন থাকলে নাগরিকদের এই বেপরোয়া হওয়ার সুযোগ থাকতো কি? মৃত্যুদূত হয়ে এই যে ছুটে চলা সেটা অন্তত বন্ধ থাকতো। কোভিড-১৯ আক্রান্তরা হাসপাতালে ভর্তি হলে প্রকৃত চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন কি-না তা নিয়ে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন রয়েছে। এরপর কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত নন এমন রোগীরাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে চিকিৎসা পাচ্ছেন না, হাসপাতালে ভর্তি হতে পারছেন না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, মন্ত্রণালয় কার্যত নতজানু হয়ে আছে। 

যার যা খুশি সে তাই করছে। করতে পারছে। যখন ইচ্ছে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সিদ্ধান্ত বদল করছে। একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের জনসম্পৃক্ত বিষয়গুলোতে সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় একচেটিয়া প্রাধান্য যখন প্রশাসনিক কর্মকর্তাদেরই থাকে তখন এমন ঘন ঘন সিদ্ধান্ত অদল বদল হয়তো স্বাভাবিক। এমন সিদ্ধান্তে আমাদের যে নানামুখী সংকট হতে পারে তা কি সংশ্লিষ্টরা ভেবে দেখেছেন? চারিদিকে যা হচ্ছে, যেভাবে হচ্ছে তাতে আসলেই মনে হচ্ছে আমরা মগের মুল্লুকেই বসবাস করছি।

লেখক: সম্পাদক, দৈনিক ঢাকা টাইমস, ঢাকা টাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকম এবং সাপ্তাহিক এই সময়।  

বিডি প্রতিদিন/আরাফাত


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর