শিরোনাম
প্রকাশ : ২৯ মে, ২০২০ ০৭:৩৩

প্লাজমা এখন ত্রাণের চেয়েও জরুরি

রিয়াজ হায়দার চৌধুরী

প্লাজমা এখন ত্রাণের চেয়েও জরুরি
রিয়াজ হায়দার চৌধুরী :

করোনায় মৃত্যুর আগ্রাসন কমাতে ভ্যাকসিন আবিষ্কার এখনো সত্যাসত্য পর্যবেক্ষণে। চীন-লিবিয়া কিংবা ইউরোপ আমেরিকায় গবেষণা চলছে। অপেক্ষা আর অনিশ্চয়তায় গোটা বিশ্ব। এমন অবস্থায় বিশ্বজুড়েই প্লাজমা থেরাপি জ্বালিয়ে রেখেছে সম্ভাবনা আর আশার প্রদীপ।

বাংলাদেশের অবস্থা কেমন?-ঢাকায় সীমিত আকারে প্লাজমা প্রয়োগ শুরু হতে না হতেই চট্টগ্রাম-খুলনাসহ বিভিন্ন স্থানে প্লাজমা প্রয়োগ শুরু হয়েছে। কিন্তু এখনো কোথাও নেই প্লাজমা সংগ্রহের জন্য করোনা থেকে মুক্তি পাওয়াদের ডাটাবেজ। করোনা সংক্রমণ বাড়ছে ক্রমশ। এর বিপরীতে ভেন্টিলেশনসহ নানা সুযোগের স্বল্পতা প্রকট হচ্ছে দিনের পর দিন। রোগীর চাপে সৃষ্ট অশনি সময় মোকাবেলা করতে হচ্ছে স্বাস্থ্য সেবা খাতকে। এমন অবস্থায় সংকটাপন্ন রোগীদের জন্য প্লাজমা থেরাপির প্রয়োজনীয়তা যে বাড়ছে, তা এখন আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

তবে এক্ষেত্রে আমাদের প্রস্তুতি এখনো যেন শূন্যের কোটায়। চট্টগ্রামের করোনা আক্রান্ত জনপ্রিয় অর্থোপেডিক শিক্ষক ডা. সমিরুল ইসলাম বাবুর শরীরে প্লাজমা প্রয়োগের কেসটি স্টাডি করলে বোঝা যায় এনিয়ে সংকটের ভয়াবহতা। ডা. সমিরুল চট্টগ্রামে হাজার হাজার রোগীর চিকিৎসা করেছেন। পরিবারসহ তিনি করোনা পজেটিভ হওয়ায় বন্ধু ডাক্তারদের উৎকণ্ঠার শেষ নেই। 

এক পর্যায়ে অবস্থা জটিল হলে চিকিৎসকরা তাকে প্লাজমা প্রয়োগের মাধ্যমে টিকিয়ে রাখার ঝুঁকি নেন। কিন্তু প্লাজমা কোথায়? কোন রোগীর কাছ থেকে, কিভাবে নেয়া সম্ভব? - এসব ভাবতে ভাবতে ডাক্তার সমিরুলের বন্ধু ডা. আ ম ম মিনহাজুর রহমান দ্বারস্থ হলেন চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার আমেনা বেগমের। পুলিশের মাধ্যমে করোনা রোগ থেকে সেরে ওঠা কোন সুস্থ ব্যাক্তির সন্ধান পাওয়া যায় কিনা এবং সেই রোগীর প্লাজমা গ্রহণে সম্মতি আদায় করা যায় কিনা, সেই প্রচেষ্টা চালান ডা. মিনহাজ।

সেই ঘটনার পরম্পরা জানার আগেই জেনে নেয়া যাক প্লাজমা থেরাপির সুফল বিষয়ে। করোনা বিষয়ে সহায়তার জন্য চট্টগ্রাম বিভাগের সমন্বয়কারীর দায়িত্ব প্রাপ্ত স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) এর সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. মিনহাজ জানান, কোন কোভিড-১৯ রোগী সুস্থ হলে তার রক্তে করোনার অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। তা থাকে রক্তের হলুদাভ জলীয় অংশে, এটাই প্লাজমা। সুস্থ হওয়া রোগীর রক্ত থেকে এই প্লাজমা নিয়ে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করিয়ে দিলে আক্রান্ত রোগীর করোনা প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে এবং সুস্থ হয়ে ওঠেন ৷ 

এ প্লাজমা পদ্ধতির যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে, বিশ্বের দেশে দেশে তা প্রমাণিতও। প্লাজমা থেরাপিতে জীবন শঙ্কায় পড়ে যাওয়া রোগী সেরে উঠেন দ্রুত, প্লাজমা না দেয়া রোগিদের তুলনায় সেরে উঠার এ হার প্রায় সত্তর থেকে আশি শতাংশ। এভাবে প্লাজমা থেরাপির গুরুত্বের কথা জানালেন ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় অনেক চিকিৎসকই। 
কিন্তু অনুসন্ধানে প্রকাশ, দেশের কোথাও এখনো করোনা রোগ থেকে সেরে ওঠা ব্যক্তিদের রক্তের গ্রুপ বা সংশ্লিষ্ট কোন ডাটাবেজ তৈরি হয়নি, যা প্লাজমা সংগ্রহ ও প্রয়োগের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। 

চট্টগ্রামে ডা. সমিরুলের প্লাজমা প্রয়োগ প্রক্রিয়া এমন অনুপস্থিতিকে সামনে নিয়ে আসে। চট্টগ্রামে ৩৯৯ জন রোগী করোনা থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। কিন্তু তাদের তথ্যাবলী একটি নির্দিষ্ট স্থানে না থাকায় ডা. সমিরুলের প্লাজমা ডোনার সংগ্রহ ছিল অনিশ্চিত-উদ্বেগময়তায় ভরা। পুলিশ কর্তা আমেনার সহায়তায় ডা. মিনহাজ খুঁজে পান নিজেরই গ্রামের তরুণ সৌদি প্রবাসী তারেক সোহেলকে। 

গেল মঙ্গলবারের কথা। সকালে ডা. সমিরুলের অক্সিজেনের সেচুরেশন কমে গেলে সহকর্মী চিকিৎসকগণ তড়িঘড়ি করে অক্সিজেনের চাপ বাড়ান। এমন সংকট সময়ে সন্ধ্যায় তাকে প্লাজমা দেওয়া হয়। চমেক হাসপাতালে মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক অনিরুদ্ধ ঘোষের তত্ত্বাবধানে রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগের প্রধান ডা. তানজিলা তাবিদের নেতৃত্বে ২৫০ এমএল প্লাজমা নিয়ে প্রথমবারের মতো চট্টগ্রামে এই থেরাপির সূচনা হয়। 

একইভাবে ডা. সমীরুলকে দ্বিতীয় পর্যায়ে ও আরো একজন চিকিৎসকের বাবাকে প্লাজমা দিতে সম্মত হন চট্টগ্রাম পুলিশের সদস্যদের মধ্যে করোনায় আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হওয়া প্রথম সদস্য অরুণ চাকমা। যাত্রাটি এভাবে শুভ মনে হলেও সংকটের শেষ নেই এই অনিবার্য প্রয়োজনীয়তা সম্পন্ন প্লাজমা থেরাপিতে। যে মেশিনে প্লাজমা সংগ্রহ করা হয়, সেটি চট্টগ্রামের কোন সরকারি হাসপাতালে নেই। বেসরকারি পর্যায়ে রয়েছে মাত্র দুটি। চট্টগ্রামের মত অর্থনৈতিক ও ব্যবসা- বাণিজ্যিক গুরুত্ব সম্পন্ন বিভাগীয় শহরের এমন দশা স্বাভাবিকভাবেই দেশের অন্য বিভাগগুলোর ক্ষেত্রে শূন্যতার চিত্রই প্রতিভাত হয়। 

সঙ্গত কারণেই এখন প্লাজমা থেরাপির জন্য প্রয়োজনীয় মেশিন, ফ্রিজারসহ ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ জরুরী। প্রয়োজন যত দ্রুত সম্ভব একটি প্লাজমা ব্যাংক গঠন করা। আর এই কাজে দেশজুড়ে মানবিক পুলিশ প্রশাসনসহ আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। এতে করে করোনা থেকে মুক্ত হওয়া রোগীদের অনুসন্ধান ও প্লাজমা প্রদানে সম্মতির ক্ষেত্রে তা ইতিবাচক হবে। পুলিশ বাহিনীর অনেক সদস্যও করোনা থেকে সেরে উঠেছেন। তারাও এই ক্ষেত্রে সহায়ক হবেন নিঃসন্দেহে।

একথা পরীক্ষিত ও নিঃসন্দেহে বলা চলে যে,  প্লাজমা থেরাপি করোনায় মৃত্যুর হার কমাতে সহায়ক। তাই প্লাজমা এখন ত্রাণের চেয়েও জরুরি। কারোনায় মৃত্যু কমাতে  প্রয়োজন এ নিয়ে সরকারি পরিকল্পিত উদ্যোগ ও নির্দেশনা।

লেখক: সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন 
সিন্ডিকেট সদস্য, চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও আহ্বায়ক, চট্টগ্রাম নাগরিক উদ্যোগ।

বিডি-প্রতিদিন/শফিক


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর