শিরোনাম
প্রকাশ : ১৩ আগস্ট, ২০২০ ০৩:৪৫
আপডেট : ১৩ আগস্ট, ২০২০ ১১:২১

আগস্টের কালোরাতে পাশের বাড়িতে যেমন ছিলেন আমিনুল হক বাদশা ও বদরুন্নেসার মেয়ে নাসরিন!

সোহেল সানি

আগস্টের কালোরাতে পাশের বাড়িতে যেমন ছিলেন আমিনুল হক বাদশা ও বদরুন্নেসার মেয়ে নাসরিন!
সোহেল সানি

পনেরো আগস্টের রাতে মুহূর্মুহু গুলির গর্জনে ঘুম ভেঙে ছিল পাশের বাড়ির বাসিন্দাদের। সেদিন ঘাতকদের মুখোমুখি হতে হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর প্রেসসচিব সাংবাদিক আমিনুল হক বাদশা ও বেগম বদরুন্নেসা আহমেদের পরিবারকে। ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের বঙ্গবন্ধু ভবনের পূর্বপাশের বাড়িটির দোতলার বাসিন্দা ছিলেন বন ও মৎস পশুসম্পদ সচিব নূরউদ্দিন আহমদ। সরকারি সফরে দেশের বাইরে ছিলেন। তাঁর বড়মেয়ে নাসরিন আহমদকে ঘাতকদের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়।

তার মা প্রয়াত বেগম বদরুন্নেসা আহমেদ মহিলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভানেত্রী ও বঙ্গবন্ধু সরকারের শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। স্বভাবতই টার্গেট ছিল বাড়িটির ওপরে। নাসরিনের স্বামী ইমরান আহমদ তখন সিলেটে। ওদিনে বাড়িতেই ছিলেন নূরউদ্দিন- বদরুন্নেসা দম্পতির দু'কন্যা নাসরিন, শান্তা এবং দু'পুত্র রঞ্জন, গর্জন। পনেরো আগস্টের কালোরাতে হঠাৎ গুলির শব্দে ঘুম থেকে জাগেন। 

নাসরিনের এক নিবন্ধে ফুটে উঠে সেদিনের রাতের দৃশ্যাবলী। নাসরিনের ভাষায় ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি আসছিল। দেয়াল ভেদ করে বুঝি গায়ে লাগবে। হামাগুড়ি অবস্থা। কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। তখনই ফোন বেজে উঠল। রিসিভার তুললাম। এক আত্মীয় রাজু আহমেদের স্ত্রী, টুকু ভাবীর কন্ঠ। সে জানাল, 'শেখ মনিকে মেরে ফেলা হয়েছে।' বুঝলাম বঙ্গবন্ধুর বাড়ি আক্রমণের কারণ কি! আচমকা দরজা জানালা কাঁপিয়ে একটা মর্টার পড়ল। আমার গলায় হ্রদ পিন্ডের কাঁপণ তখন। মাথার দু'ধারে শিরা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছিল। কানে ধক্ ধক্ আওয়াজ। হঠাৎ কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। আমাদের দরজায় প্রচন্ড আঘাত। বিকট শব্দ।  উঁচু গলার নির্দেশ 'বেরিয়ে এসো, -ভেতরে যারা আছো, বেরিয়ে এসো।' এই মূহুর্তে বেরিয়ে না এলে সবাইকে গুলি করে মারব। 

কে খুলবে দরজা, ভীতসন্ত্রস্ত সবাই। আমি দরজা খুললাম। চিৎকার করে কালো পোশাকধারী একটা লোক বললো, দরজা খুলছিলে না কেন? বললাম ভয়ে। আরেকজন নিজেকে মেজর পরিচয় দিয়ে বললো, কিসের ভয়? এরপর বললো, লাইন করে দাঁড়াও। আমার শিশুপুত্র বুনোকে বুকে জড়িয়ে মিনতি করে বললাম, আমাদের মারবেন না প্লিজ। এর মধ্যে আরো কালো পোশাকধারী লোক জড়ো হলো। 

আমাদের সবাইকে পেছনের বাড়িটিতে নিয়ে গেলো। এই বাড়িটি আমার মা বেগম বদরুন্নেসা আহমেদের। শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী থাকা অবস্থায় মারা যাবার পর বাড়িটিতে কেউ থাকে না। ধূলোর আস্তরণ। তার মধ্যে আমাদের বসতে হলো। গুলি আর মটারের শব্দে মনে হয়েছিল সবাইকে হত্যা করে  বঙ্গবন্ধুর বাড়ি বুঝি ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আমরা লাইন দিয়ে মেঝেতে বসে আছি। সেন্ট্রি বন্দুক হাতে আমাদের দুদিকে। 

অস্ত্রধারী একজন আমাদের জিজ্ঞেস করলো, শেখ কামালকে চিনতে? বললাম হ্যাঁ চিনতাম। রাতে সে বাড়িতে ছিলো? জানি না। পরে আবার জিজ্ঞেস করলো শেখ জামাল?  জানিনা। শেখ কামালের স্ত্রী? দেখেছি। সে নাকি খুবই সুন্দরী? এবার বাদশা ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে সে বললো আপনার নাম? আমিনুল হক বাদশা। কি করেন? সাংবাদিকতা। ওরে বাবা, তাহলে-তো আমাদের খুব ভালো ব্যবহার করতে হবে। 

এই সময় জোয়ানদের হৈচৈ চিৎকার চেঁচামেচি ভেসে আসছিল। আমাদের বারান্দায় নিয়ে আসা হল। স্পষ্ট মহিলা কন্ঠের আর্তনাদ শুনতে পেলাম। হুহু করে কান্নার শব্দ। গুম্ গুম্ শব্দে গুলির আওয়াজ। কান্না থেমে গেলো। কিছুক্ষণের নিস্তব্ধতা। গোটা বাড়ি কালো পোশাকধারীদের দখলে। আমাদের দুই বাড়ির মাঝে ছোট একটি দেয়াল, মাঝে ছোট্ট গেইট, সেই গেইট দিয়ে আমরা এ বাড়ি- ও বাড়ি যাওয়া আসা করতাম। এরপর কানে এলো অদ্ভুত শব্দ। ট্যাংকের ঘড় ঘড় শব্দ, বঙ্গবন্ধুর বাড়ির মুখে। আমাদের যে লোকটা প্রশ্ন করছিল, সে বললো, "এবার খেলা শুরু হবে। " আঁৎকে উঠলাম। নির্বিকার হয়ে গেলাম। যে কোন মূহুর্তে মারা যাবো। এটাই ধরে নিলাম। 

একটা লোক এলো। হাতে স্টেনগান। কোমরে আঁটা রিভলবার। উত্তেজিত হয়ে পরিচয় দিল- মেজর বজলুল হুদা। বাদশা ভাইকে ডেকে, অস্ত্রটা মাটিতে ঠুকতে ঠুকতে, আপনার নাম?  আমিনুল হক বাদশা। মাথাটা হঠাৎ নামিয়ে মৃদুস্বরে বললো, বাদশা ভাই আমি আপনাকে চিনি। বাদশা ভাই বললেন, আমিও তোমাকে চিনি। সঙ্গে সঙ্গে মুখাবয়বে পরিবর্তন দেখা গেলো। বললো, আমি তো জানি এটা কার বাড়ি। যান, যান আপনারা বাসার ভেতরে চলে যান। স্বাভাবিক হন। আমরা ভেতরে প্রবেশ করলাম। আমাদের যে দুইটা লোক পাহাড়ায়, তাদের একজন বললো, "আরে রেডিও খোলেন। মজার ঘটনা আছে।" অপর লোকটি বললো, "সব শেষ করে দিয়েছে। কাউকে রাখেনি। " 

সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলেছিলাম। এমন সময় ফোন বেজে উঠলো। ধরলাম আমি। "বঙ্গভবন থেকে রাষ্ট্রপতি, নূরউদ্দিন সাহেবকে চাইছেন।" চমকে উঠলাম রাষ্ট্রপতি? বললাম -উনি তো নেই, দেশের বাইরে। কে কথা বলছেন? আমি উনার বড় মেয়ে। একটু অপেক্ষা করুন। কিছুক্ষণপর সে বলল, রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ, জানতে চাইছেন আপনারা কেমন আছেন।- জ্বী আমরা সবাই ভালো আছি। আপনার পরিচয়...?  তাজুল ইসলাম। 

বাদশা ভাইকে চাইলো। বাদশা ভাই কথা বললেন। তাকে বঙ্গভবনে যোগাযোগ করতে বলা হলো। হ্যাঁ ও না করে করে কোনমতে এড়িয়ে গেলেন বাদশা ভাই। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এলো। হঠাৎ কানে শুনি ঠক্ ঠক্ করে কাঠের ওপর পেরেক ঠোকার শব্দ। দোতলার দক্ষিণমুখো ঘরের জানালা দিয়ে তাকাই। দেখি, বঙ্গবন্ধুর গেইটের ঠিক সামনে, লেকের পাড়ে, অনেক কাঠের তক্তা। সেই কাঠে পেরেক ঠোকা হচ্ছে। কফিনের বাক্ম। শব্দ বুকে এমনভাবে বিঁধেছিল, আজও সেই ঠক্ ঠক্ শব্দ কানে শুনতে পাই।  

১৬ আগস্ট বাসায় এলেন আমাদের দূরসম্পর্কের মামা কর্নেল আতিক (পরে সেনাবাহিনী প্রধান)। এর আগে কর্নেল মুজিব নামেও বড়ভাইয়ের মতো এক ভাই এসেছিলেন। তারা অভয় দিলেন। দুইদিনের জন্য আমাদের অন্যত্র নিয়েও রেখেছিলেন। দু'টো গাড়িতে করে বেরিয়ে যাচ্ছিলাম বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সামনে দিয়ে। দেখতে পেলাম খোলা গেইটের ভেতরে রাখা আছে একটা কাঠের কফিন। আর তারপাশে স্তূপীকৃত বরফ। ঘাতকরা ঝাঁঝরা করে দিয়েছে বাংলার বুক? ঘাতকরা চিরতরে ছিনিয়ে নিয়েছে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারকে। কি সহজেই না সব শেষ হয়ে গেলো! বেগম মুজিব, শেখ কামাল, শেখ জামাল, আমাদের আদরের রাসেল, খুকী, রোজী সবাই। 


অনুলেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

 

বিডি-প্রতিদিন/সিফাত আব্দুল্লাহ


আপনার মন্তব্য