Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ১২:৪৬
আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ১৩:১১

মোটরসাইকেল ট্যুরিজম

অনলাইন ডেস্ক

মোটরসাইকেল ট্যুরিজম
আশফাক হাসান

হাঁটার থেকে দ্রুত কিন্তু বহনে এবং চালনায় কম পরিশ্রম, ঝামেলা মুক্ত মাধ্যম হিসেবে সাইকেলের সাথে মোটর-যুক্ত করেই মোটর সাইকেলের উৎপত্তি। মোটরসাইকেলে ভ্রমণের জনপ্রিয়তার ঢেউ এখন বাংলাদেশেও। কর্মব্যস্ত জীবনে আবদ্ধ জীবন লম্বা ছুটিতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে মন ছুটে যেতে চায় সব কিছু ছেড়ে একটু দূরে। আর দুঃসাহসিকতা যখন ভর করে বসে তখন দূরত্ব আর বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। তাই আজকাল প্রায়শই দেখা যায় এই ছোট ছোট দলগুলো মোটরসাইকেলে ছুটে বেড়াচ্ছে দেশের ট্যুরিস্ট-স্পট গুলোতে, দেশের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। ভ্রমণটা যদি হয় পুরো পরিবার নিয়ে এর স্বাদটা হয়ে যায় একেবারেই অন্যরকম। ঘরে আর মন পড়ে থাকার কষ্ট থাকে না।

এইতো সেদিন তিন দিনের ছুটিতে ৫৫টি বাইকে করে পরিবার-বন্ধুবান্ধবরা মিলে ঢাকা-কক্সবাজার-টেকনাফ-ঢাকা ঘুরে এলো বি.ডি রাইডার্স নামের ফেসবুকগ্রুপের সদস্যরা। এদের মাঝে চাকুরীজীবী থেকে শুরু করে ছাত্র, স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবার কিংবা ব্যাচেলর, বিভিন্ন পেশাজীবী – এ ছিলো এক অনন্য মিশ্রণের মিলনমেলা। ২০১৭ তে শুরু এক হওয়া এই বি.ডি.রাইডারস মোটরসাইকেল ট্যুরিং গ্রুপটি পরিবার-বন্ধুসহ সুস্থ ভ্রমনের উৎসাহ ও উদ্দীপনা ছড়িয়ে দিতেই পথ ছুটে চলেছে। আর সেই লক্ষকে সামনে রেখে যাত্রার পূর্বেই পর্যবেক্ষক দল ভ্রমণ করে আসে সম্ভাব্য গন্তব্য। পর্যবেক্ষক দলকে হিসেব করতে হয় কোথায় বিরতি, কতক্ষণ বিরতি, খাবারের ব্যবস্থা, সবগুলো মোটরবাইকের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য-ব্যবস্থাপনাসহ চলার পথের নানাবিধ জোগাড়যন্ত্র। এরপর কঠর নিয়মনীতি’র প্রণয়ন, স্বেচ্ছাসেবক বাছাই।

যাত্রার শুরুর মিলনস্থল ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিশুক-মনির চত্ত্বর। যেখানে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো দুই বিশেষ মানুষকে বহনকরা গাড়ির ধ্বংসাবশেষ এর ম্যুরাল যেন এক সাবধানবার্তা। সেখান থেকে হানিফ ফ্লাইওভার এর টোল প্লাজায় সারি দিয়ে দাঁড়ানো। সারিবদ্ধতার সাথে সাথে চলে নিয়মগুলোর পুনরাবৃত্তি এবং মহাসড়কে চলার নিয়মগুলো। দলের ফাঁকে ফাঁকে স্বেচ্ছাসেবকদের অবস্থান গ্রহণ। এগিয়ে চলে ধীরগতিতে পুরো বহরটি।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে উঠবার পর দায়িত্ব যেন আরও বেড়ে যায়। গতি নয়, ধীরতাই গন্তব্যে পৌছানোর মূলমন্ত্র গেঁথে দিতে হয় প্রতিটি সদস্যদের মনে। যাওয়া আসা মিলে পথের দৈর্ঘ্যে যে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার। এ যেন এক ম্যারাথন। গতি নয়, ধৈর্য এর জ্বালানি।

কুমিল্লার কাছাকাছি এসে দেখা যায় রাস্তায় কুয়াশার দল মেঘের আকার নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। নিরাপত্তার কথা ভেবে গতি আরো কমিয়ে আনা হয়। বিরতিগুলোও একটু দীর্ঘতর হয়। এরই ফাঁকে সেরে নেয়া হয় রাতের খাবার। আবার পথচলা শুরু। রাতের অন্ধকার আর কুয়াশার চাদরের ফাঁকে ফাঁকে জোনাকির দলে ৫৫টি মোটরবাইক এগিয়ে চলে। সাপের মতো একে বেঁকে এগিয়ে চলে দলটি। কোথাও কারো সমস্যা হলেই নিরাপদে সকলেই দাঁড়িয়ে পড়ে। সময়ও এখানে মুখ্য নয়। 

দলটি যখন চট্টগ্রাম শহর পেরোচ্ছে – পুরো শহর তখন মাত্রই ঘুম থেকে জেগে উঠছে। নামাজের বিরতিতে কেউ কেউ ছুটে যাচ্ছে কাছের মাসজিদে। ট্রাফিক সিগনালের পুলিশের ঘোর লাগা দৃষ্টি যেন বলছে, সে কি স্বপ্ন দেখছে নাকি সত্যি! এতোগুলো মোটর-আরোহী কি করছে এখানে! কেউ কেউ তো প্রশ্ন করে – ভাই সাথে কি ভি-আই-পি আছে কিনা। উত্তর আসে আমরাই তো ভি-আই-পি। কক্সবাজারের আনন্দ ভ্রমণ শুনে চলে শুভেচ্ছা আর দোয়া বিনিময়।

শহর পেরিয়ে এসে হালকা নাস্তার বিরতি। কারণ এখন যে নতুন এক ভয়। আর তা হলো সারারাতের ক্লান্তি ঘুম হয়ে ভর করতে পারে। তাই নতুন নির্দেশনা। যখনই প্রয়োজন হবে অল্প বিরতি নিয়ে চোখে মুখে পানি দিয়ে নিতে হবে। কোন ভাবে ঘুম চোখে জোর করে চালানো যাবে না। প্রয়োজনে পিছনের আরোহীকে দিয়ে বাইক চালাতে হবে। কিংবা চায়ের দোকানে বিশ্রাম। যেহেতু ছুটি শুরু হয়ে গেছে ঢাকা থেকে ধেয়ে আসছে শত শত ট্যুরিস্টবাহী বাস। তাই সাবধানতা এখন রাতের অন্ধকারের থেকে দিনের আলোতেও বেশি প্রয়োজন। 

চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের মহাসড়কের আকাবাকা উঁচুনিচু পথে এগিয়ে চলে সারিটি। স্বাভাবিক ও নিয়মতান্ত্রিক বিরতিতে দলটিকে দূর থেকে কখনোই জটলা মনে হয়নি। এক সারিতে চলার কারণে তৈরি হয়নি কোন জটিলতা। ধীরে ধিরে দলটি প্রবেশ করে কক্সবাজার শহরে। সূর্য তখন মধ্য গগনে মাথার উপর তাপ ছড়াচ্ছে। শহরটি ইতিমধ্যে লোকে লোকারণ্য। পরে জানা যায় সেদিন নাকি কক্সবাজারে প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ পর্যটক ছিলেন।

পরদিন সকাল ৯টায় যাত্রা শুরু হয় টেকনাফের উদ্দেশ্যে। পথ বিখ্যাত মেরিন ড্রাইভ। আসার আগে শোনা যাচ্ছিল সেখানে সংস্কার কাজ চলছে। তাই অতটুকু পথ এড়িয়ে যাবার জন্য সিদ্ধান্ত হয় সমুদ্র সৈকত ধরে এগুনোর। দলটি বালুকা বেলায় উত্তাল সাগরের সাথে মিশে যাবার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। সৈকত হয়ে মেরিন ড্রাইভে উঠে আসে দলটি। এরপর আসে সাবধান সূচক নির্দেশনা। যেহেতু পথটির অধিকাংশই খালি পাওয়া যাবে তাতে কেউ যেন অত্যাধিক গতিতে না চালায়। কারন আশে পাশে রয়েছে অনেক স্কুল মাদ্রাসা এবং হোটেল। তাই সাবধানতা অবশ্যই লক্ষণীয়। ইনানী বিচের পাশ ঘেঁষে যাবার সময় পর্যটকদের আনন্দ ছিলো লক্ষণীয়। বিডিআর চেক পোস্টে প্রয়োজনীয় কাজ সেরে দলটি আরো এগিয়ে গিয়ে বেছে নেয় একটি নিরব বালুকাবেলা। চলতে থাকে ফটো সেশন আর বাচ্চাদের দৌড়ঝাঁপ। এর সাথে তরমুজ খাবার এক মহোৎসব। প্রায় এক ঘণ্টা পর দলটি সাবরাং অর্থ্যাত মেরিন ড্রাইভের শেষ মাথার উদ্দ্যেশ্যে যাত্রা শুরু করে।

সাবারাং পৌছে উত্তাল সাগরের সাম্পানের দলুনীর দৃশ্য ছিলো মহোময়। অতিউৎসাহী কেউ কেউ মোটরবাইকসহ নেমে গেলো সাগর পাড়ে, কেউ কেউ সোজা সমুদ্রে। ব্যাপারটা এমন শখের মোটর বাইক ছাড়া যেন সাগরে নামা যাবে না। সেখানে বসে সিদ্ধান্ত হলো এতো বড় দল নিয়ে টেকনাফ বাজারে প্রবেশ করাটা সমচীন হবে না, কারণ পর্যটকদের ভিড়। অবশ্য সাগর ছেড়ে ভিড়ের ভিতর কেউ যেতেও আগ্রহী বলে মনে হলো না। মা-বাবা’রা তাদের বাচ্চাদের নিয়ে পানিতে সময় কাটাতেই বরং বেশি উৎসাহী। আশে পাশের দোকানে ডাব-কলা দিয়ে চললো দুপুরের খাবার। কেউ কেউ লবণ খামারে গিয়ে ছবি তোলার ব্যাপারে উৎসাহী। কেউ বা চড়ে বসলো তীরে রাখা সাম্পানে। সে এক অদ্ভুত সময়। দলটি বিকেলে ফিরে আসে কক্সবাজার। সকাল হলেই ফিরে যেতে ভেবে অনেকের তখন থেকেই একটু মনঃ খারাপ মত।

যাত্রার তৃতীয় দিন। যদিও কথা ছিলো ভোরে যাত্রা শুরু। কেউ কেউ ভোর বেলা উঠেই চলে গিয়েছিলো সৈকতে। শেষবারের মতো সমুদ্রে অবগাহনের সুযোগ কে-ই বা ছাড়তে চায়। সকালের নাস্তা খেয়েই দলটি যাত্রা শুরু করতে করতে বেলা ৯টা। সেই একই পদ্ধতিতে নিয়মিত বিরতিতে দলটি ঢাকা ফিরে আসে রাত একটায়।

এতো বড় আয়োজন সম্পর্কে কিভাবে সম্ভব জানতে চাইলে গ্রুপের এডমিন জাভেদ দেলোয়ার বলেন, মোটর-বাইক ট্যুরিং বিশ্বে একটি জনপ্রিয় ভ্রমণ মাধ্যম। শুধু তরুণ যুবকরা বন্ধুবান্ধব নিয়ে ঘুরে বেড়াবে কেন? মাঝে মাঝে পুরো পরিবার নিয়ে ঘুরে আসতে ইচ্ছে করে। তাই এই উদ্যোগ। মোটরবাইকের কথা শুনলেই সবাই একটু ভয় পায়, কিন্তু দলীয় সহযোগিতা আর সমমনা হলে ভয় কে জয় করা সম্ভব।

তিনি আরো বলেন, সহযোগী মনভাবের পাশাপাশি  কঠোর নিয়ম মেনে চলার মানসিকতা রাখতে হয় দলের সকলকে। কারন এ ধরণের ভ্রমণে হঠাৎ করেই কারো সমস্যা হতেই পারে। সেক্ষেত্রে সকলকে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হতে পারে। যেমন কক্সবাজার থেকে বের হবার কিছু পরেই আমাদের এক বন্ধুর বাইকের চেইন ছিড়ে যাওয়ায় আমরা সকলেই ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করি। এতে প্রায় দুই ঘণ্টা রাস্থায় অপেক্ষা করতে হলেও সদস্যরা তাতে বিরক্ত হননি, বরং আশে পাশে ছবি তুলতে তুলতেই সময় কাটিয়ে দেয় তারা।

ঢাকা থেকে রাতে যাত্রা শুরু করতে কোন বাধার সম্মুখীন হয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, হ্যাঁ। আর সেটা হলো প্রাকৃতিক বাধা, ঘন কুয়াশা। তখন আমাদের গতি ছিলো ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটার বা তার কিছু বেশি। অবস্থা যাই হোক না কেন আমরা কখনোই উশৃঙ্খলতাকে প্রশ্রয় দেই না আর ঝুঁকি নিতে আগ্রহী হই না। আর তাই তো যাবার দিন আমাদের প্রায় ১৬-১৭ ঘণ্টা সময় লেগে যায় আমাদের।

কক্সবাজার পৌঁছাবার পরদিন দলটি পৌছে মেরিন ড্রাইভ এর শেষ মাথা টেকনাফের সাব্রাং। সারা দিন সাগর পাড়ে সময় কাটিয়ে বিকেলে দলটি ফিরে আসে কক্সবাজার। পরদিন বেলা ৯টায় ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে দলটি। সদস্যদের সকলকেই সুস্থ অবস্থায় ফিরে আসে যার যার ঘরে।

লেখক, ভ্রমণকারী

বিডি প্রতিদিন/ফারজানা


আপনার মন্তব্য