শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ১৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:৩১

ভ্রমণকন্যাদের গল্প

তানিয়া তুষ্টি

ভ্রমণকন্যাদের গল্প

দেশটাকে দেখব দুচোখ ভরে। শুনব, জানব, সচেতন হব, শক্তি অর্জন করব- এমন কিছু মটো নিয়ে ঢাকা  মেডিকেল কলেজ থেকে সদ্য পাস করা দুই ডাক্তার সাকিয়া হক ও মানসী সাহা ভাবলেন পুরো দেশ ঘুরে দেখবেন। শুরু করলেন খোঁজাখুঁজি, দেশভ্রমণে মেয়েদের কোনো টিম আছে কিনা, কিন্তু পেলেন না। তখন নিজেরাই উদ্যোগ নেন একটি টিম গঠনের। আর সেই টিম নিজেদের স্কুটি নিয়েই পুরো দেশটাকে ঘুরে ঘুরে দেখবে। স্কুটি চালাবেন সাকিয়া হক ও মানসী সাহা আর পেছনে থাকবেন দুজন সঙ্গী। এই চিন্তা থেকেই ২০১৬ সালের ২৭ নভেম্বর তারা শুরু করেন  দেশ ঘোরার মিশন।

 

বরাবরই দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ানোর শখ ছিল তাদের। কিন্তু কোথাও ঘুরতে বের হতে চাইলেই নানা সমস্যার মধ্যে পড়তেন। বাসা থেকে অনুমতি মিলত না। যদিওবা অনুমতি পেতেন, শর্ত থাকত সঙ্গে অবশ্যই মেয়ে থাকতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা সব সময় পরিবারের এমন চাওয়ার সঙ্গে মেলে না। তাই বিকল্প পদ্ধতি খোঁজা। যেভাবেই হোক দেশ ঘুরে দেখার অদম্য ইচ্ছাকে পূরণ করা চাই-ই। তখন ভাবনা হলো মেয়েরা দলবেঁধে ঘুরলে কেমন হয়? যেই চিন্তা সেই কাজ। সব ব্যবস্থা পাকাপাকি করে পরিবারকে কোনোমতে বুঝিয়ে শুরু করেন দেশভ্রমণ। অথচ এই দুজনের সঙ্গে এখন পুরো দেশ থেকে যোগ দিয়েছেন ২৮ হাজার ভ্রমণপিপাসু নারী সদস্য। সে দলে আছেন গৃহিণী, ছাত্রী, শিক্ষিকা থেকে শুরু করে সব পেশার নারী। ভ্রমণের  নেশায় ঘুরে বেড়ানো এ ভ্রমণকন্যারা কখনো ছুটে যান সমুদ্রে বা নদীতে। কখনো ছুটে চলেন পাহাড়ের বুক চিরে ঝরনার স্রোতধারার অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে।

 

প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা আর নিজের দেশের মায়াময় রূপ দেখতে পাহাড়, পর্বত, সমুদ্র, বনসহ বিভিন্ন দুর্গম অঞ্চলেও পড়েছে তাদের পায়ের ছাপ। তারা শুধু ঘুরেই  বেড়ান না, সামাজিক বিভিন্ন কাজের সঙ্গেও নিজেদের যুক্ত করেছেন। নারী ভ্রমণকারীদের এই দলটির নাম ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশ। সাকিয়া হক ও মানসী সাহা ফেসবুকের মাধ্যমে গড়ে তোলেন এই ভ্রমণ গ্রুপ।

 

দেশের এত এত দর্শনীয় স্থানের সন্ধান কীভাবে পান তারা, এমন প্রশ্ন আসতেই পারে। ভ্রমণকন্যাদের এক সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সিলভি রহমান জানান, আমরা দেশের পর্যটন কেন্দ্র বলতে গুটিকয়েক স্থানকে চিনি। কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্য ছিল পুরো দেশটা ঘুরে দেখা। বিশ্বাস ছিল পুরো দেশেই দেখার বহু স্থান রয়েছে। সেগুলোর সন্ধান পেতে কিছু জেলা ভ্রমণের পর রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমিতে দুইটি জাতীয় ফটোগ্রাফি এগজিবিশনের আয়োজন করি। সেখানে পুরো দেশ থেকে ছেলে-মেয়ে উভয়ে নিজ নিজ জেলার দর্শনীয় স্থানের ছবি নিয়ে অংশগ্রহণ করে। মূলত এই এগজিবিশনের মাধ্যমেই আমরা প্রতিটি জেলায় অনেক সুন্দর জায়গার সন্ধান পাই। তখন আমরা সেসব জায়গাকেই প্রমোট করতে চেয়েছিলাম। আমাদের গ্রুপের বিশেষ প্রজেক্ট ‘নারীর চোখে বাংলাদেশ’কে সফল করার জন্য প্রতিটি জেলায় নিজেদের পায়ের ছাপ রাখার প্রয়াস চালাই। এখন পর্যন্ত ৮টি ধাপে দেশের ৫৭টি জেলা ঘোরা সম্পন্ন হয়েছে আমাদের। খুব শিগগিরই পাহাড়ি জেলাগুলো ঘুরব। ঢাকায় ভ্রমণের মধ্য দিয়ে আমাদের ভ্রমণ ৬৪টি জেলায় শেষ হবে।

ভ্রমণকারীদের এই গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ডা. সাকিয়া হক জানান, শুরুতে চিন্তাটা মাথায় আসার পরই ফেসবুকে একটা পোস্ট দিলাম। দেখলাম শুধু আমি নই, ভ্রমণপিয়াসী এমন অনেকেই সাড়া দিলেন। ব্যস  ফেসবুকেই গড়ে উঠল গ্রুপ ‘ট্রাভেলেটস অব বাংলাদেশ’। ছুটির দিনগুলোতে দেশের দর্শনীয় স্থানগুলোর সৌন্দর্য উপভোগ করতে দলবেঁধে বের হন সদস্যরা।

এই ভ্রমণের প্রধান বাহন স্কুটি দুইটি সাকিয়া হক ও মানসী সাহার। তাই প্রতিটি ভ্রমণে তারা থাকেন। কিন্তু পেছনের দুজন মাঝে মাঝে পরিবর্তন হন। ষষ্ঠ ধাপ পর্যন্ত নিজেরা খরচ চালিয়েছেন। কিন্তু ৭ম ধাপ থেকে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড শুধু ফুয়েলের খরচ দিচ্ছে। স্কুটি দুইটি কর্ণফুলী অটোমোবাইলস লিমিটেড স্পন্সর করেছে।

নিরাপত্তার ব্যাপারটি নিয়ে সমস্যা হয় না তাদের। কোনো জেলায় গিয়ে রাতযাপন করতে হলে সেখানকার সার্কিট হাউস ব্যবহার করেন তারা। তাছাড়া কোথাও যাওয়ার আগে ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট দিয়ে সেসব এলাকার স্বেচ্ছাসেবক আহ্বান করেন তারা। সেখানে পৌঁছনোর পর দেখা যায় তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন অনেক মেয়ে। ভ্রমণ করতে গিয়ে  কোনো সমস্যায় পড়ার অভিজ্ঞতা আছে কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে সংগঠনটির আরেক প্রতিষ্ঠাতা ডা. মানসী সাহা বলেন, এখন পর্যন্ত আমাদের তেমন  কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি। এছাড়াও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি সেক্রেটারি নুরুন আক্তার আমাদের খুব স্নেহ করেন। আমরা কোথাও যাওয়ার আগে তিনি সেসব জায়গায় থাকার ব্যবস্থা করে দেন। পুরো দেশ ঘুরে মনে হয়েছে, দেশের বেশির ভাগ মানুষই ভালো।

‘নারীর চোখে বাংলাদেশ’

সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে কিছু জেলা ভ্রমণের পর চালু করেন গ্রুপের এক কার্যক্রম ‘নারীর চোখে বাংলাদেশ’। এ কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্যই হলো  জেলার বিভিন্ন স্কুল-কলেজে নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ, নারীর ক্ষমতায়ন, আত্মরক্ষা, খাদ্য-পুষ্টি, বাল্যবিয়ে ও বয়ঃসন্ধিকালীন স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা। এ বিষয়ে দেড় ঘণ্টার মতো ওয়ার্কশপ থাকে। দেশঘোরার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া হয় ছাত্র-ছাত্রীর মাঝে। তাদেরও অনুপ্রাণিত করা হয় ভ্রমণের প্রতি। এছাড়াও ভ্রমণকন্যাদের কাছ থেকে বিভিন্ন জেলার উল্লেখযোগ্য তথ্য জানতে পারে তারা।

সিলভি জানান এখন পর্যন্ত তিনি ঘুরেছেন ২৪টি জেলা। ৬৪টি জেলা ঘোরার মিশন সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত তিনি গ্রুপের সঙ্গে থাকবেন। এরপর তারা গ্রুপের মেম্বারদের ফলোআপে রাখবেন। প্রতিটি জেলার বাকি স্কুলগুলোতে ছাত্র-ছাত্রীদের সচেতনতামূলক ওয়ার্কশপ করাবেন মেম্বারদের দিয়ে। তাদের চাওয়া, সব মেয়ে দেশটাকে ঘুরে দেখুক। তাদের গ্রুপের মটোই হলো, ভ্রমণের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন। সিলভি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি দেশভ্রমণ যতটা না শক্তির তার চেয়ে বেশি সাহসিকতার। তারা দেশকে দেখা ও জানার মাধ্যমে নিজেদের সাহসী করে তুলুক।