শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৯ ২২:২৩

শত বছরের ঐতিহ্যে পুরান ঢাকা

শত বছরের ঐতিহ্যে পুরান ঢাকা

পুরান ঢাকার সংস্কৃতি, প্রথা, কৃষ্টি, আনুষ্ঠানিকতা সবকিছুতেই একটা নিজস্বতা আছে। ঢাকাই সংস্কৃতিটা বিকশিত হয়েছে তার নিজস্ব পরিধির মধ্যে এবং তা নিয়ে তারা গর্ব করে। এখানে আছে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা, বিরানি, বাকরখানিসহ রসনা তৃপ্তিকারী নানান খাবার; তামা, কাঁসা, শঙ্খের মতো হস্ত ও কুটিরশিল্প। নদীতে নৌযান এবং বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় বাহন রিকশা। লিখেছেন-  শামছুল হক রাসেল মাহবুব মমতাজী -   ছবি : জয়ীতা রায়

 

স্থাপনার বৈচিত্র্য

পুরান ঢাকার শত শত বছরের পুরনো স্থাপনাগুলো এখনো মাথা উঁচু করে জানান দিচ্ছে ঢাকাইয়া কৃষ্টি-কালচার ও ঐতিহ্যের। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- আহসান মঞ্জিল, লালবাগ কেল্লা, রূপলাল হাউস, আর্মেনীয় গির্জা, বড় কাটরা, ছোট কাটরা, বাহাদুর শাহ পার্ক, শাঁখারীবাজার, ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল, হোসনি দালান, তারা মসজিদ, শায়েস্তা খাঁ জামে মসজিদ, বেগম বাজার মসজিদ, খান মুহাম্মদ মসজিদ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, হিঙ্গা বিবির মসজিদ ও চকবাজার শাহী মসজিদ। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যের সুরম্য আধার বলা হয় আহসান মঞ্জিলকে। আজকের বাংলাদেশ এককালে শাসন করেছেন জমিদার, রাজা, নবাবরা। কালের বিবর্তনে তারা হারিয়ে গেলেও শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য নিদর্শন ও গৌরবময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে ভরপুর ‘আহসান মঞ্জিল’ নিয়ে এখনো পর্যটকদের আগ্রহের কমতি নেই। স্মরণীয় ঘটনাবলি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্মৃতিবিজড়িত ‘গোলাপি’ এই ভবনটি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের পদচারণায় মুখর। পুরান ঢাকার ইসলামপুরের কুমারটুলীতে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে ১৮৫৯ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করেন নওয়াব আবদুল গনি। মুঘল কিংবা সুলতানি স্থাপত্যের নিদর্শন না হলেও দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে আরমানিটোলার তারা মসজিদ। এটি ঢাকার নান্দনিক মসজিদগুলোর একটি। মির্জা গোলাম পীর ওরফে মির্জা আহমেদ জান নামে এক ব্যবসায়ী এর নির্মাতা বলে জানা গেছে। এ ছাড়া ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোর অন্যতম হলো রূপলাল হাউস। রূপলাল দাস ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। তিনি ছিলেন তার পরিবারের একমাত্র শিক্ষিত ব্যক্তি। প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন এবং সেই সময় স্কলারশিপ পেয়েছিলেন ১০ টাকা। জানা যায়, রূপলাল একজন সংগীত অনুরাগীও ছিলেন। রূপলাল হাউসের এক পাশে সুন্দর বাগান ছিল যা ‘রঘুবাবুর বাগান’ এবং এক পাশে একটি পুল ছিল যার নাম ছিল শ্যামবাজার পুল। কালের বিবর্তনে অযতœ-অবহেলায় এসব নষ্ট হয়ে যায়। এরপর নদীকে ঘিরে বাজার গড়ে ওঠে যার নামকরণ করা হয় শ্যামবাজার। বাড়ির ভিতরের অংশে ইউরোপিয়ান অফিসার এবং ব্যবসায়ীরা থাকার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু ১৯৩০ সালের দিকে নদীর অংশটি ব্যবসা কেন্দ্র হলে বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠলে তারাও জায়গাটি ছেড়ে যান। রূপলাল হাউস তার রূপ হারিয়ে ফেলেছে অনেক আগেই আর এখন এর অস্তিত্ব প্রায় বিলুপ্তির পথে। স্থানে স্থানে ভেঙে পড়েছে। মেরামতের কোনো উদ্যোগ নেই। ছাদে কার্নিশে এবং অন্যান্য স্থানে বটগাছ গজিয়েছে। কিন্তু বসবাসকারীরা এখনো নির্বিঘ্নে বসবাস করে যাচ্ছে। চারদিকে অসংখ্য দোকানপাটসহ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। ফলে মূল ভবনকে খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন। মোগলদের আরেকটি অপূর্ব নিদর্শন হলো লালবাগ কেল্লা। মোগল আমলে স্থাপিত এই দুর্গটির প্রথমে নাম ছিল কেল্লা আওরঙ্গবাদ। ১৮৪৪ সালে ঢাকা কমিটি নামে একটি আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠান দুর্গের উন্নয়নে কাজ শুরু করে। সে সময় থেকে দুর্গটি লালবাগ দুর্গ নামে পরিচিতি লাভ করে। অনেকে মনে করেন এটি পুরান ঢাকার লালবাগে অবস্থিত। আর তাই এর নামকরণ করা হয়েছে লালবাগ কেল্লা। এটি বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনস্থল। তবে কেল্লার স্থাপনার মধ্যে পরী বিবির সমাধি বেশ উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়াও আছে লালবাগ কেল্লা মসজিদ।

এ ছাড়া হোসনি দালান ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম। মহররম মাস এলে নিদর্শনটির গুরুত্ব বেড়ে যায় কয়েকগুণ। মহররম মাসের ১০ তারিখে অর্থাৎ আশুরার দিন সবচেয়ে বেশি ভিড় হয়। উপমহাদেশের প্রাচীনতম ইমামবাড়া ঢাকার হোসনি দালান। জানা যায়, এটি নির্মিত হয় ১৬৪২ সালে সুবেদার শাহ সুজার শাসনামলে। শাহ সুজার নৌবহরের এক অধিনায়ক (মীর মুরাদ) এ নিয়ে স্বপ্ন দেখেন। তার পর পরই নির্মিত হয় হোসনি দালান। এটি নির্মিত হয় মূলত কারবালার শোকাবহ ঘটনার স্মরণে এবং হযরত ইমাম হোসেনের আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখার উদ্দেশ্যেই। আর বর্তমান কাঠামোটি নির্মাণ করা হয় গত শতকের গোড়ার দিকে ব্রিটিশ সরকারের সময়। এটি নির্মিত হয় প্রায় ছয় বিঘা জমির ওপর। এখানে দেখতে পাওয়া যায় মনোরম একটি দ্বিতল ভবন। এর উত্তরে রয়েছে প্রশস্ত চত্বর, আর দক্ষিণ দিকে পুকুর। পশ্চিমে রয়েছে তাজিয়া ঘর, সামনে দেউড়ি ও দ্বিতল নহবতখানা ইত্যাদি।

 

ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র

ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র বলা হয় পুরান ঢাকাকে। এর মধ্যে ইসলামপুর দেশের বৃহত্তম পাইকারি কাপড়ের বাজার। সালোয়ার-কামিজ, শার্ট-প্যান্ট-পাঞ্জাবি, শাড়ি-লুঙ্গি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের থান ও গজ কাপড়ের বৃহৎ সম্ভার রয়েছে এখানে। মিলছে বিদেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কাপড়ও। কাঁচা ও নিত্যপণ্যের আরেক স্থান হলো শ্যামবাজার, ফরাশগঞ্জ, রহমতগঞ্জ। কসমেটিকস, খেলনা, প্লাস্টিকসামগ্রী ও নানা ডিজাইনের ঘর সাজানোর উপকরণের পাইকারি বাজার চকবাজার ও মৌলভীবাজার। একসময়ের একক আধিপত্যে থাকা এসব বাজার এখন নানা সমস্যায় ভারাক্রান্ত। তরকারির নিত্যপণ্যের জন্য শ্যামবাজার-ফরাশগঞ্জ, বইয়ের জন্য বাংলাবাজার আর ওষুধ এবং কেমিক্যাল সামগ্রীর জন্য মিটফোর্ডে চলছে শত বছরের ব্যবসা। এ ছাড়া নর্থব্রুক হল  রোডে রয়েছে মোটর পার্টসের ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানগুলো। অন্যদিকে চকবাজারে প্রসাধনী, ইমিটেশন, খেলনা, বিয়ে ও বার্থডের আইটেম সবচেয়ে সুলভ মূল্যে পাওয়া যায়। তাছাড়া রমজান মাসে এখানে রকমারি ইফতারের পসরা বসে। কাবাবের কথা এলেই চকবাজারের নামটিও আসবে। চকবাজারের কাবাব খুব বিখ্যাত। মৌলভীবাজার মনোহারি এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় মালামালের জন্য বিখ্যাত। বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে গড়ে ওঠা সবচেয়ে পুরনো বাজার শ্যামবাজার।     

এখানকার আড়তগুলোর জৌলুস এখনো টিকে আছে। ১৭৪০ সালে ঢাকার নায়েবে নাজিম নওয়াজিশ মোহাম্মদ খানের সময় ফরাসি বণিকদের প্রতিষ্ঠিত একটি ছোট্ট ‘গঞ্জ’ বা ‘বাজার’ কালক্রমে আজকের বৃহৎ শ্যামবাজারে রূপান্তরিত হয়েছে।

এখানকার লালকুঠি ঘাটের মোড় থেকেই আড়ত শুরু। ফরাশগঞ্জের বি কে দাশ রোড ধরে এগোতেই চোখে পড়বে সারি সারি আড়ত। সেখানে পিয়াজ, রসুন, আদা, শুকনো মরিচ, হলুদ, ধনেপাতা, আলু ইত্যাদি ভোগ্যপণ্যের বস্তা থরে থরে সাজানো। মাঝে মাঝে দু-চারটি ট্রাক থেকে পণ্য নামছে। গলি পথ ধরে হেঁটে নদীর পাশে গিয়ে সবজির ছোট আড়তের দেখা মিলবে। নদীপথে মুন্সীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ থেকে ট্রলারে করে লাউ, ফুলকপি ইত্যাদি সবজি ঘাটে ভিড়ে। বেশ কর্মচাঞ্চল্য থাকে এলাকাটি। সদরঘাটের দিকে এগোতেই পানের আড়ত। হাঁকডাক দিয়ে পান বিক্রি হয়। সব মিলিয়ে ৫০-৫৫টি পানের আড়ত আছে। তবে ব্যবসায়ীরা জানালেন, শ্যামবাজারের মূল ব্যবসা ওই পিয়াজ, আদা, রসুন, হলুদ ও শুকনা মরিচের আড়তদারি। আর ইসলামপুরে কাপড়ের গজ মাপা, খাতায় পরিমাণ তোলা, টাকা গুনতি, প্রখর রোদ শীত মৌসুম মিলে মালবোঝাই করে ট্র্যাক-কাভার্ড ভ্যান, লঞ্চ কিংবা ঠেলাগাড়িতে করে রাজধানীসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিয়ে যাওয়া এখানকার নৈমিত্তিক দৃশ্য। ইসলামপুর বস্ত্র ব্যবসায়ী সমিতির নিবন্ধিত ছোট-বড় দোকান রয়েছে প্রায় চার হাজার। এর বাইরে আরও অন্তত ছয় হাজার ছোট ও মাঝারি দোকান রয়েছে। ইসলামপুর মূল সড়কের দুপাশের মার্কেটে রয়েছে কয়েকশ শাড়ি কাপড়ের দোকান। মাঝামাঝি স্থানের মার্কেটে বিক্রি হয় চাদর, থ্রিপিস, স্যুট ও মার্কিন কাপড়। 

তবে বাংলাবাজার এলাকাটি ছিল মোগল আমলের আগের ঢাকার একটি অতি পুরাতন অংশ। সেই যুগে এ এলাকা ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যের মূল কেন্দ্র। পরবর্তীকালে ঢাকা শহর পশ্চিম দিকে সম্প্রসারিত হয় এবং চকবাজার হয়ে ওঠে এর মধ্যমণি। অপরিসর গলি, গলির ভিতরে থরে থরে বিভিন্ন প্রকাশনীর দোকান আর বই ও বহুতল মার্কেটে আকীর্ণ এই এলাকায় এখন আকাশ দেখাই দায়। কিন্তু বইয়ের সঙ্গে বাংলাবাজারের সম্পর্ক আকস্মিকভাবে হয়নি। আছে দীর্ঘ প্রেক্ষাপট। মোগল সুবেদার ইসলাম খাঁ ১৬১০ সালে ঢাকায় স্থাপন করলেন বাংলার রাজধানী। ১৮৬০-এ ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হলো ‘বাঙ্গালা যন্ত্র’, মানে ছাপাখানা। তখন থেকে এলাকাটি বইপাড়ায় পরিণত হতে শুরু করে। পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মিটফোর্ড হাসপাতালকে কেন্দ্র করে প্রায় ১৫০ বছর আগে গড়ে ওঠে ওষুধের ব্যবসা।

 

দিনটি শুরু হয় ছানা মাঠা  দিয়ে

ভোরে ছানা-মাঠা খাবারের অভ্যাস দেখা যায় শুধু পুরান ঢাকায়ই। এখানে দিনের শুরুটা হয় এখনো ছানা-মাঠা দিয়ে। আর মাঠা বিক্রির সঙ্গে পুরান ঢাকার ইতিহাস জড়িয়ে আছে। সকালে নগরীর ব্যস্ততা শুরুর আগেই পুরান ঢাকার নাজিরাবাজার চৌরাস্তায় শ্যামলের মাঠা, গেন্ডারিয়া ধূপখোলা বাজারের পাশে মাঠের গেট, নারিন্দা পুলিশ ফাঁড়ির বিপরীতে সৌরভের মাঠা, লালবাগের চৌরাস্তা, নবাবপুর মোড়, বংশাল, ইসলামপুর, বাংলাবাজার, কসাইটুলী, সূত্রাপুর-লোহারপুল, দয়াগঞ্জ মোড়, নাজিম উদ্দিন রোড, কলতাবাজার, রায়সাহেব বাজার, ফরাশগঞ্জ, শাঁখারী বাজারসহ অসংখ্য স্থানে বিক্রেতারা সুস্বাদু মাঠার দোকান নিয়ে বসেন।

 

 

সাকরাইন উৎসব

মাঘ মাসের প্রথম দিনটি পুরান ঢাকার আকাশ থাকে ঘুড়িওয়ালাদের দখলে। অর্থাৎ সেখানে শোভা পায় নানা রং আর বাহারি ঘুড়িদের সাম্যবাদ। অনুষ্ঠিত হয় সাকরাইন উৎসব। একে ঘুড়ি উৎসব বা পৌষ সংক্রান্তিও বলা হয়। আগে এ উৎসবটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে পুরান ঢাকায় সাড়ম্বরে পালিত হয় এ দিনটি। উৎসবে অংশ নেন সব ধর্মের সব বয়সী মানুষ।

পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া, মুরগিটোলা, ধূপখোলা, দয়াগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী, সূত্রাপুর, কাগজিটোলা, বাংলাবাজার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, কলতাবাজার, ধোলাই খাল, শাঁখারি বাজার, রায়সাহেব বাজার, তাঁতী বাজার, সদরঘাট এবং লালবাগ এলাকার মানুষ এ উৎসবে দিনব্যাপী ঘুড়ি ওড়ান। আয়োজন করেন নানা খাবারের। এ ছাড়া সন্ধ্যায় আতশবাজি ফোটানো এ উৎসবের অন্যতম অঙ্গ। তবে পঞ্জিকা অনুযায়ী কোনো কোনো এলাকায় মাঘের দ্বিতীয় দিনটি এই সাকরাইন উৎসব উদযাপিত হবে। সকাল থেকেই ছাদে ছাদে শুরু হয়েছে ঘুড়ি ওড়ানোর উন্মাদনা। বর্তমানে এ উৎসবে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। অর্থাৎ সন্ধ্যার পর থেকেই শুরু হয়ে যায় আতশবাজি ও ফানুস ওড়ানো। সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত এসব এলাকায় চলেছে আতশবাজির খেলা। সাকরাইনে শ্বশুরবাড়ি থেকে জামাইদের নাটাই, ঘুড়ি উপহার দেওয়া এবং পিঠার ডালা পাঠানো একটি পুরনো রীতি। ডালা হিসেবে আসা ঘুড়ি, পিঠা আর অন্যান্য খাবার বিলি করা হয় পাড়ার লোকদের মধ্যে।

 

বাকরখানি

পুরান ঢাকায় সকালের নাস্তায় বাকরখানি থাকতেই হবে। বিশেষ করে চায়ের সঙ্গে এটা ছাড়া যেন তাদের চলেই না। শুধু সকাল নয়, যে কোনো নাস্তা হোক সেটা বিকাল কিংবা সন্ধ্যা- সেসময়ও টেবিলে শোভা পায় এটা। বর্তমানে পুরান ঢাকা পেরিয়ে নতুন ঢাকায়ও এর চাহিদা বেড়েছে। ছোট-বড় বিভিন্ন আকারের বাকরখানি পাওয়া যায়। স্বাদেও রয়েছে এখন বৈচিত্র্য। পাওয়া যায় চিনি দিয়ে তৈরি, মালাই-মাখন অথবা ঘিয়ের প্রলেপ দেওয়া বাকরখানি।  বাকরখানির আছে এক দীর্ঘ ইতিহাস। জনশ্রুতি থেকে জানা, জমিদার আগা বাকের খাঁ তথা আগা বাকির খাঁর নামানুসারে এ রুটির নাম রাখা হয়েছিল। ঐতিহ্যবাহী এ খাবারকে রক্ষার জন্য এখনো কয়েক প্রজন্ম এর ব্যবসা ধরে রেখেছে। পুরান ঢাকায় হাজারো পরিবার খুঁজে পাওয়া যায় যারা বংশপরম্পরায় বাকরখানি তৈরি ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত।

 

এখনো টিকে আছে টমটম

ঘোড়ার গাড়ি রাজকীয় ঐতিহ্যের অংশ। রূপকথা-উপকথায়ও আছে এই ঘোড়ার গাড়ির কথা। তার চেয়ে বেশি আছে অবশ্য ঘোড়ার গল্প। পঙ্খিরাজ ঘোড়া। রাজপুত্রের টগবগিয়ে চলা তেজি ঘোড়া। ঘোড়ার গাড়ি অনেক জায়গায় ‘টমটম’ নামেও পরিচিত। ঘোড়ার গাড়ির যখন প্রচলন হয় তখন ভারতবর্ষে চলে ইংরেজ শাসন। ঢাকায়ও ঘোড়ার গাড়ি আসে সে সময়ই। ঘোড়ার গাড়ির ঢাকা শহরে চলাচলের সুবিধার্থে রাস্তাঘাটের সংস্কার করা হয়। প্রথমে ইট-সুরকি, সিমেন্ট-বালি পরে পিচঢালা ইট দিয়ে রাস্তা সংস্কারের কাজ করা হয়েছিল। সর্বপ্রথম ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার ইংরেজরা শুরু করলেও স্থানীয় অভিজাত শ্রেণির মানুষও এই সুবিধা নেয়। একসময় তা চলে আসে সাধারণ মানুষের মধ্যে। এ দেশে ঐতিহ্য বেয়ে ১৫০ বছরেরও বেশি সময় পার করেছে রাজকীয় বাহন ঘোড়ার গাড়ি। পুরান ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় ঘোড়ার গাড়ি চলে। এখনো সদরঘাট-গুলিস্তান যাত্রী পরিবহনের জন্য ঘোড়ার গাড়িকে অন্যতম বাহন হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া এই রুট কিছুটা বিস্তৃতি হয়েছে এখন। যাত্রী পরিবহন ছাড়াও টমটম ব্যবহৃত হয় বিয়ে, পূজা, বিভিন্ন দিবসের শোভাযাত্রায়, সিনেমার শুটিংয়ে। এসব কাজে টমটমকে ফুল দিয়ে সুসজ্জিত করা হয়। কোচোয়ান ও হেলপারের জন্যও ওইসব অনুষ্ঠানের সময় রয়েছে বিশেষ পোশাক। বিশেষ করে পুরান ঢাকার বিয়েতে ঘোড়ার গাড়ি একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিয়ে উপলক্ষে ঘোড়ার গাড়িগুলো রঙিন করে সাজানো হয়। ফুলের মালা দিয়ে আর রঙিন কাগজ কেটে নকশা বানিয়ে সাজানো হয় ঘোড়া আর গাড়ি দুটোকেই। অনেকেই পৈতৃকসূত্রে প্রাপ্ত ঘোড়ার গাড়ির গাড়োয়ানি করে জীবিকা নির্বাহ করেন।

 

এখনো টিকে আছে পঞ্চায়েত প্রথা

পঞ্চায়েত। সামাজিক ব্যবস্থার এক অন্যতম ধারক ও বাহকের সমষ্টি। পঞ্চায়েত প্রথা বাংলার ইতিহাসের মতোই প্রাচীন। পঞ্চায়েত বলতে পাঁচ বা ততধিক ব্যক্তি সমন্বয়ে গঠিত পর্ষদকে বোঝায়। কালের পরিক্রমায় এখনো কিছু পঞ্চায়েত বা সেই সব সামাজিক ব্যবস্থা বিদ্যমান। গ্রাম্য পটভূমিতে এখনো পঞ্চায়েতের স্রোতধারা মোটামুটি বহমান। তবে পুরান ঢাকায় কয়েকটি পঞ্চায়েত এখনো টিকে রয়েছে, যেগুলোর বয়স প্রায় ৪/৫ যুগের ওপর। এগুলোর মধ্যে লালবাগ, বংশাল, গেন্ডারিয়া এবং যাত্রাবাড়ী উল্লেখ্যযোগ্য। এ ছাড়া আরও বেশ কয়েকটি পঞ্চায়েত রয়েছে। এসব পঞ্চায়েত সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলেছে। ঈদুল আজহা বা কোরবানি ঈদেও তাদের ব্যতিক্রমী কিছু আয়োজন চোখে পড়ে। সামাজিক কবরস্থান তত্ত্বাবধানেও ভূমিকা রয়েছে অনেক পঞ্চায়েতের। টুকটাক ঝগড়া-বিবাদও সমাধান করা হয় এসব পঞ্চায়েতের মাধ্যমে। এমনই একটি পঞ্চায়েত- দক্ষিণ যাত্রাবাড়ী আদর্শ পঞ্চায়েত। বৃহত্তর যাত্রাবাড়ীতে কয়েকটি পঞ্চায়েত রয়েছে, এর মধ্যে এই আদর্শ পঞ্চায়েত একটি। এ পঞ্চায়েতের সরদারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে,  সূচনালগ্ন থেকেই এ পঞ্চায়েত বিভিন্ন দাতব্য ও সেবামূলক কর্মকা- করে আসছে। সবচেয়ে আলোচিত যে উদ্যোগটি কয়েকযুগ ধরে তারা করে আসছে তা হলো পঞ্চায়েতের মাধ্যমে সবার ঘরে কোরবানির গোস্তের সুষম বন্টন। এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক ও দাতব্য কর্মকা- আয়োজন করে তারা।

 

খেতে আর খাওয়াতে ভালোবাসে

ভোজনরসিকদের কাছে পুরান ঢাকার কদরই আলাদা। হোক সেটা সকালের নাস্তা কিংবা দুপুর গড়িয়ে রাত্রের খাবার। কয়েক শ বছরেও কদর হারিয়ে যায়নি পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী মুখরোচক খাবারগুলোর। পুরান ঢাকাবাসীর খাবার ও তাদের খাদ্যাভ্যাস ঢাকার খাদ্যবিলাসে একটি স্বতন্ত্র ধারা সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে এর সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্বের বহু স্থানে। স্থান পেয়েছে প্রিয় খাবারের তালিকায়। এ এলাকার বাবুর্চিদের অনেক সৃজনশীলতা ছিল। তারা মুঘলদের খাবার রান্নার কৌশল রপ্ত করে নিয়েছিল। তাই দেখা যায়, পুরান ঢাকার শাহি খানাপিনার ধরন আর ঘ্রাণ যে কোনো বাঙালির চিরায়ত খাবারের চেয়ে ভিন্নতা রয়েছে। সেই লোভনীয় আর মুখরোচক ঢাকাই খাবারের ধারার একমাত্র ধারক ও বাহক পুরান ঢাকাবাসী। এরা স্বভাবগতই খেতে আর খাওয়াতে ভালোবাসে। মোগল আমলের এই প্রিয় খাবারগুলো পাওয়া যায় নির্দিষ্ট কিছু স্থানে। তবে বাকরখানির বিস্তার ঘটেছে প্রায় সবখানে। বাকরখানি আর এক এক কাপ দুধের চায়ে। ভাজাপোড়ার  তৈলাক্ত খাবারের আধিক্য রয়েছে চকবাজার, চানখাঁরপুল ও নাজিমুদ্দিন রোডের দিকে। একসময় পুরান ঢাকায় অতিথি আপ্যায়নে বা জামাই এলে শাহি মোরগ-পোলাওকে প্রাধান্য দিত বেশি। আর সকালের নাস্তায় থাকত তেহারি। পাশাপাশি থাকত মোসাল্লাম, রেজালা, ঝাল গরুর মাংস, জালি কাবাব, নিম কালিয়া, শাহি টুকরা, পেস্তাবাদামের শরবত ইত্যাদি। পোলাও বিরানির মধ্যে বুন্দিয়া পোলাও, খাসির বিরানি, সাদা পোলাও দিয়ে ঝাল গরুর মাংস, ডিমের কোরমা, গরুর গ্লাসি, রোস্ট ইত্যাদি পছন্দ অনুযায়ী খাবার থাকত বিরিয়ানির পাশাপাশি। বিখ্যাত হাজী বিরিয়ানির সেই শুরু থেকে এখন পর্যন্ত শুকনা কাঁঠাল পাতার তৈরি ঠোঙায় পরিবেশন করা হয়। তবে এখন কাগজের বক্সেও পরিবেশন করা হয়। ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা পুরনো খাবারের প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- হাজীর বিরিয়ানি, মাখনের পোলাও, ফরিদাবাদের বুদ্দু বিরিয়ানি, নারিন্দার ঝুনু পোলাও, বেচারাম দেউড়ির নান্না বিরিয়ানি, চকবাজারের শাহসাহেবের পোলাও ইত্যাদি। এছ াড়া কাজী আলাউদ্দীন রোড, রায়সাহেব বাজার, সূত্রাপুর, ইসলামপুর, চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় স্ট্রিট ফুডের আধিক্য দেখা যায়। বর্তমানে তৈলাক্ত আমিষ খাবারের ভিড়ে একটুখানি মাথা তুলে ঠাঁই নিয়েছে নিরামিষ খাবার। নিরামিষ খাবারের হোটেল শুরুতে একটি থাকলেও পুরান ঢাকার ইসলামপুর ও তাঁতীবাজারে গড়ে উঠেছে বিষ্ণুপ্রিয়া, আদি গোবিন্দ, জগন্নাথ ভোজনালয়, গোপীনাথ ইত্যাদি। এসব হোটেলে আমিষের কোনো বালাই নেই। এমনকি কারিগররাও নিরামিষভোজী। শুধু পুরান ঢাকাবাসীই নন; নতুন ঢাকার বাসিন্দারাও খেতে আসেন এ হোটেলগুলোয়। এ ছাড়া পুরান ঢাকায় সুস্বাদু কাবাবের আগমন মোগলদের হাত ধরেই। কাবাব আগে থেকে সান্ধ্যকালীন, বিশেষ করে রাতের খাবার হিসেবে পছন্দের। জনপ্রিয় কাবাবের মধ্যে শিক কাবাব, বঁটি কাবাব, কাঠি কাবাব, সুতি কাবাব, রেশমি কাবাব, মুরগির কাবাব, পেষা মাংসের কাবাব, টুন্ডা কাবাব, টিক্কা কাবাব, টেংরি কাবাব, গরুর ছেঁচা মাংসের কাবাবসহ নানা ধরনের মাছের কাবাব ইত্যাদি।

 মোগল আমলে এখানে আসা বিভিন্ন আমির আর শৌখিনদের অনেক মিষ্টি স্থানীয়দের মাঝেও খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। যেগুলো আরব-পারস্য ঘরানার। এর মধ্যে বরফি, শাহি টুকরা, জিলাপি, মোতানজান, ক্ষীর, দরবেশ, দইবড়া ইত্যাদি ছাড়াও হালুয়া ছিল জনপ্রিয়। এখানে রয়েছে নানা জনপ্রিয় ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির ঠিকানা। এর মধ্যে আলাউদ্দীন সুইটমিট, আল রাজ্জাক, মরণচাঁদ, দয়াল ভান্ডার, শাহি দিল্লি, শ্রী লক্ষ্মী এবং সোনামিয়া মিষ্টান্ন ভান্ডার অন্যতম। এ ছাড়া ঐতিহ্যবাহী কিছু বেকারি প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া পুরান ঢাকার বেকারি আইটেমগুলোও একটি স্বতন্ত্র অবস্থান করে নিয়েছে খাদ্য তালিকায়। হোক সেটা পাউরুটি কিংবা বিস্কুট। কয়েকযুগ ধরে বেশ সুনামের সঙ্গে ভোজনরসিকদের চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছে এসব বেকারি। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ইউসুফ কনফেকশনারি, আনন্দ, ক্যাপিটাল, অলিম্পিয়া, ডিসেন্ট এবং বোম্বে কনফেকশনারির মতো কিছু প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে পুরান ঢাকার অলিগলিতে পিঠাওয়ালিদের তৈরি পিঠা আদি ঢাকার মানুষের সকালের নাস্তার অংশ। আদি ঢাকার মানুষের নানা উৎসবে আর সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে আয়োজন করা হয় বাহারি আর শাহি খানার, যাতে পরিবর্তিত হয়ে যাওয়া অতীতের সঙ্গে পুরোপুরি মিল না থাকলেও তাতে স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যায়।

 

বিউটি বোর্ডিং

অনেক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক-বাহক হিসেবে টিকে আছে বিউটি বোর্ডিং। বাংলাবাজারের শ্রীশদাস লেনে এই বোর্ডিং অবস্থিত। এখনকার বিউটি বোর্ডিং বাড়িটি ছিল নিঃসন্তান জমিদার সুধীর চন্দ্র দাসের। দেশভাগের আগে সেখানে ছিল সোনার বাংলা পত্রিকার অফিস। কবি শামসুর রহমানের প্রথম কবিতা মুদ্রিত হয়েছিল এ পত্রিকায়। দেশভাগের সময় পত্রিকা অফিসটি কলকাতায় চলে যায়। এরপর পঞ্চাশের দশকে দুই ভাই প্রদাহ চন্দ্র সাহা ও নলিনী মোহন সাহা এই বাড়ি ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলেন বিউটি বোর্ডিং। ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ বিউটি বোর্ডিংয়ে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে নিহত হন প্রদাহ চন্দ্র সাহাসহ ১৭ জন। সে সময় প্রদাহ চন্দ্রের পরিবার জীবন বাঁচাতে চলে যায় ভারতে। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর ১৯৭২ সালে প্রদাহ চন্দ্রের স্ত্রী শ্রীমতী প্রতিভা সাহা দুই ছেলে সমর সাহা ও তারক সাহাকে নিয়ে বিউটি বোর্ডিং আবার চালু করেন। বিউটি বোর্ডিংয়ের মুখর আড্ডা আগের মতো না থাকলেও খাবার ঘরে এখনো খদ্দেরের ভিড় লেগেই থাকে। নগরের ভোজনরসিকরা এখানে ছুটে আসেন। আর নিয়মিত খান পুরনো ঢাকার বইয়ের মার্কেটের নানা শ্রেণির মানুষ। বিউটি বোর্ডিংয়ের শুরু থেকেই এখানে থাকা-খাওয়ার চমৎকার ব্যবস্থা থাকলেও খাওয়া-দাওয়ার চেয়ে এখানকার আড্ডাটাই আকর্ষণীয় ছিল সবার কাছে। সামান্য কিছু খেয়েই ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দেওয়া যেত। নগরের প্রধান প্রকাশনা পাড়া বাংলাবাজারে ছিল দেশের কবি, কথাসাহিত্যিক, শিল্পী, সাংবাদিক, অভিনেতা, সংগীতশিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের নিয়মিত যাতায়াত। বাংলাবাজারের পাশেই বিউটি বোর্ডিংয়ের অবস্থান হওয়ায় আড্ডা জমে ওঠে এখানে।


আপনার মন্তব্য