ভিয়েতনামের একটি গুহা থেকে ১২ হাজার বছর আগের এক পুরুষের কঙ্কাল উদ্ধার করে নতুন রহস্যে পড়েছেন বিজ্ঞানীরা। ধারণা করা হচ্ছে, বরফ যুগে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ওই ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছিল। তার ঘাড়ে তীক্ষ্ণ মাথার কোনো অস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছিল, যা প্রাণঘাতী ক্ষত তৈরি করে। বিজ্ঞানীরা এখনো খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন ঠিক কোন ধরনের অস্ত্র দিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছিল।
সম্প্রতি উদ্ধার হওয়া কঙ্কালটি আশ্চর্যজনকভাবে ভালো অবস্থায় সংরক্ষিত ছিল। এ কঙ্কাল থেকে ওই অঞ্চলের সবচেয়ে প্রাচীন মানুষের মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ (এমটিডিএনএ) ডিএনএ পাওয়া গেছে।
মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ হলো কোষের মাইটোকন্ড্রিয়ায় থাকা বিশেষ ধরনের জিনগত উপাদান, যা মাতৃপরম্পরায় (মায়ের থেকে সন্তানে) উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হয়। এর মাধ্যমে মানুষের বংশপরম্পরা, পূর্বপুরুষ এবং বিভিন্ন অঞ্চলে অভিবাসনের ইতিহাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা সম্ভব।
ভিয়েতনামের গুহা থেকে উদ্ধার হওয়া পুরুষ কঙ্কালটির বয়স প্রায় ৩৫। কোয়ার্টজ (একধরনের স্ফটিক) দিয়ে তৈরি তীক্ষ্ণ ফলাযুক্ত কোনো অস্ত্র ছুড়ে তাঁর ঘাড়ে আঘাত করা হয়। এ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, ওই সময়ে মানুষ অস্ত্র তৈরি করতে জানতেন।
তবে ওই ব্যক্তি আঘাত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মারা যাননি। তার আঘাতপ্রাপ্ত ঘাড়ের হাড় বিশ্লেষণ করে অতিরিক্ত টিস্যু বৃদ্ধি ও সংক্রমণের চিহ্ন পাওয়া গেছে, সম্ভবত সংক্রমণ থেকেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
গত মঙ্গলবার ‘প্রসিডিংস অব দ্য রয়্যাল সোসাইটি বি: বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেস’ জার্নালে এ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আহত হওয়ার পর ওই ব্যক্তি খুব সম্ভবত কয়েক মাস বেঁচে ছিলেন। মারা যাওয়ার পর তাঁকে ‘থুং বিন ১’ নামের একটি গুহায় সমাহিত করা হয়। বর্তমানে ওই গুহাস্থলের নাম ‘ত্রাং আন ল্যান্ডস্কেপ কমপ্লেক্স’ এবং স্থানটি ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ।
গবেষকেরা বলছেন, ওই ব্যক্তির আঘাতজনিত ক্ষতে পরে কী হয়েছিল, তা এখনো অজানা। তবে এ ঘটনা দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার মূল ভূখণ্ডে শিকারনির্ভর সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষের কারণে হতে পারে।
ওই ব্যক্তির আঘাত পাওয়া ও আহত হওয়ার পরও কিছুদিন বেঁচে থাকার ঘটনা ২৬ লাখ থেকে ১১ হাজার ৭০০ বছর আগে প্লাইস্টোসিন বা পুরাপলীয় যুগের শেষ দিকে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনের একটি বিরল ছবি তুলে ধরেছে।
কেনটাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হুগো রেসেস-সেন্টেনো ই-মেইলে এ বিষয়ে বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শেষ প্লাইস্টোসিন যুগের মানব কঙ্কাল পাওয়া তুলনামূলকভাবে বিরল। হোলোসিন যুগে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহিংসতার অনেক প্রমাণ রয়েছে, বিশেষ করে ওই সময়ে, যখন লোকজন খাদ্য উৎপাদনভিত্তিক অর্থনীতি গ্রহণ করেছে এবং সমাজে শ্রেণিপার্থক্য বেড়ে যায়। তবে প্লাইস্টোসিন যুগে এমন উদাহরণ কম। ধারণা করা হয়, প্লাইস্টোসিন যুগে মানুষ মূলত শিকারের ওপর নির্ভর করে জীবন ধারণ করত।
এই গবেষণা প্লাইস্টোসিন যুগে সহিংসতার বিরল উদাহরণে একটি নতুন সংযোজন বলে মনে করেন তিনি।
‘বিশাল এক চমক’
২০১৭ সালের ডিসেম্বরে গবেষকেরা ওই কঙ্কাল উদ্ধার করেন। তাঁরা সেটির নাম দিয়েছেন ‘টিবিএইচ১’। কঙ্কালের মাথার খুলি ভাঙা এবং চ্যাপ্টা হয়ে গেছে, কিন্তু খুলির বেশির ভাগ অংশই পাওয়া গেছে। এমনকি খুলিতে সব কটি দাঁতও আছে।
সেটির পেলভিস বা কোমরের হাড় ও মেরুদণ্ড ভাঙা। একটি আন্তর্জাতিক দলের সহযোগিতায় ‘টিবিএইচ১’–এর হাড়ের টুকরা টুকরা অংশ উদ্ধার করা হয়, যা চলে ২০১৮ সাল পর্যন্ত।
গবেষক দলটিকে খুবই সতর্কতার সঙ্গে হাড় উদ্ধারের কাজ করতে হয়েছে। কারণ, সেগুলো খুবই ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল, গুহার পরিবেশও উপযুক্ত ছিল না বলে জানান প্রধান গবেষক ক্রিস স্টিম্পসন। তিনি যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের গবেষক।
স্টিম্পসন সিএনএনকে বলেন, এটি উপ-উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চল। তাই এখানে প্রচুর পানি, প্রচুর ক্যালসিয়াম কার্বনেট জমা হয়। ফলে এখানে মাটি বা পলি খুবই আঠালো।
খুলি ও কঙ্কালের হাড়ের আরও ক্ষতি এড়াতে গবেষক দল সেগুলোর চারপাশের পলিমাটি বড় বড় ব্লকের আকারে কেটে গুহা থেকে বের করে এনেছেন এবং পরে কয়েক মাস ধরে গবেষণাগারে সেগুলোকে একত্র করেছেন।
হাড়ে পর্যাপ্ত কোলাজেন না থাকায় কঙ্কালটির বয়স সঠিকভাবে নির্ধারণ করা যায়নি। তবে সমাধির কাছাকাছি কয়লার নমুনার রেডিওকার্বন পরীক্ষা করে কঙ্কালটির বয়স ১২ হাজার থেকে সাড়ে ১২ হাজার বছর বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কঙ্কালটি বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা সেটির এক পায়ের গোড়ালিতে সামান্য আঘাতের চিহ্ন দেখেছেন। তবে ঘাড়ে আঘাত পেয়ে মৃত্যুর আগে ওই ব্যক্তির সার্বিক স্বাস্থ্য ভালো ছিল।
মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ বিশ্লেষণে গবেষক দল নিশ্চিত হয়েছে, ওই ব্যক্তি একজন পুরুষ ছিলেন এবং একটি স্থানীয় শিকারি সম্প্রদায়ের মাতৃপরম্পরার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই শিকারি সম্প্রদায় ওই অঞ্চলে আসা প্রথম মানুষদের বংশধর।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভালোভাবে সংরক্ষিত বরফ যুগের মানবকঙ্কাল পাওয়া খুবই বিরল। তাই প্রায় সম্পূর্ণ এই কঙ্কাল গবেষণাকাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটির মধ্যে ডিএনএ পাওয়া গেছে।
স্টিম্পসন বলেন, ওই ব্যক্তির ঘাড়ের ‘সার্ভিক্যাল রিব’-এ আঘাতজনিত ক্ষতি পাওয়া গেছে। সার্ভিক্যাল রিব মানুষের ঘাড়ে থাকা একটি অতিরিক্ত হাড়। খুব অল্পসংখ্যক মানুষের শরীরে এ হাড় থাকে।
স্টিম্পসন বলেন, ওই ব্যক্তির সার্ভিক্যাল হাড়ে ক্ষত পাওয়াও (গবেষকদের জন্য) একটি বড় চমক।
সেখানে গবেষকদের জন্য আরও একটি চমক অপেক্ষা করছিল। সেটা হলো, আঘাতপ্রাপ্ত ঘাড়ের অতিরিক্ত হাড়ের কাছে একটি অস্বচ্ছ কোয়ার্টজের খণ্ড পাওয়া। কোয়ার্টজের ওই খণ্ডের দৈর্ঘ্য শূন্য দশমিক ৭ ইঞ্চি এবং ওজন প্রায় শূন্য দশমিক শূন্য ১৪ আউন্স (শূন্য দশমিক ৪ গ্রাম)।
ওই যুগে পাথরের অস্ত্রে সাধারণত যে ধরনের খোদাই–চিহ্ন দেখা যেত, (কোয়ার্টজের) ওই টুকরা তেমনভাবে খোদাই করা। গুহায় কোয়ার্টজের তৈরি অন্য কোনো যন্ত্র ছিল না। তাই গবেষণায় ধরে নেওয়া হচ্ছে, ছুড়ে মারা অস্ত্রের ডগাটি সম্ভবত অন্য কোনো জায়গা থেকে আসা অচেনা বা বিশেষ প্রযুক্তি।
রেসেস-সেন্টেনো বলেন, যে অস্ত্রের আঘাতে ওই ক্ষত হয়েছে, সেটি সেখানে পাওয়া অন্যান্য অস্ত্র থেকে আলাদা। তাই এই গবেষণা ওই সময়ে ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে সংঘাত হওয়ার সম্ভাবনাকে জোরালো করে তুলেছে।
তবে ঠিক কোন পরিস্থিতিতে ওই ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে, তা পুরোপুরি বোঝার জন্য গুহা প্রাঙ্গণ এবং ওই অঞ্চলে আরও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা দরকার বলে মনে করেন সেন্টেনো।
কোয়ার্টজের খণ্ডটির আকার দেখে গবেষকেরা ধারণা করছেন, এটি এমন একটি অস্ত্রের শীর্ষপ্রান্ত, যেটি ওই ব্যক্তির ঘাড়ের ডান পাশে বিদ্ধ হয়ে তাঁর ‘সার্ভিক্যাল রিব’ ভেঙে ফেলে। ওই আঘাত থেকেই শেষ পর্যন্ত তাঁর শরীরে প্রাণঘাতী সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে এবং তিনি মারা যান।
গবেষণাপত্রে বলা হয়, আঘাতের অবস্থা, আকার ও ধরন দেখে বোঝা যায়, ছুড়ে মারা অস্ত্রটি ছোট, কিন্তু দ্রুতগতির ছিল। যদি সেটি বড় কিছু হতো, তাহলে আঘাত আরও ভয়াবহ হতো এবং সম্ভবত সে ক্ষেত্রে মৃত্যু সঙ্গে সঙ্গেই হতো।
আবার এমনও হতে পারে, স্থানীয় নন, বরং বাইরে থেকে আসা কোনো ব্যক্তির সঙ্গে সহিংস সংঘাতের ফলে ওই ব্যক্তি ঘাড়ে আঘাত পেয়েছেন। ওই ব্যক্তি ঠিক কোন পরিস্থিতিতে আহত হয়েছিলেন এবং তাঁর জীবনের শেষ কয়েক সপ্তাহ কেমন কেটেছিল, তা বিজ্ঞানীরা এখন কেবল অনুমান করতে পারেন।
সূত্র: সিএনএন
বিডি প্রতিদিন/নাজিম