শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ২৩:০৮

ফুটবল বাঁচানোর আকুতি

ক্রীড়া প্রতিবেদক

ফুটবল বাঁচানোর আকুতি

প্রতাপ শংকর হাজরা, আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু, আবদুল গাফফার, শফিকুল ইসলাম মানিক, কাজী জসিম উদ্দিন জোসি ও সাইফুল বারী টিটু। বাংলাদেশের ফুটবলে জনপ্রিয় নাম। তারা যখন জাতীয় দল বা বিভিন্ন ক্লাবের জার্সি পরে মাঠে নামতেন তখন গ্যালারিতে উপচেপড়া দর্শকের সমাগম হতো। ফুটবল ইতিহাসে সোনালি দিনের সাক্ষী তারা। ৭০, ৮০ বা ৯০ দশকে ফুটবলের মান আকাশ ছোঁয়া না হলেও জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। মোহামেডান আবাহনীর ম্যাচ হলে শুধু ঢাকা নয়, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত ক্রীড়ামোদীরা উত্তেজনায় কাঁপতেন।

ফুটবলে সেই উত্তেজনা ও উন্মাদনা কোথায় যেন হারিয়ে গেল। জনপ্রিয়তার এতটা ধস্ নেমেছে যে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে বড় ম্যাচেও দর্শক যেন হাতে গোনা যায়। কেউ কেউ আবার বলেন, গ্যালারিতে দর্শকের চেয়ে কাকের সংখ্যা বেশি। জনপ্রিয় ফুটবলের একি অধঃপতন। এর পেছনে রহস্যটা কি?

কারও কারও কথা, ক্রিকেটের দিকে বেশি মনোযোগী হওয়ায় ফুটবলে এমন করুণ পরিণতি। কথাটা কতটা যৌক্তিক, এখানে ক্রিকেটকে দোষ দেওয়া হবে কেন? এক সময়তো ক্রিকেটের কোনো পাত্তাই ছিল না। জাতীয় দল হার ছাড়া দেশকে কিছুই দিতে পারত না। ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ক্রিকেটকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। বিশ্বকাপ বা এশিয়া কাপে চ্যাম্পিয়ন না হলেও বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের কদর আজ বিশ্বজুড়ে।

মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুশফিক, রিয়াদ, মুস্তাফিজ বা মিরাজকে চেনে গোটা পৃথিবীই। আর এখন জাতীয় দলের ফুটবলারদের চিনতে হয় জার্সি নম্বর দেখে। ফুটবলের এমন দৈন্যদশা হবে তা কি কেউ ভেবেছিলেন। মানতো অনেক আগেই নিচে নেমে গেছে। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে সেমিফাইনাল খেলাটা স্বপ্নে পরিণত হয়েছে। এক পেশাদার লিগ ছাড়া বাফুফে তেমন কোনো শিডিউল নেই। গ্রাম-গঞ্জে চোখ পড়লেই শুধু ক্রিকেট আর ক্রিকেট। ছেলেরা ফুটবল খেলতে ভুলে গেছে তা কী ভাবা যায়?

 শনিবার সন্ধ্যায় ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশেন সিটি বসুন্ধরায় পুষ্পগুচ্ছ হলে যেন তারকা ফুটবলাদের মিলন মেলা বসেছিল। বাংলাদেশ প্রতিদিন রয়েল টাইগার বিশ্বকাপ ফুটবল কুইজের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে এসেছিলেন দেশ কাঁপানো ফুটবলার প্রতাপ, চুন্নু, গাফফার, মানিক, টিটু ও জোসি। এসেছিলেন জাতীয় দলের বর্তমান গোলরক্ষক আশরাফুল ইসলাম রানাও। অনুষ্ঠানে বাড়তি আকর্ষণ ছিল শেখ রাসেলের চার বিদেশি ফুটবলার আলেক্স রাফায়েল, আলিশার আজিজভ, অ্যালিসন আর রাফায়েল উদোরার উপস্থিতি। জমকালো অনুষ্ঠান। তারকাদের রঙিন সন্ধ্যা। চারিদিকেই শুধু উৎসবের আমেজ। স্বপ্নের তারকাদের কাছে পেয়ে পুরস্কার বিজয়ীরা আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। তাদের সঙ্গে ছবি তোলারও হিড়িক পড়ে যায়। এই আনন্দঘন পরিবেশেও বেজেছিল বেদনার সুর। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দিতে এসে সাবেক তারকাদের একই আকুতি প্লিজ আপনারা ফুটবলকে বাঁচান। বাংলাদেশ প্রতিদিন ফুটবল নিয়ে বরাবরই তৎপর। তাই তাদের বক্তব্য ছিল বেশ জোরালো।

ফুটবলে নতুন দলের আগমন ঘটছে। বিশেষ করে বসুন্ধরা গ্রুপের নামটি বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হবে। দেশের জনপ্রিয় তিন দল বসুন্ধরা কিংস, শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র, শেখ জামাল ধানমন্ডি। তিন ক্লাবই বসুন্ধরা গ্রুপের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হচ্ছে। ফুটবলের প্রতি ভালোবাসার টানে গ্রুপটি এগিয়ে এসেছে। এর চেয়ে বড় সু-সংবাদ আর কি হতে পারে। বসুন্ধরা গ্রুপ চেষ্টা চালাচ্ছে ফুটবলে উন্নয়ন বা হারানো জনপ্রিয়তা ফিরিয়ে আনতে। ফুটবলের অভিভাবক বাফুফে কি করছে সেটাই এখন বড় প্রশ্ন বা বিতর্ক। ১১ বছর ধরে তো প্রায় একই লোক কমিটির দায়িত্বে আছেন। বিশেষ করে ফুটবলের সুপারস্টার কাজী সালাউদ্দিন সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর অনেকের আশা ছিল ঘুমন্ত ফুটবল জেগে উঠবে। তাতো হয়নি তিনি দায়িত্ব থাকা অবস্থায় দেশের ফুটবল চলে গেছে প্রায় লাইফসার্পোটে। চারিদিকে শুধুই হতাশা। ফুটবলের মান আগেও কখনো আহামরি ছিল না। কিন্তু এমন অধঃপতন বা দুর্দশা কখনো হয়নি। যে সালাউদ্দিনকে দেশের ফুটবলে নখত্র বলা হয়- কি লজ্জা, সেই সালাউদ্দিন সভাপতি দায়িত্ব থাকা অবস্থায় দুর্নীতির অভিযোগ এনে নোটিস পাঠিয়েছে দুর্নীতি দমন  কমিশন (দুদক)। ফুটবলে অর্থ আত্মসাৎ। তাও আবার কিংবদন্তি সালাউদ্দিনের আমলেÑ তা কি ভাবা যায়।

সেই আক্ষেপটা অনুষ্ঠানে তুলে ধরলেন পাঁচ দশকের তারকারা। প্রতাপ শংকর হাজরা ৬০ থেকে ৭০ দশক পর্যন্ত মোহামেডানের জার্সি চরিয়ে মাঠ কাঁপিয়েছেন। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সহ-অধিনায়ক ছিলেন তিনি। প্রতাপের কথা ‘মান নিয়ে কিছু বলার নেই। তবে ফুটবলে এখন যা ঘটছে তাতে বাইরে মুখ দেখাতে পারছি না। সত্যিই দেশের ফুটবল আজ মৃত্যুর মুখে। এই জনপ্রিয় খেলা ধ্বংস মানেই ক্রীড়াঙ্গন অচল হয়ে পড়বে। ফুটবলে কি ঘটেছে বা ঘটছে তার সঠিক তথ্য বের কার দায়িত্ব মিডিয়ার। আমার বিশ্বাস দেশের সেরা পত্রিকা বাংলাদেশ প্রতিদিন তা করবে।’ আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নুর নৈপুণ্য এখনো চোখে ভাসে। ক্যারিয়ারে অধিকাংশ সময়টা তার কেটেছে আবাহনীতে। বর্তমানে তিনি শেখ জামাল ফুটবল কমিটির চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ‘দুদক কাকে নোটিস পাঠিয়েছে তা আমার কাছে মুখ্য বিষয় নয়। তবে ঘটনাটা পত্রিকায় দেখে আমি লজ্জিত। ফুটবলার হিসেবে গর্ববোধ করতাম এখন নিজেকে ফুটবলার পরিচয় দিতে লজ্জা পাচ্ছি। কোনো ব্যক্তি বা কারো ওপর আমার আক্ষেপ নেই। আমার কথা একটাই ফুটবলকে বাঁচাতে হবে। এমন জনপ্রিয় খেলা ধ্বংস হয়ে যাবে তা কারও কাম্য নয়। ফুটবলের জনপ্রিয়তা  যে এখনো আছে তার বড় প্রমাণ বাংলাদেশ প্রতিদিন। কুইজ পুরস্কারের জমকালো অনুষ্ঠানই বলে দেয় ফুটবল কতটা জনপ্রিয়। তাহলে এত হাহাকার কেন? এর জন্য দায়ী কে তা সবাইকে জানানোর সময় এসেছে।’

আবদুল গাফফার এমনি এক ফুটবলার। যিনি মোহামেডান ও আবাহনীর হয়ে বড় দুই দলের মাঠ কাঁপিয়েছেন। সেই গাফফার বর্তমান ফুটবলের কথা বলতে গিয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করতে চাই না সালাউদ্দিন ভাই দায়িত্ব থাকা অবস্থায় বাফুফে অর্থ আত্মসাৎ করবে। তবে সালাউদ্দিন ভাইকে প্রমাণ করতে হবে তিনি স্বচ্ছ। অর্থ লোপাট নিয়ে অনেক কথা উঠেছে। এখন জবাব দিতে হবে ফান্ডগুলো কখন এবং কিভাবে ব্যয় হয়েছে। কী বাজে অবস্থা বলেন, ফুটবল কি মরেই যাবে। এই জনপ্রিয় খেলা ব্যক্তি বিশেষের জন্য ধ্বংস হয়ে যাবে। এখানে মিডিয়ার দায়িত্ব অনেক। বিশেষ করে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে এগিয়ে আসার অনুরোধ রাখছি।’

শফিকুল ইসলাম মানিক। ব্রাদার্স ইউনিয়নকে নেতৃত্ব দিলেও তারকারখ্যাতি পেয়েছেন মোহামেডানে খেলেই। কোচ হিসেবেও সফল তিনি। মানিক বেশ ক্ষুব্ধ ভাষায় বললেন, ‘দুদকের নোটিস আর কাউকে লজ্জা দিয়েছে কিনা জানি না। আমি পাচ্ছি, কারণ বাইরে গেলে শুনতে হয় ও ফুটবলাররাও তাহলে দুর্নীতি করে। কার কি হবে জানি না। ফুটবলকে বাঁচাতে হবে এটাই বড় সত্য।’ সাইফুল বারী টিটু ও কাজী জসিম উদ্দিন জোসি খুব একটা কথা বলেননি তবে তাদেরও আকুতি এক। ফুটবলকে বাঁচাতে হবে। ফিরিয়ে আনতে হবে হারানো গৌরব।


আপনার মন্তব্য