শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ২২:৩১

বিশ্ব আর্থনীতির করুণ হাল

মেজর নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ (অব.) পিএইচডি

বিশ্ব আর্থনীতির করুণ হাল

ভাঙনের শব্দ শুনি

এশিয়ার জনপ্রিয় পত্রিকা ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’ (ঝঈগচ) গত বছর বিখ্যাত অর্থনীতিবিষয়ক লেখক ও গবেষক টম হল্যান্ডের লেখা একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করে। ২৫ বছরের লেখালেখি এবং জগৎসেরা পত্রিকা ও প্রকাশনা সংস্থায় কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে তার আশঙ্কা ছিল- পৃথিবী ২০১৯-২০ সালে একটি বড় অর্থনৈতিক মন্দায় পড়তে যাচ্ছে। ১৯৭০ সাল থেকে প্রত্যক্ষ করা অর্থনৈতিক মন্দার প্রতি লক্ষ্য করে তিনি প্রতি পাঁচ থেকে সাত বছরের বিরতিতে পৃথিবী যে নিশ্চিত একটা অর্থনৈতিক মন্দার মুখোমুখি হয় সে যুক্তি তুলে ধরেন। চলমান শতাব্দীর সাম্প্রতিক উদাহরণ টানতে গিয়ে উঠে আসে ২০০০ সালের কুখ্যাত ‘ডটকম বাবল’ ও ‘ডটকম ক্রাস’-এর কথা। অনলাইন শেয়ার মার্কেট এবং অনলাইন বেচাকেনা করতে গিয়ে ২০০২ সালের ১১ মার্চ থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত সময়টায় ঝড় বয়ে যায় আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে। এ সময় অপরিশোধিত তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি প্রায় ২৯ ডলারে নেমে আসে। ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালে মার্কিন অর্থনীতি তথা বিশ্ব অর্থনীতি আবাসন ব্যবসাসহ অন্যান্য ব্যবসা নিয়ে এক সংকটময় সময় অতিক্রম করে। এ সময় অপরিশোধিত তেলের মূল্য দাঁড়ায় ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৫৫ ডলারে। এ ক্রান্তিকালকেই অর্থনীতিবিদরা আখ্যা দিয়েছেন ‘মহামন্দা’ (এৎবধঃ জবপবংংরড়হ) নামে। ২০১৬ সালের শুরুতে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য ছিল ব্যারেলপ্রতি ৪০ ডলারের কম, অন্যদিকে বছরের শুরুতেই চায়না ও অন্যান্য দেশে পুঁজিবাজারে ধস, ব্রিটেনে ব্রেক্সিট বিতর্ক, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণ এবং ছয়টি বিশ্বশক্তির সঙ্গে পরমাণু শক্তি ব্যবহার প্রশ্নে ইরানের সমঝোতা ও অবরোধ প্রত্যাহার বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দেয়। তাই পাঁচ থেকে সাত বছরের বিরতিতে ঘটে যাওয়া অর্থনৈতিক মন্দা ও সংকটের অভিজ্ঞতার আলোকে টম হল্যান্ড মনে করেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি মন্দা ঘটা নিশ্চিত বা ‘ওভার ডিউ’ (ঙাবৎ উঁব) হয়ে আছে, যা ২০২০ সালে যে কোনো সময় ঘটতে পারে। বিবিসি।

৪ জানুয়ারি, ২০২০ তারিখে ‘দি গার্ডিয়ান’ পত্রিকার একটি খবরের শিরোনামের বাংলা অর্থ ‘ঋণ বিশ্ব অর্থনীতিকে হত্যা করবে। কিন্তু মনে হয় কেউ এটাকে পাত্তা দিচ্ছে না।’ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে গার্ডিয়ানের মন্তব্য, উন্নত দেশ আমেরিকা, চায়না, জাপান, জার্মানি, ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেনের অন্তত ৪০ শতাংশ বড় কোম্পানির ঋণের বোঝা এত বড় হবে যে, প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে সেবা দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে। বিশ্বব্যাংকও এ বিষয়ে একমত। ৮ জানুয়ারি, ২০২০ তারিখে বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত রিপোর্টে চলতি বছরে সার্বিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি অত্যন্ত দুর্বল হবে বলে আশঙ্কা করা হয়। বিশ্বব্যাংকের মতে, সরকারি ও বেসরকারি খাতে ঋণের পরিমাণ জিডিপির তুলনায় ১৭০ শতাংশ বেশি হতে যাচ্ছে, যা ৫০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল জিডিপির ৪৭ শতাংশ। জাপান, আমেরিকা, ব্রিটেন ও ইউরোপের সরকার নিজেরাই বড় আকারের ঋণ নিয়ে দেশ চালাচ্ছে। (সূত্র সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট : তারিখ ৩০ জানুয়ারি, ২০১৯)। এ ছাড়া বিশ্বের বেশকিছু সংবাদ সংস্থা, জরিপ প্রতিষ্ঠান ও গবেষণা কেন্দ্র বেশ কিছুদিন ধরে দেশে দেশে অর্থনীতি ভাঙনের ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছে।২০২০ সালের শুরুতে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম এ বছরের জন্য বৈশ্বিক ঝুঁকি রিপোর্ট, ২০২০ প্রকাশ করে। এ রিপোর্টে পরিবেশ, সমাজব্যবস্থা, ভূ-রাজনীতি ও প্রযুক্তিগত ঝুঁকির পাশাপাশি স্থান পায় অর্থনৈতিক ঝুঁকির বাস্তব চিত্র। সংস্থাটির মতে, ২০২০ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সম্পদের স্বল্পকালীন মূল্যবৃদ্ধি বা বুদবুদ, অবকাঠামোগত ব্যর্থতা, মুদ্রা সংকোচন, জ্বালানির মূল্য নিয়ে ঝাঁকুনি, অর্থনৈতিক ব্যর্থতা, অর্থ সংকট, অবৈধ বাণিজ্য, বেকারত্ব এবং নিয়ন্ত্রণহীন মুদ্রাস্ফীতির মতো জটিল সমস্যার মুখোমুখি হবে। অন্যদিকে অনলাইন পোর্টাল কোয়ার্টজ বলছে, রাজনীতিই হতে পারে ২০২০ সালের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংকট, ‘করোনা’ তথা ছোঁয়াছে রোগের যে বিস্তার চীনে ঘটেছে, তেমন কিছু ঘটার ইঙ্গিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম আগেই দিয়েছিল। অর্থনীতিবিষয়ক প্রকাশনা, ‘আইডিএন ফিন্যানশিয়ালস’ ২ জানুয়ারি, ২০২০ তারিখে এ বছরের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস প্রকাশ করে। সঠিক ও বাস্তব অর্থনৈতিক পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ নরিয়েল রৌবিনি এবং তাঁর সঙ্গী ব্রুনেলো রোসাকে উদ্ধৃত করে ২০২০ সালে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক মন্দার একটি চিত্র তুলে ধরে এ প্রকাশনা। তাদের মতে, বিভিন্ন কারণ থাকলেও মূলত আমেরিকা ও চায়নার বাণিজ্যযুদ্ধ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্য নিয়ে বিরোধ এবং ইরান ও আমেরিকা দ্বন্দ্বের কারণে আমেরিকা তথা সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতিতে মন্দাভাব বিরাজ করতে পারে ২০২০ সালে। এ আশঙ্কার কথা আজ নতুন করে আলোচনায় এসেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক মন্দা শুরুর কিংবা মন্দার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছার কারণে। আর এ আলোচনাকে তুঙ্গে নিয়ে গেছে বিশ্বের প্রভাবশালী এইচএসবিসি ব্যাংকের ৩৫ হাজার কর্মী ছাঁটাই করার ঘোষণা।

 

শঙ্কা জেগেছে জাপানে

বলা হয়, সুয্যিমামা সবার আগে পুবের দেশ জাপানে জেগে ওঠে। অথচ আজ জাপানে অর্থনৈতিক শঙ্কা জেগেছে। বিশ্ব অর্থনীতির আকার বিবেচনায় জাপানের অবস্থান হলো তৃতীয়। বিগত জানুয়ারির শেষ ভাগে জাপানের অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক কুউওয়াবারা মিনোজর লেখা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে জাপানের নিপ্পন কম পোর্টাল। তাঁর গবেষণায় দেখা যায়, জাপানে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ব্যাংকের শাখা সংখ্যা ২০ শতাংশ এবং কর্মী সংখ্যা ৪০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এ ছাড়া অভিজ্ঞদের বাদ দিয়ে কম বেতনে সাধারণ কর্মী নিয়োগের সংখ্যা বেড়েছে দ্রুততার সঙ্গে। জাপানের তিনটি বড় কোম্পানির মধ্যে মিজোহো ফিন্যানশিয়াল গ্রুপ ১৯ হাজার, মিটসুবিশি ইউএফজে ফিন্যানশিয়াল গ্রুপ সাড়ে ৯ হাজার এবং সুমিতোমো মিটুসুই ফিন্যানশিয়ার গ্রুপ ৪ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্য অর্থনীতিবিদের মতে, সম্পদের সাময়িক মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া, স্মরণকালের মধ্যে ব্যাংক সুদের সর্বনিম্ন হার, পুঁজিবাজার ও আবাসন খাতে স্থিতিশীলতার অভাব জাপানের অর্থনীতিকে সংকটের মধ্যে ফেলেছে। বিগত ১০ বছরে জাপানের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদন থমকে আছে এবং জাপান সরকার মুদ্রা সংকোচন নীতি অনুসরণ করে চলেছে। ‘ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট সোসাইটি জেনালেম’ নামের পোর্টালে ২০১৯ সালে জাপানের অর্থনীতি মাত্র দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধির তথ্য এবং ২০২০ ও ২০২১ সালে তা দশমিক ৫-এ নেমে আসার ইঙ্গিত রয়েছে। আইএমএফের তথ্যমতে, সরকারি তহবিল থেকে জাপান সরকারের ঋণ ২০১৯ সালে ছিল জিডিপির প্রায় ২৩৮ শতাংশ বেশি, যা পরবর্তী দুই বছরেও বিরাজ করবে। ২০১৯-এর অক্টোবরে জাপানের ভ্যাট ৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করেও সুবিধায় নেই সরকার। বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে পেনশন ও চিকিৎসা খাতে বেড়েই চলেছে সরকারের ব্যয়। বিপরীতে জন্মহার কমে যাওয়া দুশ্চিন্তায় ফেলেছে দেশটির নীতিনির্ধারকদের। জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে দিনরাত ছুটে চলেছেন জাপানের স্বামী-স্ত্রীরা। সন্তান নেওয়ার সময়ও যেন নেই তাদের হাতে।

ফ্রান্সভিত্তিক বহুমাত্রিক অর্থবিষয়ক প্রতিষ্ঠান কোফেইস। মূলত রপ্তানি খাতে প্রদত্ত ঋণের বিমা করা এ প্রতিষ্ঠান বছরজুড়ে গবেষণা করে বিভিন্ন বিষয় এবং বিভিন্ন দেশের ওপর। ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটি ১৯৯২ সালে নতুন উদ্যমে বিশ্বব্যাপী তাদের কার্যক্রম বৃদ্ধি করে। বর্তমানে বিশ্বের ৬৬ দেশে তাদের প্রায় ৪ হাজার ৩০০ কর্মী কাজ করছেন। এর মধ্যে প্রায় ২০০ গবেষক রয়েছেন গবেষণাকাজে, যা বিশ্বের শতাধিক দেশ সাদরে গ্রহণ করছে। কোফেইসের তথ্যমতে, জাপানের জিডিপি ২০১৭ সালে ছিল ১ দশমিক ৯ শতাংশ, ২০১৮ ও ২০১৯-এ তা অর্ধেকের চেয়েও কমে দশমিক ৮-এ নেমে আসে। আর ২০২০-এ জিডিপি আরও কমে মাত্র দশমিক ৩-এ দাঁড়াবে বলে আশঙ্কা কোফেইসের। আরও আশঙ্কা রয়েছে জাপানি মুদ্রা ইয়েনের দরপতনের। ফলে ঝুঁকিতে পড়বে গাড়ি, নির্মাণযন্ত্র, ফাইবার, ইলেকট্রনিক ও রাসায়নিক রপ্তানির বাণিজ্য। জাপানের কার ও বস্ত্রের ৭ শতাংশ রপ্তানি হয় দক্ষিণ কোরিয়ায়, রাজনৈতিক ও সামরিক দ্বন্দ্বের কারণে দক্ষিণ কোরিয়া ‘বয়কট জাপান’ নীতি অবলম্বন করলে বিপদ আরও বাড়বে।

 

আমেরিকান অর্থনীতিতে আঘাত

আন্তর্জাতিক মুদ্রা সংস্থা (আইএমএফ) ২০১৯ সালের অক্টোবরে ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ বা বিশ্ব অর্থনীতির একটি চিত্র প্রকাশ করে। সংস্থাটির মতে, বর্তমান বিশ্বে সাধারণ জিডিপির ভিত্তিতে সর্ববৃহৎ অর্থনীতির দেশ আমেরিকা, যার জিডিপির আকার প্রায় ২১.৪৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ ক্ষেত্রে আমেরিকার পরবর্তী দুটি দেশ চায়নার জিডিপি ১৪.১৪ ট্রিলিয়ন এবং জাপানের জিডিপি ৫.১৫ ট্রিলিয়ন। অর্থাৎ আমেরিকার জিডিপির আকার পরবর্তী দুটি দেশ চায়না ও জাপানের চেয়েও বড়। তবে নানা কারণে স্বস্তিতে নেই আমেরিকার অর্থনীতিবিষয়ক নীতিনির্ধারকরা। আমেরিকার অর্থনীতিবিষয়ক ম্যাগাজিন ‘ফোর্বস’ ২০১৯ সালের গোড়াতেই পুঁজিবাজারের আচরণের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের দাবিকৃত অর্থনৈতিক উন্নতির সামঞ্জস্য খুঁজে পায়নি। বছর শেষে সেই কথা আবারও স্মরণে আসে এ মাসের গোড়ায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আসন্ন ২০২১ সালের বাজেট প্রস্তাব প্রকাশের পর। অর্থনীতিবিদ মাইকেল লিনডেন এ প্রস্তাব অনুসরণ করলে মার্কিন অর্থনীতি দুর্বল এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি ঘোলাটে বা দুর্যোগপূর্ণ হবে বলে আশঙ্কা করেন। তার মতে, আমেরিকার অর্থনীতি ইতোমধ্যে ধীরগতিতে এগোচ্ছে। ট্রাম্প তাঁর পরিকল্পনামতো সরকারি চাকরিতে ব্যাপক ছাঁটাই, সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবায় ব্যাপক ব্যয় হ্রাস করলে তা হিতে বিপরীত হবে। এর ফলে শিক্ষা, গবেষণা, উৎপাদন ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা হ্রাস এবং শ্রেণিবৈষম্য ও পুষ্টি ঘাটতি বৃদ্ধি করবে। এরই মধ্যে সিএনএস (বিজনেস)-এর ২৭ জানুয়ারি, ২০২০-এ প্রকাশিত তথ্যে উঠে এসেছে বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং বেতন-ভাতা কমে যাওয়ার তথ্য। যোগাযোগ ও পরিবহন খাতে নিয়োগ ব্যাপকহারে কমেছে। পরপর দুই মাস কারখানার উৎপাদন ছিল নিম্নগামী এবং তিন বছরের মধ্যে সেবা খাতের অগ্রযাত্রা ঘটেছে সবচেয়ে কম। ক্যালিফোর্নিয়া প্যাসিফিক এয়ারলাইনস, এনকম্পাস এভিয়েশন ভায়া এয়ারের মতো বিমান কোম্পানিগুলো বন্ধ হয়েছে ২০১৯ সালে। এর  আগে ২০১৮ সালে বন্ধ হয়েছে ১১টি এয়ারলাইনস, অন্যদিকে ২০১৯ সালে বিলুপ্ত বা অঙ্গীভূত হয়েছে ৪টি ব্যাংক এবং দেউলিয়া হয়ে বন্ধ হয়েছে বিভিন্ন খাতের ২৯টি বড় কোম্পানি। চীন-আমেরিকা বাণিজ্যযুদ্ধের কথা বিবেচনা করে আমেরিকার বিনিয়োগকারী ও শিল্পপতিরা নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বরাবরই পিছিয়ে আছেন। অন্যদিকে ব্রেক্সিটকে কেন্দ্র করে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অর্থনীতি কোন দিকে বাঁক নেয়, তাও ভাবিয়ে তুলেছে শক্তিধর আমেরিকাকে। এর মধ্যে ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব দি ট্রেজারি এক প্রতিবেদনে আবাসন খাতের বাজার বিরাজমান মন্দাভাব কাটিয়ে উঠতে পারেনি বলে স্বীকার করেছে।

 

ভারসাম্য হারানো ভারত

ভারতের জিডিপির আকার ২.৯৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশটিকে অর্থনৈতিক বিবেচনায় পঞ্চম শক্তিধর দেশের স্বীকৃতি দিয়েছে। (সূত্র : আইএমএফ)। আর ক্রয়ক্ষমতার তুলনায় ১১.৩৩ ট্রিলিয়ন ডলার জিডিপি নিয়ে ভারতের অবস্থান তৃতীয়। অথচ সার্বিক বিবেচনায় ভালো নেই ভারতের অর্থনীতি। ইনভেস্টোপিডিয়ামতে, ভারতের কৃষি থেকে অর্থনীতিতে অবদান ১৭ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থনীতি বিশ্লেষক অনির্বাণ নাগের একটি বিশ্লেষণ ১৪ জানুয়ারি, ২০২০ তারিখে প্রকাশ করেছে ভারতীয় পত্রিকা দি ইকোনমিক টাইমস। তাঁর মতে, মাত্র দুই বছর আগে প্রধানমন্ত্রী সার্বিক অর্থনৈতিক সূচক ৮ শতাংশ হারে বৃদ্ধির বিষয়ে উচ্ছ্বসিত থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতি বলছে গত এক যুগের মধ্যে বর্তমান সময়ে ভারতের অর্থনীতি সবচেয়ে ধীরগতিতে এগোচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি মাত্রায় মূল্যস্ফীতি এবং উচ্চমাত্রার খাদ্যমূল্য ভারতের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। ২০১৬ সালে বড় অঙ্কের নোট বাজেয়াপ্ত করা, ২০১৭ সালে দ্রব্য এবং সেবা খাতের রাজস্ব কর এক করে ফেলা এবং এর পরপরই ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া ভারতের অর্থনীতিতে সংকট তৈরি করেছে। অর্থনীতিবিষয়ক অনলাইন পোর্টাল ‘ক্রাঞ্চ বেইজ’ সাম্প্রতিক সময়ে ৪৫৪ জন উদ্যোক্তার ১ হাজার ৮৫টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার তথ্য দিয়েছে, যার শীর্ষে রয়েছে করপোরেট ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অর্থ লগ্নি করা প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি সেবা সংস্থা, বিনোদনমাধ্যম, ফ্যাশন ব্র্যান্ড, ব্যাংক প্রভৃতি খাতে ব্যাপক ধাক্কা লাগার প্রমাণ পাওয়া যায় বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানের তালিকা দেখে। বিগত পাঁচ বছরে ভারতে কেবল ২৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ৩ হাজার ৪০০ শাখা বন্ধ করা হয়েছে বলে স্বীকার করেছে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া। (সূত্র : নিউজ ১৮ ডটকম : তারিখ ৩ নভেম্বর, ২০১৯)। সূত্র আরও বলছেন, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার সঙ্গে অঙ্গীভূত করা হয়েছে ভারতীয় মহিলা ব্যাংক, স্টেট ব্যাংক অব বিকানীর অ্যান্ড জয়পুর, স্টেট ব্যাংক অব হায়দরাবাদ, স্টেট ব্যাংক অব মহীশুর, স্টেট ব্যাংক অব পাতিয়ালা এবং স্টেট ব্যাংক অব ট্রাভানকোর। এ ছাড়া ব্যাংক অব বারোদার সঙ্গে অঙ্গীভূত হয়েছে বিজয়া ব্যাংক এবং ডিনা ব্যাংক। গত বছর অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিত ব্যানার্জির মতে, ‘আমরা (ভারত) প্রকৃতপক্ষে এমন এক সীমার অতি কাছে রয়েছি যে, যে কোনো সময় আমরা বড় ধরনের অর্থনৈতিক মন্দায় পড়ে যেতে পারি।’ (সূত্র : দি ইকোনমিক টাইম : তারিখ ১৪ জানুয়ারি, ২০২০)। একই সূত্রের দাবি, পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন বিভিন্ন কোম্পানির ২০ বিলিয়ন ডলার কর মওকুফ করেও তেমন সুফল আনতে পারেননি। অতিসম্প্রতি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভারত সফরের সময় শত কোটি রুপি ব্যয় হয়। তাঁকে সোনা ও রূপার গ্লাস প্লেটে খাবার পরিবেশন করা হয়। বস্তি এলাকার বাইরে কৃত্রিম প্রাচীর বা আবরণ দিয়ে তা সফরকারীদের চোখের আড়াল করা হয়। অথচ বায়ুদূষণে অতিষ্ঠ দিল্লিবাসীর আর্তনাদ আর ঋণগ্রস্ত পাঞ্জাবের কৃষকদের আত্মহত্যার ঘটনা পাশাপাশি দাঁড় করালেই প্রমাণ হয়- ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে ভারতের অর্থনীতি।

 

চোরাবালিতে চায়না

ব্যবসা-বাণিজ্য, উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বহু দেশই আজ চায়নার ওপর নির্ভরশীল। অর্থনীতির আকার বিবেচনায় আমেরিকার পরই রয়েছে চায়না। সারা বিশ্বের ১৭৩টি দেশের অর্থনীতির মোট আকার ২১ শতাংশ, আর চায়নার একক আকার বা অংশ হলো ১৫ শতাংশ। (সূত্র : আইএমএফ)। একই সূত্রে দেখা যায়, চায়নার জিডিপি ১৪.১৪ ট্রিলিয়ন ডলার। আর ক্রয়ক্ষমতার বিবেচনায় চায়নার জিডিপি ২৭.৩১ ট্রিলিয়ন ডলার, যা চায়নাকে আমেরিকার (২১.৪৪ ট্রিলিয়ন ডলার) আগে স্থান করে দিয়েছে। পণ্য ও কাঁচামাল উৎপাদনে ব্যাপক প্রসারের কারণে চায়নার আরেক নাম ‘পৃথিবীর কারখানা’ বা ‘ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টরি’। এত উৎপাদন সত্ত্বেও ২০২০ সালে চায়নার জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫.৮ শতাংশে নামবে বলে আশঙ্কা আইএমএফের। কারণ একসময় চায়না এই বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশে ধরে রেখেছিল।

২৫ নভেম্বর, ২০১৯ তারিখে বার্তা সংস্থা রয়টার্স চায়নার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘পিপলস ব্যাংক অব চায়না’র বরাতে বেশকিছু তথ্য প্রকাশ করে, যা চায়নার অর্থনীতি চোরাবালিতে আটকে যাওয়ার অবস্থা প্রমাণ করে। বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা ও তারল্য সংকটের কারণে চায়নার অর্থনৈতিক অবস্থা অতিসংবেদনশীল বা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বলে বার্ষিক প্রতিবেদনে স্বীকার করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বন্ড মার্কেটে খেলাপি বা ব্যর্থতার অবসান হবে না বলেই মনে করে ব্যাংকটি। তথ্যমতে, অদূর ভবিষ্যতে ঝুঁকি বা সমস্যা সমাধান সহজ হবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দৃষ্টিতে চায়নার ৪ হাজার ৩৭৯টি গ্রামীণ ও ছোট আকারের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অতিমাত্রার ঝুঁকিতে রয়েছে ১৩.৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান। ২০১৮ সালে এ ধরনের ১০.৫৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হয়। চায়নার ৪টি বড় ব্যাংক হলো ব্যাংক অব চায়না, এগ্রিকালচারাল ব্যাংক অব চায়না, ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়না এবং চায়না কনস্ট্রাকশন ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, এ ৪টি ব্যাংকই তাদের ক্ষতি সহ্য করার জন্য চরম চাপে রয়েছে। বর্তমানে চায়নার অর্থনৈতিক অগ্রগতি বিগত ৩০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে বিরাজ করছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান কোফেইসের তথ্যমতে, ২০২০ সালে চায়নার মুদ্রাস্ফীতি হবে ৩ শতাংশ, যা ২০১৭-তে ছিল অর্ধেক বা ১.৬ শতাংশ। জিডিপির তুলনায় অর্থের মজুদ ২০১৮ সাল পর্যন্ত বেশি বা পজিটিভ ছিল। ২০১৯-এ তা সমান সমান বা শূন্যে দাঁড়ায় আর ২০২০ সালে এ হার ২ শতাংশ কম বা নেগেটিভ থাকার আশঙ্কা রয়েছে। আর সরকারের ঋণ ঠেকবে জিডিপির ৫৫ শতাংশে।

 

করোনার কালো থাবা

সমগ্র বিশ্বে আজ দুশ্চিন্তার আরেক নাম করোনাভাইরাস, যা চায়নায় প্রথম শনাক্ত হয়। ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ পর্যন্ত এ ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার এবং মৃতের সংখ্যা ২ হাজার ৭০০। চীনে প্রথম শনাক্ত হয় এই মরণঘাতী ভাইরাস, যা দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ছে সারা বিশ্বে। ফলে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে চীন ও চীনের অর্থনীতি। বছরের শুরুতে কমপক্ষে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির স্বপ্ন দেখা চীনের প্রথম তিন মাসে প্রবৃদ্ধি ৩.৫ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান মর্গান স্টেনলি। ১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত মর্গান স্টেনলি মূলত ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক সেবা প্রদান করে। বিশ্বের ৪২টি দেশে তাদের কর্মী সংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার। আমেরিকার অর্থনৈতিক সংবাদ পরিবেশনকারী পে টিভি চ্যানেল সিএনবিসি ১৯ ফেব্রুয়ারি মর্গান স্টেনলিকে উদ্ধৃত করে বেশকিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে। সূত্রমতে, চায়নার বিভিন্ন শহরে চলাচল বা পরিবহনে নিষেধাজ্ঞার কারণে সার্বিকভাবে চীনের উৎপাদনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। কিছু কিছু এলাকায় কলকারখানা চালু হলেও সার্বিক উৎপাদন স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশেও পৌঁছতে পারছে না। এভিয়েশন কনসাল্টিং ফার্ম ‘কিরিয়াম’-এর তথ্যমতে, চায়নায় চলাচলকারী প্রায় ২ লাখ ফ্লাইট বাতিল হয়েছে করোনাভাইরাসের কারণে। এ সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কাও করছে প্রতিষ্ঠানটি যদি করোনাভাইরাস আরও ছড়িয়ে পড়ে। ২০০৯ সালে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পর এবারই বিমান পরিবহন খাতে আবার ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে। শুধু এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বাজেট এয়ারলাইনসে লেনদেন ২৯ বিলিয়ন ডলার কমার সম্ভাবনা দেখছে ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন। বিশ্বের প্রায় সব শেয়ারবাজারে দ্রুত কমছে বিমানভিত্তিক বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম। জাপানের ব্যাংক নমুরা’র তথ্যমতে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চায়নার ৬টি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা ব্যবহার ৪২.৫ শতাংশ কমেছে। কম কয়লা এবং কম বিদ্যুৎ ব্যবহার প্রমাণ করে কী হারে কমেছে কলকারখানার উৎপাদন। খাদ্য উৎপাদনেও পড়েছে ব্যাপক ঘাটতি। সার্বিকভাবে বলা যায়, করোনার কালো থাবা বেশ কাবু করে ফেলেছে চীন তথা চীননির্ভর বিশ্ব অর্থনীতি।

 

ধাক্কা লেগেছে বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে

২০১৯ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায় কয়েকটি প্রভাবশালী ও বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দেউলিয়া ও বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘোষণায়। ব্যবসাবিষয়ক জরিপ ও পরামর্শ প্রতিষ্ঠান মানিওয়াইজের তথ্যমতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফরএভার ২১, ওয়াল গ্রিন্স, ডেসব্যার্ন, গেইম স্টপসহ আরও কিছু বাণিজ্যপ্রতিষ্ঠান ২০১৯ সালে ৯ হাজার ৩০০-এর বেশি বিক্রয় কেন্দ্র বা স্টোর বন্ধ করে দিয়েছে। আরেক গবেষণা সংস্থা কোর সাইট রিসার্চ বলছে, ২০১৮ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া বিক্রয় কেন্দ্র বা স্টোরের সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৮৪৪, যা ২০১৯ সালে ৬০ শতাংশ বেড়ে যায়। ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক ইউএসবির দেওয়া তথ্যমতে, ২০২৬ সালের মধ্যে এমন ৭৫ হাজার বিক্রয় কেন্দ্র বা স্টোর বন্ধ হয়ে যাবে শুধু অনলাইনে বিক্রয়ের প্রসার ঘটলে। আমেরিকার জুতার ব্র্যান্ড ‘পে লেস শু সোর্স’ বিশ্বের ৩০টি দেশের ৪ হাজার ৪০০ স্থানে দারুণ ব্যবসা জমিয়েছিল। আজ কোম্পানিটি দেউলিয়া। আমেরিকা ও পোর্টোরিকোতে কোম্পানির ২ হাজার ১০০ বিক্রয় কেন্দ্র বন্ধ হয়েছে। শিশু পোশাকের ব্র্যান্ড জিমবোরি ২০১৭ সালে দেউলিয়া অবস্থা কাটিয়ে উঠলেও ২০১৯ সালে বন্ধ করে দেয় ৮০০ শাখা। ৬০ বছরের পুরনো মহিলাদের পোশাকের ব্র্যান্ড ড্রেস ব্যার্ন বন্ধ করেছে ৬৫০টি শাখা। ডিসকাউন্ট স্টোর ও ওষুধ বিক্রয়ের জন্য প্রসিদ্ধ ‘ফ্রিডস’ ২০১৯ সালের শুরুতে ৫৬০টি শাখায় ব্যবসা পরিচালনা করত। বছর শেষে তারা ৫৫৭টি শাখা বন্ধের উদ্যোগ নেয় এবং নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করে। চার্লোটি রুসি নামের মহিলাদের পোশাকে আরেক ব্র্যান্ড ব্যবসা চালুর ৪৫ বছরের গোড়ায় দাঁড়িয়ে তার ৫০০ শাখার এক-পঞ্চমাংশ বন্ধের ঘোষণা দেয়। ৫০০-এর নিচে শাখা বন্ধ করেছে এমন ৪১টি ব্র্যান্ড বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে মানিওয়াইজের প্রতিবেদনে। এর মধ্যে বাংলাদেশিদের কাছে সুপরিচিত পোশাক ব্র্যান্ড গ্যাপ ২৩০টি, মহিলাদের বিশেষ পোশাকের জন্য জগৎখ্যাত ব্র্যান্ড ভিক্টোরিয়াস সিক্রেট ৫৩টি এবং হালের জায়ান্ট ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ওয়াল মার্ট ১৮টি শাখা বা বিক্রয় কেন্দ্র বন্ধের ঘোষণা দেয় ২০১৯ সালেই। ১৯৬২ সালে টার্গেট, কে মার্ট এবং ওয়ালমার্ট প্রায় একই সঙ্গে যাত্রা করে। শিগগিরই হয়তো এ তালিকা থেকে কে মার্টের নাম মুছে যাবে বলে আশঙ্কা অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের। ২০০০ সালে কে মার্টের ২ হাজর ২০০ শাখা ছিল। বিগত কয়েক বছরে তা ক্রমাগত কমতে থাকে। ২০১৮ সালে বন্ধ হয় কে মার্টের ১৫০টি শাখা। ২০১৯ সালে ৫০টি শাখা বন্ধের ঘোষণা থাকলেও কে মার্টের কর্মীরা ১২৫টি শাখা কার্যত বন্ধের তথ্য দেন গণমাধ্যমকে।

ব্রিটেনের অর্থনীতির করুণ চিত্র ফুটে ওঠে বিবিসির ২৩ অক্টোরব, ২০১৯-এর প্রতিবেদনে। তথ্যমতে, দেশে ফ্যাশন চেইন ক্যারেন মিলেন অ্যান্ড কোস্ট তাদের ১০০টির বেশি শাখাসহ সার্বিক ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ব্রিটিশ রিটেইল কনসোর্টিয়াম বলছে, ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে কেবল খুচরা বিক্রয় কেন্দ্রভিত্তিক লক্ষাধিক কর্মী চাকরিচ্যুত হয়েছেন। অদূর ভবিষ্যতে এ ধরনের আরও ৯ লাখ কর্মী চাকরি হারাতে পারেন বলে আশঙ্কা করছে সংস্থাটি। লন্ডনভিত্তিক পত্রিকা এনএস বিজনেস ৪ নভেম্বর, ২০১৯ ৮টি বৃহৎ বা জায়ান্ট কোম্পানির নাম প্রকাশ করে যেখানে বন্ধের উপক্রমে পৌঁছার কারণে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে। এর মধ্যে অতি প্রসিদ্ধ মা ও শিশুদের সামগ্রী বিক্রয় প্রতিষ্ঠান মাদার কেয়ারও রয়েছে, যার ৭৯টি শাখা বন্ধ এবং ২ হাজার ৫০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা ছিল।

অর্থনৈতিক মন্দার কারণে মানুষ খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দেবে এমনটা স্বপ্নেও ভাবেননি ইতালির রেস্টুরেন্ট চেইন ‘জেমিস ইটালিয়ান’-এর সেলিব্রেটি শেফ জেমি অলিভার। অথচ ২১ মে, ২০১৯ তারিখে প্রশাসকের হাতে তুলে দিতে হয় মৃতপ্রায় এই চেইন রেস্টুরেন্ট। প্রাণপ্রিয় রেস্টুরেন্টগুলো বাঁচাতে ব্যক্তিগত তহবিল থেকে ৪০ লাখ পাউন্ড খরচ করেছিলেন অলিভার। তার পরও ২৯২ লাখ পাউন্ড ক্ষতি পুষিয়ে  উঠতে না পারায় মোট ২৫টি রেস্টুরেন্টের মধ্যে ২২টিই বন্ধ হয়ে যায়। এতে চাকরি হারান প্রায় ১০ হাজার কর্মী। একই অবস্থা ফ্রেঞ্চ স্টাইল ক্যাফে এবং বেকারি প্যাটিসেরি ভেলেরির ক্ষেত্রেও। ক্ষতির মুখে কেপিএমজিকে প্রশাসক নিয়োগ করে প্রতিষ্ঠানটি। আর টিকে থাকার চেষ্টায় ১৮১টি শাখার মধ্যে ৭০টি বন্ধ করা হয়। এতে চাকরি হারান প্রায় ৯০০ কর্মী।

ধাক্কা লেগেছে ক্রীড়াঙ্গনেও। ইংলিশ লিগে খেলা ফুটবল ক্লাব বোল্টন ওয়ান্ডার্স এফসিতে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে, ১৩ মে, ২০১৯-এ। দেনা ও কর প্রদানে ব্যর্থতার দায়ে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ‘ডিবেন হামস’ তার ১৬৬টি বিক্রয় কেন্দ্রের মধ্যে বন্ধ করতে যাচ্ছে ২২টি, তাও আবার ২০২০ সালেই। এতে চাকরি হারাবেন ১০ হাজার কর্মী। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সংগীত তারকা লিয়াম গাললাগের শখের ফ্যাশন চেইন ‘প্রিটিগ্রিন’ও।

 

টিকতে পারছে না শতবর্ষী প্রতিষ্ঠানও

৫ জুলাই, ১৮৪১ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করে ব্রিটিশ ভ্রমণ ও উড়োজাহাজ পরিচালনা প্রতিষ্ঠান থমাস কুক। ধীরে ধীরে প্রসার লাভ করে একপর্যায়ে একটি গ্রুপে পরিণত হয় এ প্রতিষ্ঠান, যেখানে যাত্রীবাহী ও ভাড়া বিমান পরিচালনা, হলিডে বা ট্যুর প্যাকেজ, সমুদ্র বিলাসবহুল জাহাজ বা ক্রুজ লাইন পরিচালনা এবং হোটেল ও রিসোর্টের জমজমাট ব্যবসা ছিল। উন্নত বিশ্বের ২০টি দেশে তাদের নিজস্ব ট্যুর অপারেটর ছিল। ২০১৮ সালেও বিশ্বের ৪৭টি স্থানে ২০০ হোটেলে তাদের বিভিন্ন ধরনের কয়েক হাজার কক্ষ ছিল। ১২ লাখ গ্রাহক ৯২ লাখ রাত কাটিয়েছিলেন থমাস কুকের ২০০ হোটেলে। ২০১৯ সালে থমাস কুক আরও ৫০টি হোটেল খুলবে বলে ৩১ অক্টোবর, ২০১৮-তে তথ্য দেয় ভ্রমণ ম্যাগাজিন ‘ট্রাভেল উইকলি’। ৮টি দেশ থেকে তারা বিমানবহর পরিচালনা করত, যেখানে ১১২টি যাত্রীবাহী বিমান ছিল এবং আরও ২টি বিমানের ক্রয়াদেশ দেওয়া ছিল। এমন শক্তিধর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা মুখ থুবড়ে পড়ে ২০১৯ সালে। বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার কারণে ক্রমেই  সংকুচিত হয় ভ্রমণ ব্যবসা। ফলে ক্রমাগত লোকসান ও আকাশচুম্বী ঋণের কারণে ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ সালে কোম্পানির সব কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা বা বাধ্যতামূলক ব্যবসা গোটানোর ঘোষণা দেয়। এতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ২১ হাজার কর্মী চাকরি হারান এবং ৬ লাখ যাত্রী বিভিন্ন স্থানে আটকা বা বিড়ম্বনায় পড়েন। যুদ্ধ ছাড়া স্বাভাবিক সময়ে চাকরি হারানো বা ব্যবসা গোটানোর মতো এত বড় ঘটনা পৃথিবীতে আর কখনো ঘটেনি। ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ সালে বিবিসির তথ্যমতে, বিশ্বের শক্তিশালী ও সম্মানজনক তথা প্রথম সারির ব্যাংক হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হংকং সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন বা এইচএসবিসি বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ৩৫ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দেয়। ২০১৯ সালে ব্যাংকের লাভ এক-তৃতীয়াংশ কমে যাওয়ায় এ ঘোষণা দেওয়া হয়। ২০২২ সালের মধ্যে ব্যাংক পরিচালনা ব্যয় সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার কমানোর পরিকল্পনা থেকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। ভারপ্রাপ্ত সিইও নোয়েল কুইন ব্যাংকের কর্মী সংখ্যা ২ লাখ ৩৫ হাজার থেকে কমিয়ে শুধু ২ লাখ করার সিদ্ধান্ত জানান। ১৮৬৫ সালের ৩ মার্চ তৎকালীন ব্রিটিশ হংকংয়ে প্রতিষ্ঠিত এই ব্যাংক বর্তমানে উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার ৫০টি দেশে ব্যবসা পরিচালনা করছে। প্রতিটি দেশেই ব্যাংকের কর্মীরা চাকরি হারানোর আতঙ্কে আছেন বিশ্ব অর্থনীতির বিরূপ আচরণের কারণে।

 

সুড়ঙ্গ শেষে আলো

যতই বিপর্যয় ঘটুক, মানুষ ঘুরে দাঁড়ায়। এক একটি বিশ্বযুদ্ধ পুরো পৃথিবীকে পঙ্গু করলেও মানুষ ঠিকই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কারণ আশার অন্য নামই হলো জীবন। স্বপ্নই মানুষকে বাঁচতে শেখায়। স্বপ্নই মানুষকে এগিয়ে নেয়। যেমনটি দেখা যায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলছে, বাংলাদেশের ২০১৯ সালে সার্বিক জিডিপির পরিমাণ ৩১৭ বিলিয়ন ডলার আর ক্রয়ক্ষমতার তুলনায় জিডিপির আকার ৮৩৭ বিলিয়ন ডলার।

২০২০ সাল শেষে তা বেড়ে সার্বিক জিডিপি প্রায় ৩৪৮ বিলিয়ন এবং ক্রয়ক্ষমতার তুলনায় জিডিপি প্রায় ৯১৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে বলে ধারণা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের। বর্তমানে বাংলাদেশ পৃথিবীর ১৮৯টি দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক শক্তির বিচারে ৪১তম দেশ। আইএমএফ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, নেক্সট বিগ ফিউচারসহ সব গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বলছে, বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ২০৩০ সালে বিশ্বের ৩০তম অবস্থানের কাছে বা আগে থাকবে। এর মধ্যে নেক্সট বিগ ফিউচারের আগাম ধারণা, ২০২৭ সালে বাংলাদেশের জিডিপি বর্তমান আকারের প্রায় দ্বিগুণ এবং ২০৩১ সালে প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পাবে। তাই সুন্দর আগামীর স্বপ্ন নিয়েই আমাদের বেঁচে থাকা।


আপনার মন্তব্য