Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শনিবার, ৯ জানুয়ারি, ২০১৬ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ৮ জানুয়ারি, ২০১৬ ২২:১৪
আমার বাবা কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী
কেয়া চৌধুরী
আমার বাবা কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী

আগামীকাল আমার বাবা কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরীর ২৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। ব্যক্তি জীবনে তিনি পরোপকারী উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। পেশায় আপাদমস্তক এক কৃষক। তার নেশা ছিল রাজনীতির মাধ্যমে জনসেবা।  মহান ভাষা-আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধে ছিলেন একজন অকুতভয় বীর। এ দেশের মুক্তির আন্দোলনে তার অনন্য সাধারণ ভূমিকার কথা দেশবাসী গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করে। তার জন্ম ১৯৩৩ সালের ২০ ডিসেম্বর, সিলেটের হবিগঞ্জে। কঠোর ও দ্বিধাহীন চিত্তের আমার বাবা কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী নামে খ্যাতিমান। তিনি বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর এক অকুতভয় আদর্শিক সৈনিক। ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের কর্মী মানিক চৌধুরী প্রথম কারাবরণ করেন। বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের প্রতি বঙ্গবন্ধুর সৈনিক হিসেবে তিনি নিবেদিতভাবে কাজ করেছেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পরপরই তিনি তার নির্বাচনী এলাকা (চুনারুঘাট, শ্রীমঙ্গল ও বাহুবল)  সবগুলো চা বাগানের চা শ্রমিকদের নিয়ে একটি শক্তিশালী তীরন্দাজ বাহিনী গঠন করেন। ২৫ মার্চের আগ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তীরন্দাজ বাহিনীকে নিয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি। ঢাকা-সিলেট সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের প্রবেশের সম্ভাবনাকে অসম্ভব করে তোলেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এ নির্দেশনা স্বাধীনতার মূল মন্ত্র হিসেবে মানিক চৌধুরী তার লক্ষ্য স্থির করেছিলেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরীর ভূমিকা ছিল বহুবিধ। ভারত থেকে অস্ত্র সংগ্রহ, খাদ্য সংগ্রহ, বিশেষ করে হবিগঞ্জ এবং মৌলভীবাজার থেকে জোয়ানদের মুক্তিফৌজে যোগদানের মাধ্যমে একটি প্রশিক্ষিত মুক্তিফৌজ গঠনে অবদান রেখেছিলেন। একজন বেসামরিক ব্যক্তি হয়ে সামরিক রণ-কৌশলে তিনি সিলেটের সর্ববৃহৎ ও রক্তক্ষয়ী শেরপুর-সাদিপুরের যুদ্ধ পরিচালনা করেন। ১৯৭১ সালে হবিগঞ্জের সরকারি অস্ত্রাগার থেকে ২৭ মার্চ দুপুরের কোনো এক সময়ে মানিক চৌধুরীর নেতৃত্বে ৩৩০টি রাইফেল ও ২ হাজর ২০০ গুলি লুট হয়। আর এটিই ছিল শেরপুর-সাদিপুর যুদ্ধে ব্যবহূত প্রথম অস্ত্র। মানিক চৌধুরীর ৯ মাসের যুদ্ধ জীবনে তিনি নিজের সঙ্গে সঙ্গী করে রেখেছিলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা পত্রটি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে, আওয়ামী লীগের মহকুমা নেতাদের মতো বঙ্গবন্ধু হবিগঞ্জ মহকুমায় ওয়্যারলেসযোগে এম এন এ মানিক চৌধুরীর কাছে স্বাধীনতার বার্তাটি পাঠিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর মানিক চৌধুরীর কণ্ঠে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার কথা ফুটে উঠেছে। যতদিন বেঁচে ছিলেন নানান রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েও দেশের জন্য কাজ করে গেছেন। ১৯৯০ সালের ১৬ ডিসেম্বর তার জীবনের শেষ বক্তব্যে মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ‘একদিন কম্পন হবে, মুক্তিযোদ্ধাদের মূল্যায়ন হবে, দেশের মাটিতেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে।’ আব্বা মারা গেছেন আজ ২৫ বছর। ১৯৯১ সালে একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েও পিজি হাসপাতালে কোনো ওয়ার্ডে আমার আব্বার জন্য একটি সিট বরাদ্দ করাতে পারিনি। প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে যথাযথ চিকিৎসা সম্পন্ন হয়নি। যে কারণে অনেক অভিমান নিয়ে অকালে পৃথিবী থেকে চলে যেতে হয়েছে। ২০১৫ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা আব্বাকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মাননা স্বাধীনতা পদক (মরণোত্তর) প্রদান করেছেন।

একই বছরের নভেম্বরের ১২ তারিখে শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী যারা ধনে সম্পদে ক্ষমতার (বিএনপি সরকারের আমলে) চূড়ায় অধিষ্ঠিত ছিল সেই সাকা চৌধুরী এবং মুজাহিদের ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে। একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে আজ গর্ব করে বলি; আব্বার জীবনের শেষ বক্তব্যের একটি কথাও মিথ্যে হয়নি। মুক্তিযোদ্ধাদের মূল্যায়ন হচ্ছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও চলছে।  সব মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে আমার আব্বার স্বপ্নগুলোকে এত কাছ থেকে ছুঁতে পেরেও, সত্যিই আমি গর্বিত।

লেখক : সমাজকর্মী ও সংসদ সদস্য।

ই-মেইল : kchowdhury71@gmail.com

এই পাতার আরো খবর
up-arrow