Bangladesh Pratidin

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৭

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৭
প্রকাশ : বুধবার, ১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০ টা আপলোড : ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২৩:৩০
জাহাজ শিল্পে অমিত সম্ভাবনা
এশিয়ার গর্ব খুলনা শিপইয়ার্ড
নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা
জাহাজ শিল্পে অমিত সম্ভাবনা

বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে ত্রিমাত্রিক (আকাশ, পানি ও পানির নিচে) সক্ষমতা দিতে কাজ করছে খুলনা শিপইয়ার্ড। গত কয়েক বছরে এখানে অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ ‘প্যাট্রোল ক্রাফট’ ও ‘লার্জ প্যাট্রোল ক্রাফট’সহ পানির নিচে সাবমেরিন অপারেশনের জন্য ‘টাগ বোর্ড’ নির্মাণ করা হয়েছে।

বর্তমানে এখানে ‘স্টেট অব আর্ট টেকনোলজি’ সংবলিত অত্যাধুনিক মানের আরও একটি যুদ্ধজাহাজ ‘লার্জ প্যাট্রোল ক্রাফট’ নির্মাণের কাজ চলছে। চলতি মাসেই এ যুদ্ধজাহাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্পটিই খুলনা শিপইয়ার্ডের সবচেয়ে বড় প্রকল্প। পাশাপাশি সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে কোস্টগার্ডের জন্য এখানে আরও তিনটি ইনশোর প্যাট্রোল ভেসেল (আইপিভি) নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। জানা গেছে, ১৯৯৯ সালেও খুলনা শিপইয়ার্ড লোকসানের ভারে ন্যুব্জ ছিল। অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতিতে সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানটি মৃতপ্রায় রুগ্ণ শিল্পে পরিণত হয়। তবে নৌবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় জাহাজশিল্পের পথিকৃৎ হয়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটি হারানো গৌরব ফিরে পেয়েছে। যুদ্ধজাহাজের পাশাপাশি ইতিমধ্যে ছোট-বড় ৭২৫টি জাহাজ নির্মাণ ও ২ হাজার ২২৪টি জাহাজ মেরামত করে অনন্য নজির স্থাপন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

বদলে যাওয়ার ইতিহাস : ১৯৫৪ সালে স্থাপিত হয় খুলনা শিপইয়ার্ড।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে স্টিল ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের আওতায় এটি পরিচালিত হতো। আশির দশক পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক পর্যায়ে ছিল। এর পর থেকে বাড়তে থাকে লোকসানের বোঝা। চরম অব্যবস্থাপনায় একসময় প্রতিষ্ঠানটি রুগ্ণ শিল্পে পরিণত হয়। তবে সে অবস্থা এখন আর নেই। ১৯৯৯ সালের ৩ অক্টোবর বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে হস্তান্তরের পর প্রতিষ্ঠানটি এরই মধ্যে ছোট আকারের যুদ্ধজাহাজ ‘প্যাট্রোল ক্রাফট’, ২০১৬ সালের শেষের দিকে অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ ‘লার্জ প্যাট্রোল ক্রাফট’ এবং চলতি বছর সাবমেরিন অপারেশনের জন্য দুটি ‘টাগ বোর্ড’ নির্মাণ করেছে। সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে নির্মিত এই অত্যাধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম ত্রিমাত্রিক নৌবাহিনী গঠনে সহায়ক হবে।

প্রথম যুদ্ধজাহাজ : একসময়ের পিছিয়ে পড়া খুলনা শিপইয়ার্ডেই তৈরি হয়েছে দেশের প্রথম যুদ্ধজাহাজ। প্রতিপক্ষের বিমান এবং জাহাজবিধ্বংসী ৩৭ ও ২৫ মিলিমিটারের চারটি কামান-সংবলিত এই প্যাট্রোল ক্রাফটের গতিবেগ ঘণ্টায় ২৩ নটিকল মাইল (প্রায় ৩৭ মাইল)। প্রতিটি জাহাজ নির্মাণে গড়ে ৫৮ কোটি টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু বিদেশ থেকে এ মানের জাহাজ আমদানি করতে গেলে ব্যয় হতো প্রায় ১০০ কোটি টাকা।

লার্জ প্যাট্রোল ক্রাফট : খুলনা শিপইয়ার্ডে তৈরি অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ লার্জ প্যাট্রোল ক্রাফটের সক্ষমতা ‘স্টেট অব আর্ট টেকনোলজি’ সংবলিত যুদ্ধজাহাজের সমতুল্য। বর্তমানে নৌবাহিনীর জন্য আরেকটি যুদ্ধজাহাজ লার্জ প্যাট্রোল ক্রাফট তৈরি করেছে শিপইয়ার্ড। চলতি মাসেই এই যুদ্ধজাহাজের উদ্বোধন করা হবে বলে শিপইয়ার্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এটিই খুলনা শিপইয়ার্ডের সবচেয়ে বড় প্রকল্প। সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে নির্মিত এই অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ ত্রিমাত্রিক নৌবাহিনী গঠনে সহায়ক হবে।

দক্ষ জনশক্তি : জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতের পাশাপাশি শ্রমিকদের বিশ্বের সব শিপইয়ার্ডে কাজ করার উপযুক্ত করে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির চেষ্টা চলছে খুলনা শিপইয়ার্ডে। একসময় এখানে দেখে দেখে শ্রমিকরা কাজ করতেন। এখন দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

শিপইয়ার্ডের প্লেটার শপ বিভাগের ওআইসি লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এম ইরফান মাহদী বলেন, স্থায়ী-অস্থায়ী দেড় হাজার শ্রমিক এখানে কাজ করছেন, যারা প্রতিনিয়ত দেশি-বিদেশি প্রকৌশলীদের সহায়তায় দক্ষ হয়ে উঠছেন। ফলে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক দক্ষ শ্রমিক যুক্ত হচ্ছে দেশ-বিদেশের শ্রমবাজারে।

শিপইয়ার্ডের সক্ষমতা : এখানে জাহাজ ডকিং-আনডকিংয়ের জন্য ৭০০ টন ক্ষমতাসম্পন্ন স্প্রিংওয়ে রয়েছে। জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতের জন্য আটটি বার্থ আছে, যার প্রতিটির দৈর্ঘ্য ৪২৫ ফুট। অতি দ্রুত নির্মাণ ও মেরামত কাজ সম্পন্ন করার পাশাপাশি গুণগত মান বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা থেকে কারিগররা।

কর্মকর্তাদের অভিমত : খুলনা শিপইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর কে কামরুল হাসান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বিভিন্ন মডেলের জাহাজ নির্মাণের অভিজ্ঞতা আগে থেকেই শিপইয়ার্ডের ছিল। পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে গড়ে তোলা হয়েছে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তিনি বলেন, চলতি মাসের মাঝামাঝিতে আরেকটি অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ            লার্জ প্যাট্রোল ক্রাফটের উদ্বোধন করা হবে। পাশাপাশি কোস্টগার্ডের জন্য তিনটি ইনশোর প্যাট্রোল ভেসেল (আইপিভি) নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে।

খুলনা শিপইয়ার্ডের জেনারেল ম্যানেজার (উৎপাদন) ক্যাপ্টেন এম জাকিরুল ইসলাম জানান, সমুদ্র এলাকায় নিরাপত্তা, সম্পদ আহরণ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে লার্জ প্যাট্রোল ক্রাফট জাহাজের বিকল্প নেই। এ ধরনের নির্মাণকাজকে নতুন আলোর পথের সন্ধান হিসেবে দেখছেন শিপইয়ার্ডের শ্রমিক-কর্মকর্তারা।

up-arrow