Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

প্রকাশ : শুক্রবার, ১০ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপডেট : ৯ জুন, ২০১৬ ২৩:২৩
সন্ত্রাসের সঙ্গে বাস সূত্রাপুরে
শ্যামপুর টু লালবাগ ৩
মাহবুব মমতাজী
সন্ত্রাসের সঙ্গে বাস সূত্রাপুরে

ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত হয় সূত্রাপুর থানা। পুরান ঢাকার এ এলাকাটি একই সঙ্গে আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিক্ষাবান্ধব। আগের মতো জৌলুস আর ব্যস্ততা সবই হারিয়ে নিষ্প্রাণ হয়ে গেলেও নগরীর অন্যতম বৃহৎ অঞ্চল হিসেবে ধরা হয় সূত্রাপুর থানা এলাকাকে। আর এখানে জড়িয়ে আছে ব্রিটিশদের অনেক স্মৃতি। সূত্রাপুর থানাকে ভেঙে গেন্ডারিয়া ও ওয়ারীসহ আরও দুটি পৃথক থানা গঠন করা হয়েছে। এ এলাকায় আবাসিক ভবন ও স্কুল-কলেজের সংখ্যা আশপাশের চেয়ে অনেক বেশি। এত কিছুর পরও ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে এখানকার রাস্তাঘাট। চুরি-ছিনতাই যেন নিত্যদিনের ঘটনা। তবে স্যুয়ারেজ ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার বেহাল দশার কারণে দিন দিন বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে এলাকাটি। ড্রেন ভর্তি হয়ে কাদা-পানি উপচে পড়ছে রাস্তার ওপর। এতে চলাচলে ঘটছে বিঘ্ন। এ ছাড়া এখানকার বাসিন্দারা শতাধিক পুরনো ভবনে বসবাস করছেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, যেগুলোকে ২০০৯ সালে হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার। সেই সঙ্গে আছে সন্ত্রাস-আতঙ্কও।

সূত্রাপুর থানা এলাকায় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মসজিদ আছে ৫০টি, মন্দির ১০টি, গির্জা তিনটি। কাঁচাবাজার রয়েছে দুটি। মেডিকেল কলেজ একটি, কলেজ আটটি, স্কুল ১৭টি, কারিগরি প্রতিষ্ঠান একটি, প্রাথমিক বিদ্যালয় ২০টি। উল্লেখযোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো—ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ, ঢাকা মহানগর মহিলা কলেজ, সরকারি কবি নজরুল কলেজ, সরকারি শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী কলেজ, কে এল জুবিলী স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা সরকারি মুসলিম হাইস্কুল, সেন্ট গ্রেগরি হাইস্কুল, সেন্ট ফ্রান্সিস জেফিয়ার্স গার্লস হাইস্কুল ও রামকৃষ্ণ মিশন স্কুল। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৪২, ৪৩, ৪৪, ৪৫ ও ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডগুলো এ থানারই অন্তর্ভুক্ত। জানা গেছে, দেশের সেরা কবি, সাহিত্যিক, রাজনীতিকদের আড্ডা একসময় বিউটি বোর্ডিংয়ে হতো, যা সূত্রাপুরেই অবস্থিত। ১৯৭১ সালে অপারেশন সার্চলাইট নামে ২৭ মার্চ মধ্যরাতে লোহারপুরের মালাকারটোলার হিন্দু মহল্লার নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাক হানাদার বাহিনী। সেই কালরাতে ১৫ জনকে একসঙ্গে হত্যা করা হয়। শহীদ ১৫ জনের ১৪ জনই ছিল সংখ্যালঘু। এরা হলেন ড. হরিনাথ দে, ইন্দ্রমোহন পাল, বিপ্লব কুমার দে, দুলাল চন্দ্র দে, লালমোহন সাহা, মণিলাল সাহা, গোলাপ চান সাহা, ক্ষিতিশ চন্দ্র নন্দী, প্রাণকৃষ্ণ পাল, বিশ্বনাথ দাস পল্টু, জীবন ঘোষ, দীনেশ চন্দ্র দাস, জীবনকৃষ্ণ দাস, রামকৃষ্ণ দাস ও হারুণ-অর-রশীদ। স্বাধীনতার ৩৯ বছর পর ২০১০ সালে মালাকারটোলা মোড়ে সেই প্রয়াতদের স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। এমনকি ৪০০ বছরের অনেক ইতিহাস-ঐতিহ্য এখনো ধরে রেখেছে লালখান বিবি কা রওজা ও বাহাদুর শাহ পার্ক। জানা গেছে, লক্ষ্মীবাজারের রস মিষ্টির গলির রাস্তাটির বৈদ্যুতিক খাম্বার বাতিগুলো নষ্ট হয়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে। ফলে সন্ধ্যায় স্কুল-কলেজের কোচিং শিক্ষার্থীদের পড়তে হয় পদে পদে বিড়ম্বনায়। আর এ কারণে এখানে প্রতিনিয়ত ছিনতাইয়ের ঝুঁকিও পোহাতে হয় তাদের। জানা যায়, পুরান ঢাকার সূত্রাপুর অঞ্চলে ঐতিহাসিক যেসব পুরনো বাড়িঘর ছিল তা সরকার ইতিমধ্যে হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করেছে। হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করলেও এসব ভবন সংরক্ষণ ও সংস্কারের জন্য নেই কোনো ধরনের উদ্যোগ। এখনো পর্যন্ত এসব বাসাবাড়িতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন বাসিন্দারা। সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, ঝুঁকিপূর্ণ এসব পুরনো ভবনের মধ্যে রয়েছে ২৬ নম্বর বি কে দাস রোডের বাড়ি। ৭, ৪০, ২২, ৪৪, ৪৫, ৪৬, ১২/১, ৫৯ ও ৬২ নম্বর বাড়িগুলো শতাধিক বছরের পুরনো। এসব বাড়ির নিচতলায় চলে ছাপাখানার কাজ। আর ওপরে বসবাস। বি কে দাস রোডের ৬৫ নম্বর দৃষ্টিনন্দন বাড়িটিতে অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে চলে বাণিজ্য ও বসবাস। কালিচরণ সাহা রোডের ৩০০ বছরের পুরনো মিল ব্যারাকটিও রয়েছে ভেঙে ফেলার ঝুঁকিতে। হেরিটেজ এই বাড়ির মালিকানা দাবি করেছেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য হাজী সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন। ১৭ নম্বর সূত্রাপুর কাঁচাবাজার রোডের বাড়িটিও দীর্ঘদিন ধরে দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে আছে। সূত্রাপুর কমিউনিটি সেন্টারের সামনের দিকের অলিগলিতে রয়েছে বেহাল পয়োনিষ্কাশন ও ঢাকনাবিহীন স্যুয়ারেজ লাইন। এতে চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। আর এম রোড, সুকলাল দাস লেন, রূপচান দাস লেন, রূপলাল দাস লেন এবং পি কে রায় রোডে একটু বৃষ্টিতেই লেগে যায় জলাবদ্ধতা। এলাকার মানুষদের চিকিৎসাসেবার সুবিধার্থে স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে উঠেছে শহীদ ময়েজউদ্দিন রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতাল। আর সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বিকাশের জন্য রয়েছে মাহফুজ স্মৃতিসংসদ পাঠাগার। অভিযোগ পাওয়া যায়, পাতলা খান লেন ও কাগজীটোলা সোশ্যাল ক্লাবের পাশে নারিন্দা পুলিশ ফাঁড়ির গেটের সামনে মাদকের ব্যবহার আর ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে হরহামেশা। একই সঙ্গে একই জায়গায় সূত্রাপুর থানা পুলিশের নানা হয়রানির শিকারও হন সাধারণ পথচারীরা। কাঠের পুল তনুগঞ্জ লেনেও চলে মাদক কেনা-বেচা। এ রাস্তা এবং লোহারপুলের আর এম দাস রোডের মোড়টিও ময়লা আবর্জনার অব্যবস্থাপনায় ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। কবি নজরুল সরকারি কলেজ গেট মোড় থেকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী সরকারি কলেজ গেট মোড় পর্যন্ত সড়কটিকে আগে লেডিস রোড বলা হতো। এ সড়কের দুই পাশের ফুটপাথে বসে নিত্যপণ্যের দোকান। চশমা নাছির ও জামাই রাজীব ফুটপাথের এসব অবৈধ দোকান নিয়ন্ত্রণ করেন বলে জানান ফুটপাথ ব্যবসায়ীরা। অভিযোগ আছে, সন্ত্রাসীদের আনাগোনাও বেশি এ এলাকার অলিগলিতে। গত বছর জানুয়ারিতে ৪০/২ ঠাকুর দাস লেন বানিয়ানগরে চার বছর ধরে একটি বিল্ডিং নির্মাণের কাজ করে আসছিল সুপার বিল্ডার্স নামে একটি কোম্পানি। নির্মাণের শুরু থেকে বিষু ঘোষ (বাবা বিষু) নামে এক সন্ত্রাসী ওই কোম্পানির মালিক মামুনের কাছ থেকে চার লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। আর এ কারণে প্রায় তিন মাস ধরে বিল্ডিংয়ের নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখেন কোম্পানির মালিক। গত ৬ এপ্রিল একরামপুর ট্রাফিক মোড়ে রাতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সান্ধ্যকালীন মাস্টার্সের শিক্ষার্থী নাজিমুদ্দিন সামাদ সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন। সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, ধোলাইখালের নাসিরউদ্দিন সরদার লেন, গোয়ালঘাট লেন, লালমোহন সাহা স্ট্রিট লেন ও হাজী আবদুল মজিদ লেনে গড়ে উঠেছে দেশের বৃহৎ মোটর পার্টসের দোকান। এ ছাড়া এখানে আছে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কারখানাও। ২ নম্বর নারিন্দা রোডের দক্ষিণ পাশের মুরগিটোলামুখী সড়ক দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে ট্রাক ও হালকা ট্রাকের স্ট্যান্ড। এ কারণে প্রতিদিন ধোলাইখাল ও রায় সাহেব বাজার মোড়ে লেগে থাকে তীব্র যানজট। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রাজধানীর শিক্ষাহাট খ্যাত লক্ষ্মীবাজারকে নিয়েই সূত্রাপুরবাসী গর্ব করেন প্রতিনিয়ত। এক জায়গায় এত নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রাজধানীর অন্য কোনো এলাকায় নেই। দেশের সবচেয়ে বড় প্রকাশনা এলাকা বাংলাবাজারও এখানে। আর এখানকার ছাপাখানার কার্যক্রম চলে অস্বাস্থ্যকর, রংচটা, স্যাঁতসেঁতে শতাধিক পুরনো ভবনের নিচে, যাতে সব সময়ই ঝুঁকির আশঙ্কা থাকে। নর্থব্রুক হল রোডের টায়ার ব্যবসায়ীরা জানান, সিসিটিভির আওতায় থাকার পরও এ রোডের মাথায় বাহাদুর শাহ পার্ক-সংলগ্ন মোড়ে প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। সূত্রাপুরের ৪৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. আরিফ হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ছিনতাই-চুরি এগুলো হলো সামাজিক অবক্ষয়। ছিনতাই আগের চেয়ে কিছুটা কমেছে। আর এসব কাজ যারা করে তারা মাদকাসক্ত। আর এই মাদক প্রতিরোধে আমরা আমাদের সাধ্যমতো কাজ করে যাচ্ছি।’

সংশ্লিষ্ট সংবাদ




up-arrow