শিরোনাম
প্রকাশ : ২৩ জুন, ২০২১ ২২:০১
প্রিন্ট করুন printer

অনলাইনে আম ব্যবসায় স্বাবলম্বী রাবি শিক্ষার্থীরা

রাবি প্রতিনিধি

অনলাইনে আম ব্যবসায় স্বাবলম্বী রাবি শিক্ষার্থীরা
ফাইল ছবি
Google News

ফেসবুকে ‘আমশাহী’ নামের একটি পেইজে ঢুকলেই দেখা যাচ্ছে আম বিক্রির বিজ্ঞাপন। গোপালভোগ, হিমসাগর আর ল্যাংড়াসহ নানা জাতের আমের বিজ্ঞাপনে ঠাসা পেইজটি। ক্রেতাদের নজর কাড়তে পেইজে বাগানের আম দেখানো, আম নামানো এবং প্যাকেজিং ভিডিও করে দেখানো হচ্ছে।

এই পেইজের মাধ্যমেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার গ্রাহকরা পছন্দ অনুসারে আম কিনতে পারছেন। কেনার পর তারা প্রাপ্ত আম নিয়ে পেইজে মন্তব্যও করছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থী হাসান পারভেজ এই পেইজ পরিচালনা করেন। ৪ বছর ধরে তিনি আমের মৌসুমে অনলাইনের মাধ্যমে অর্ডার নিয়ে আম পাঠাচ্ছেন। চলতি মৌসুমে অন্তত ৭ মেট্রিক টন আম পাঠিয়েছেন তিনি।

হাসান পারভেজ বলেন, চলতি মৌসুমে ৩০ বিঘা আমের বাগান ইজারা নিয়েছি। বাগানে গোপালভোগ, হিমসাগর, ল্যাংড়া, ফজলি, আম্রপালিসহ বিভিন্ন জাতের ৫০০টির মতো গাছ রয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় চাষিদের কাছ থেকেও আম কিনছি। ফলে চাষিরাও লাভবান হন। কারণ চাষিদের হাটে আম নিয়ে গেলে খাজনা দিতে হয়। আবার দামও কম পান। আড়তদাররা আবার সেই আম বিক্রি করেন আম ব্যবসায়ীদের কাছে। সেই আম কয়েক হাত ঘুরে যেত ভোক্তার কাছে। ফলে বাধ্য হয়ে ব্যবসায়ীদের আমে রাসায়নিক দিতে হয়, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। অনলাইনে বিক্রির ফলে সরাসরি বাগান থেকে আম প্যাকেট হয়ে ভোক্তার কাছে পৌঁছে যায়। ফলে একদিকে ভোক্তারা টাটকা, সুস্বাদু ও মিষ্টি আম পাচ্ছেন, অন্যদিকে কৃষকরাও লাভবান হচ্ছেন। 

হাসান পারভেজের মতো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য শিক্ষার্থী অনলাইনে আম ব্যবসা করছেন। অনলাইনে গ্রুপ, পেজ ও ওয়েবসাইট খুলে সমানতালে চলছে আমের প্রচার। অনলাইন ম্যাঙ্গো শপ, ফ্রুটস হান্ট, রাজশাহীর আম, স্টোর হাউস অব ম্যাংগো- এমন আরও কত বাহারি নাম। অনলাইনে অর্ডার নিয়ে তারা বাগান থেকে আম পেড়ে সেখানেই প্যাকিং করে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ভোক্তার কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে রাজশাহীতে জারি করা হয়েছে লকডাউন। এর প্রভাবে রাজশাহীতে আমের দাম ও ক্রেতা কমতে শুরু করেছে। সরবরাহের তুলনায় ক্রেতা না থাকায় রাজশাহীর আমের হাটে বেচা-কেনায় এরই মধ্যে ধস নেমেছে। ফলে কৃষকরা নায্যমূল্য পাচ্ছেন না। তবে অনলাইনে মৌসুমী আম ব্যবসায়ীদের ফলে কৃষকরা অনেকটা লাভবান হচ্ছেন।

রাজশাহীর স্থানীয় আম ব্যবসায়ীরা বলছেন, অনলাইন ব্যবসায়ীরা বাগানে গিয়ে চাষির কাছ থেকে সরাসরি আম কেনার কারণে দামের ক্ষেত্রে আড়তদাররা সিন্ডিকেট করতে পারছেন না। একটানা করোনা সংকট এবং মাঝে মধ্যে বৃষ্টি হওয়ার পরও অনলাইনে ব্যবসার ফলে আমের চাহিদার কমতি নেই। এতে একদিকে যেমন কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে, অন্যদিকে চাষিরা পাচ্ছেন ন্যায্যমূল্য। আর ভোক্তারা পাচ্ছেন রাসায়নিক মুক্ত সুস্বাদু ও পরিচ্ছন্ন আম। 

রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, এবার রাজশাহীতে ১৭ হাজার ৯৪৩ হেক্টর জমিতে দুই লাখ ১৯ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। রাজশাহী ও এর আশপাশের উপজেলাতে এবার আমের ফলন ভালো হয়েছে। ফলে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি আম উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

জানা যায়, রাজশাহী জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত ১৫ মে থেকে গুটি আম নামান চাষিরা। উন্নত জাতের মধ্যে গোপালভোগ ২০ মে, রানিপছন্দ ২৫ মে ও হিমসাগর ২৮ মে থেকে নামানো শুরু হয়। ল্যাংড়া আম ৬ জুন থেকে নামানোর সময় নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া আম্রপালি এবং ফজলি আগামী ১৬ জুন থেকে নামানোর সময় নির্ধারণ করা হলেও এখনও বাজারে আসেনি। সবশেষে আগামী ১৭ জুলাই থেকে নামবে আশ্বিনা জাতের আম।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী মিলে 'রাজশাহী ম্যাংগো প্যারাডাইজ' নামের একটি ফেসবুক গ্রুপ তৈরি করেছেন। নিজেদের গ্রুপে বিজ্ঞাপন দিয়ে তারা আম বেচাকেনা করছেন। অর্ডার অনুযায়ী সরাসরি বাগান থেকে পরিপক্ব আম নামিয়ে ক্যারেটে প্যাকিং করে বিভিন্ন জায়গায় কুরিয়ারের মাধ্যমে আম সরবরাহ করছেন। 

গ্রুপের সদস্য সাইফুর রহমান বলেন, গ্রুপের মাধ্যমে বিভিন্ন জেলার মানুষেরা আমের অর্ডার করছেন। সে অনুসারে আম সরবরাহ করছি। আমের গুটি হওয়ার পর থেকে সব আপডেট গ্রুপে জানিয়েছি। আম পরিপক্ব হওয়ার পর বাজার অনুসারে দাম ও ছবি দিয়ে আম বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়েছি আমরা। এ পর্যন্ত ৫ মেট্রিক টনের বেশি আম অর্ডার হয়েছে।

আরেক শিক্ষার্থী চারুকলা অনুষদের মনু মোহন বাপ্পা ফেসবুকে 'রেইনবো ম্যাঙ্গো স্টেশন' নামে একটি ফেসবুক পেইজ পরিচালনা করেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জে নিজস্ব ৬০ বিঘা আমের বাগান আছে‌ তার। এ পর্যন্ত তিনি অনলাইনে ১০ মেট্রিক টন আম বিক্রি করেছেন।

তিনি বলেন, আমি ৩ বছর ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। সরাসরি বাগান থেকে তরতাজা ও বাছাইকৃত আম গ্রাহকদের সরবরাহ করে থাকি। আম নামানোর সরকারি তারিখ অনুসারে আমের অর্ডার নিয়েছি। প্রতিনিয়ত আমের অর্ডার আসছে। অর্ডার অনুসারে নিজস্ব বাগান থেকে আম সংগ্রহ, ক্যারেটে ভরা, কুরিয়ার সার্ভিসে পৌঁছে দেওয়াসহ সব কাজই নিজে উপস্থিত থেকে করছি। আম পেয়ে গ্রাহকেরা বেশ সন্তুষ্ট।

জানতে চাইলে রাজশাহী জেলা কৃষি কর্মকর্তা কেজেএম আবদুল আউয়াল বলেন, জেলায় এ বছর আমের উৎপাদন ভাল হয়েছে। করোনা মোকাবেলায় রাজশাহীতে লকডাউন চললেও দূর-দূরান্তে আম পাঠানোর জন্য গাড়ি চলছে। কিন্তু খুচরা বাজারে করোনার প্রভাব আছে। অনেকে হাটে-বাজারে এখন যেতে চাচ্ছেন না। সেক্ষেত্রে অনলাইনের মাধ্যমে অর্ডার নিয়ে রাজশাহী থেকে কুরিয়ারের মাধ্যমে আম পাঠানোটা একটা ভালো দিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া ম্যাঙ্গো স্পেশাল ট্রেনে আম পাঠানোর সুযোগ হওয়ায় ভাল হয়েছে।

বিডি প্রতিদিন/আবু জাফর

এই বিভাগের আরও খবর