শিরোনাম
প্রকাশ : ১ আগস্ট, ২০২১ ১৩:৫৪
আপডেট : ১ আগস্ট, ২০২১ ১৯:২১
প্রিন্ট করুন printer

হুইপ সামশুলের বাড়ির পাশে অবৈধ টিকাদান কেন্দ্র, অর্থের বিনিময়ে টিকা প্রদান

পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে এসব টিকা নিয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা জানেন না, প্রশাসনে তোলপাড়, তদন্ত কমিটি

নিজস্ব প্রতিবেদক

হুইপ সামশুলের বাড়ির পাশে অবৈধ টিকাদান কেন্দ্র, অর্থের বিনিময়ে টিকা প্রদান
হুইপ সামশুল হক
Google News

দেশের গ্রাম পর্যায়ে আগামী ৭ আগস্ট থেকে গণহারে করোনার টিকাদান কর্মসূচি শুরুর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে প্রস্তুতি কার্যক্রম চলছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ও হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর গ্রামের বাড়ির পাশে অবৈধভাবে সিনোফার্মের টিকা দেওয়া শুরু হয়ে গেছে। বিভাগ, জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের অনুমতি ছাড়াই দুই দিন ধরে এই টিকাদান কার্যক্রম চলছে। আর এই টিকাদান কার্যক্রম হুইপ সামশুল সশরীরে পরিদর্শনও করেছেন।

অবৈধভাবে টিকাদান কার্যক্রম শুরুর এই ঘটনায় চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য বিভাগে তোলপাড় শুরু হয়েছে। বিষয়টি তদন্তে শনিবার চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালকের (স্বাস্থ্য) কার্যালয় থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সভাপতি চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জারির সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. অজয় দাশ। অন্য দুই সদস্য হলেন সদস্যসচিব চট্টগ্রাম জেলার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আসিফ খান এবং একই কার্যালয়ের মেডিক্যাল অফিসার (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডা. মো. নুরুল হায়দার।

চট্টগ্রামের বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. হাসান শাহরিয়ার কবীর গতকাল বিকেলে বলেন, ‘৭ আগস্টের আগে ইউনিয়ন পর্যায়ে টিকা কার্যক্রম কেউ শুরু করতে পারে না। অভিযোগ পাওয়ার পর সিভিল সার্জনকে নির্দেশনা দিয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে সুনির্দিষ্ট মতামত দিতে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে দিয়েছি। কমিটিকে দুই কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।’

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, কাউকে না জানিয়ে কেউ টিকা দিতে পারে না। সরকারি সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ করোনার টিকা দিয়ে থাকলে তা ঠিক হয়নি। তদন্তে আসল বিষয় উঠে আসবে।

গতকাল বিভাগীয় পরিচালকের কার্যালয় থেকে তদন্ত কমিটি গঠন সম্পর্কিত এক বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, গত ২৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক কভিড-১৯ ভ্যাকসিনেশন কর্মসূচি উদ্বোধনের পর ৭ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে একযোগে ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম শুরু হয়ে এখনো চলমান। কভিড-১৯ ভ্যাকসিন উদ্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় পৌঁছানোর জন্য সরকারিভাবে ইউনিয়ন পর্যায়ে কভিড-১৯ (সিনোফার্ম) টিকা প্রদানের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা প্রক্রিয়াধীন। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ব্যতিরেকে উপজেলা, জেলা কিংবা বিভাগীয় পর্যায় থেকে কোনো প্রকার   অনুমতি না নিয়ে চট্টগ্রাম জেলাধীন পটিয়া উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ওই স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (ইপিআই) মো. রবিউল হোসেন কর্তৃক গত ৩০ ও ৩১ জুলাই কভিড-১৯ সিনোফার্ম ভ্যাকসিন অন্যত্র নিয়ে ইউনিয়ন পর্যায়ে রেজিস্ট্রেশনবিহীন লোকদের প্রদান করা হয়েছে। এ ব্যাপারে সরেজমিন তদন্তের জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর অনুগত মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (ইপিআই) মো. রবিউল হোসেনসহ কয়েকজন স্বাস্থ্য সহকারী প্রশাসনের কারো অনুমতি না নিয়ে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে এই টিকাদান কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছেন। সরকারিভাবে শুক্রবার সাপ্তাহিক বন্ধের দিন টিকা দেওয়া হয় না। তবে গত শুক্রবার সামশুল হক চৌধুরীর বাড়ি থেকে কয়েক শ গজ দূরে শোভনদণ্ডী ইউনিয়নের রশিদাবাদ গ্রামে করোনা টিকা প্রদান কার্যক্রম শুরু করেন তাঁরা। শুক্রবার রশিদাবাদ কমিউনিটি সেন্টারে এবং গতকাল শোভনদণ্ডী উচ্চ বিদ্যালয় ও শোভনদণ্ডী ডিগ্রি কলেজে সিনোফার্মের টিকা দেওয়া হয়। হুইপ সামশুল এদিন ওই কেন্দ্রে টিকাদান কার্যক্রম সশরীরে পরিদর্শন করেন। এভাবে গত দুই দিনে এখানে আড়াই থেকে তিন হাজার লোককে করোনা টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয়েছে।

আরো গুরুতর অভিযোগ হলো, পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে এসব টিকা নিয়ে গেলেও উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সব্যসাচী নাথসহ চিকিৎসকরা বিষয়টি জানেন না। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মজুদ থেকে এসব টিকা নিয়ে গিয়ে এমপির এলাকায় গণহারে টিকা দেওয়া হচ্ছে।

পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সব্যসাচী নাথ এ ব্যাপারে বলেন, ‘হুইপ মহোদয় কিংবা সিভিল সার্জন মহোদয়ের লিখিত কোনো অনুমতি ছিল না এই টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে। সেহেতু আমি জানি না। আমাকে কেউ এ বিষয়ে বলেনি। টিকাগুলো আমাকে না জানিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে কে বা কারা নিয়ে গেছে। শনিবার সিভিল সার্জন মহোদয়ের নির্দেশনা পেয়ে আমি শোভনদণ্ডীতে গিয়ে দেখেছি যে সেখানে টিকা দেওয়া হচ্ছে।’

‘ঝুঁকি’ নিয়ে টিকা : সরকারিভাবে দেশে করোনা টিকা কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রেশন, টিকা গ্রহণের কেন্দ্র, মেডিক্যাল টিম, চিকিৎসক-কর্মকর্তাদের বিশেষ টিম, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে প্রয়োজনীয় ওষুধ, অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুতসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা রাখা হয়। কিন্তু শোভনদণ্ডী ইউনিয়নে টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি এসব নির্দেশনার কোনোটাই মানা হয়নি। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, ঝুঁকি নিয়ে এসব টিকা দেওয়া হচ্ছে। টিকা প্রদানে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে এর দায়ভার কে নেবে?

অভিযোগ উঠেছে, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (ইপিআই) মো. রবিউল হোসেন এই পদে চলতি দায়িত্বে আছেন। তাঁর মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের তিন বছরের ডিপ্লোমা কোর্স নেই। তাঁর নিয়মিত পদ স্বাস্থ্য সহকারী। হুইপের অনুগত হওয়ার সুযোগে চলতি দায়িত্ব নিয়ে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের কাজ করছেন। আর তাঁর নেতৃত্বেই চলছে ওই টিকাদান কার্যক্রম। এ ছাড়া হুইপের অনুসারী আরও কয়েকজন সরকারি কর্মচারী (পটিয়া স্বাস্থ্য বিভাগে) রয়েছেন। তাঁদের দাপটে স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এখানে অসহায়। রেজিস্ট্রেশনবিহীন এবং বিধিবহির্ভূতভাবে অর্থের বিনিময়ে ৭০০ টিকা প্রদানের অভিযোগ উঠেছে রবিউলের বিরুদ্ধে। খোদ হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর নিজের ইউনিয়ন শোভনদন্ডীতে ঘটেছে এই ঘটনা। 

টিকা নিয়ে রবিউল নিজেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর সাথে ঘনিষ্ঠতার ছবি প্রকাশ করেছেন। নিজেকে এলাকায় বিভিন্ন সময়ে হুইপপন্থী ছাত্রলীগের 'সভাপতি' দাবি করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

বৃহস্পতিবার থেকেই এই মেডিকেল টেকনোলজিস্টের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলেও শনিবার পর্যন্ত তার তত্ত্বাবধানে টিকা দেয়া হয় হুইপ সামশুলের নিজের ইউনিয়ন শোভনদন্ডীতে।

এদিকে পটিয়া স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সব্যসাচী নাথ এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ইপিআই) রবিউল হোসেনের বিরুদ্ধে অনুমোদন ছাড়া টিকা প্রদান, অর্থ আদায়সহ নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ‌

জানা গেছে, পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সিনোফার্মের প্রথম ডোজ টিকা প্রদান শুরু হয়েছে গত ২০ জুন। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সাত হাজার ৭৬৯ জন প্রথম ডোজ নিয়েছেন বলে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়। গতকাল টিকা নিয়েছেন তিন হাজার ২৬০ জন। এ নিয়ে গতকাল পর্যন্ত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রথম ডোজের টিকা মজুদ রয়েছে চার হাজার ৭৫০টি। কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের না জানিয়ে এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে এমপির বাড়ির পাশে কমিউনিটি সেন্টার ও স্কুল-কলেজে বুথ বানিয়ে কোনো হিসাব-নিকাশ না করে যথেচ্ছ টিকা দেওয়ায় উপজেলায় টিকার মজুদ ক্রমেই ফুরিয়ে আসছে। এতে উপজেলায় টিকার জন্য যাঁরা রেজিস্ট্রেশন করেছেন তাঁদের ওই টিকা পাওয়া নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

বিডি-প্রতিদিন/সালাহ উদ্দীন

এই বিভাগের আরও খবর