শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৭ মে, ২০১৮ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৭ মে, ২০১৮ ০২:০৩

চার মাস বেতন নেই ৮৬২ কর্মীর

মুখ থুবড়ে পড়েছে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে কর্মরতদের জীবনযাত্রা

জয়শ্রী ভাদুড়ী

৬৫ বছর ধরে রাজধানীবাসীকে সুনামের সঙ্গে সেবা দিয়ে আসছে হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। কিন্তু চার মাস ধরে বেতন-ভাতা না পাওয়ায় মুখ থুবড়ে পড়েছে এই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত চিকিৎসক, নার্স এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনযাত্রা। সারা জীবন এই হাসপাতালে সেবা দিয়ে চাকরি শেষে তারা পাচ্ছেন না প্রাপ্য গ্র্যাচুইটির অর্থটুকুও।

এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবিতে গত মঙ্গলবার থেকে আজ পর্যন্ত এক ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করছেন হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্সসহ সব কর্মচারী। কর্মবিরতিতে অংশগ্রহণকারী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক জানান, প্রথমে মাসের মাঝামাঝি বেতন দেওয়া শুরু হলো, এরপর আস্তে আস্তে শেষের দিকে নিয়ে যাওয়া হলো। এখন আমাদের চার মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। এর আগে গত বছর এপ্রিলে বেতন-ভাতা এবং অষ্টম বেতন স্কেলের দাবিতে এরকম কর্মবিরতি পালন করা হলে ১১ জনকে বদলি করে কর্তৃপক্ষ। আন্দোলন বন্ধ করতে ১১ জনকে রাজশাহী, দিনাজপুর, নেত্রকোনা এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বদলি করা হয়। এখন পর্যন্ত এই হাসপাতালে বাস্তবায়ন করা হয়নি অষ্টম বেতন স্কেল। হলি ফ্যামিলি মেডিকেল কলেজের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঠিক সময়ে বেতন পেলেও বেতন পাই না আমরা।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৯১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই পাল্টে যায় হাসপাতালের সেবার চিত্র। দলীয় ব্যক্তিকে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির দায়িত্ব দেওয়া হয়। ওই ব্যক্তি নিজ এলাকার পাশাপাশি আত্মীয়স্বজনকে প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেন। পরবর্তী সব সরকারের সময় দলীয়  ব্যক্তিদের দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে জনবল নিয়োগ করা হয়েছে। ৫২৮ শয্যার এ হাসপাতালে বর্তমানে চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ৮৬২। কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত অন্তত ৩০০ জনবল রয়েছে। এই জনবলকে কাজে লাগাতে ২০০০ সালে স্থাপন করা হয় হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ। পরিকল্পনা ছিল হাসপাতালের অতিরিক্ত জনবলকে কাজে লাগানো হবে মেডিকেল কলেজে। কিন্তু আবারও নিয়োগ দিয়ে জনবল সেই একই রেখেছে কর্তৃপক্ষ। গত এক বছরের হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, হাসপাতালে দিনে সর্বোচ্চ ৩০০ রোগী ভর্তি ছিলেন। গড়ে অর্ধেক শয্যা ফাঁকা থাকে। হাসপাতালের গড় আয় তিন কোটি টাকার কিছু বেশি। এর মধ্যে দুই কোটি টাকা প্রয়োজন মাসিক বেতন বাবদ। বেতনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ আয় হলেও বিনা বেতনে বর্তমান উচ্চ দ্রব্যমূল্যের বাজারে সেবা দিতে হচ্ছে হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ব্যবস্থাপনা পর্ষদের সদস্য লুত্ফর রহমান চৌধুরী হেলাল বলেন, মেডিকেল কলেজে পুরনো চিকিৎসক চলে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবে রোগী কিছুটা কমেছে। প্রায় সময়ই অর্ধেক শয্যা ফাঁকা থাকে। এই আয়ে অতিরিক্ত জনবলকে বেতন দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। আগামী সপ্তাহে কর্তৃপক্ষের সভা আছে, সেখানে তাদের এই বকেয়া বেতনের ব্যাপারে আলোচনা হবে।

 অষ্টম পে স্কেল বাস্তবায়নের ব্যাপারে তিনি বলেন, আর্থিক সমস্যার কারণে প্রতিষ্ঠানে অষ্টম পে স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হয়নি। বাড়ি ভাড়ার ভাতা দিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা এবং সেবার মান বাড়িয়ে রোগীর সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। এতে করে আয় বাড়লে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বকেয়া বেতন ও গ্র্যাচুইটি পরিশোধ করা যাবে।

 জানা যায়, ১৯৫৩ সালে সিস্টারস অব ফিলা ডিল ফিয়া নামে একটি মিশনারি প্রতিষ্ঠান এই হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করে।

স্বাধীনতার পর ওই মিশনারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির কাছে হাসপাতালটি হস্তান্তর করে। তবে শর্ত ছিল, কোনো কারণে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি হাসপাতালটি পরিচালনা করতে না পারলে সিস্টারস অব ফিলা ডিল ফিয়ার কাছে হস্তান্তর করবে।

 এখনো হাসপাতালটি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি পরিচালনা করে আসছে। সরেজমিন হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, বহির্বিভাগের চিকিৎসকদের কক্ষ, প্যাথলজি বিভাগ থেকে শুরু করে পুরো ভবনজুড়ে জীর্ণতার ছাপ। বৃষ্টির পানি চুইয়ে পড়ে কক্ষগুলোতে শ্যাওলা জমে আছে। খসে পড়ছে দেয়ালের পলেস্তারা। কেবিন থেকে শুরু করে চারপাশেই জীর্ণতার ছাপ। এ ব্যাপারে জানতে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ডা. মো. শাহাদাৎ হোসেন শরীফের কক্ষে গিয়ে দেখা যায় দরজার বাইরে কর্মবিরতি পালন করছেন চিকিৎসক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। পরবর্তীতে এ বিষয়ে কথা বলতে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।


আপনার মন্তব্য