শিরোনাম
প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারি, ২০২০ ২১:৫১

নাটোরে সিন্ডিকেটে জিম্মি অ্যালোভেরার বাজার

নাটোর প্রতিনিধি

নাটোরে সিন্ডিকেটে জিম্মি অ্যালোভেরার বাজার

নাটোরের লক্ষ্মীপুর খোলাবাড়িয়া ইউনিয়ন ওষুধের গ্রাম বলেই পরিচিত। মাঠের পর মাঠ ওষুধ আর ভেষজ গাছের সমারোহ। ভেষজ গাছের নামেই পরিচয় ঘটেছে এই জনপদের। জেলাজুড়ে মাঠে মাঠে যেখানে বিভিন্ন ফসলের আবাদ দেখা যায়, সেখানে ব্যতিক্রম শুধু এই ইউনিয়নটি। অন্তত ১৬টি গ্রামের প্রায় প্রতি বাড়ির ফসলি জমিতে চাষ হয় অ্যালোভেরা।

কৃষি বিভাগ বলছে, অনুকূল আবহাওয়া ও কৃষকদের অ্যালোভেরা চাষের জ্ঞান থাকায় অন্তত এক হাজার চাষী ৬৫ হেক্টর জমিতে বছরে ১৩১৩০ মেট্রিক টন অ্যালোভেরা উৎপাদন করেন। আশানুরূপ দাম না পাওয়ার ক্ষেত্রে হকারনির্ভর শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেটকে দায়ী করছেন চাষীরা। সিন্ডিকেট ভাঙতে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তারা। নাটোর জেলা প্রশাসক শাহ রিয়াজ বলেন, অ্যালোভেরাসহ অন্যান্য ওষুধি কাঁচামালের সিন্ডিকেট ভাঙতে বাজার সৃষ্টিসহ অনান্য সুবিধা বাড়াতে কাজ করছে জেলা প্রশাসন। সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার কারণে উৎপাদিত এসব অ্যালোভেরার ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কৃষক। 

নাটোর শহর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে লক্ষ্মীপুর খোলাবাড়িয়া ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নের ১৬টি গ্রামের ১২টিতে আংশিক ও চারটি গ্রামে কয়েক হাজার বিঘা জমিতে সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ হয় অ্যালোভেরা।

অ্যালোভেরা চাষী জয়নাল আবেদীন জানান, ১৯৯৫ সালে আফাজ উদ্দীন পাগলা নামে এক ব্যক্তি প্রথম অ্যালোভেরা গাছের চারা এনে লক্ষ্মীপুর খোলাবাড়িয়াতে রোপণ করেন। অ্যালোভেরা পাতার নির্যাস দিয়ে শরবত বানিয়ে বিক্রিও শুরু করেন তিনি। গাছের দ্রুত বৃদ্ধি দেখে ধীরে ধীরে রোপণ করতে শুরু করেন গ্রামের অন্যরাও। এভাবেই গ্রামটিতে শুরু হয় অ্যালোভেরা চাষ। বর্তমানে কয়েক হাজার পরিবার এ চাষের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু বাজার নিয়ন্ত্রণ না থাকায় ন্যায্যমূল্য পাওয়া যাচ্ছে না বলেও দাবি তার।

চাষী রফিকুল ইসলাম জানান, জমিতে চারা রোপণের তিন মাস পর থেকেই প্রথম তোলা যায় অ্যালোভেরা পাতা। প্রতি সপ্তাহে একবার করে একটি গাছ থেকে পাতা সংগ্রহ করা যায়। গড়ে তিনটি অ্যালোভেরা পাতার ওজন এক কেজি। চাহিদা বেশি হওয়ায় গ্রীষ্মকালে কেজি প্রতি ২০-২৫ টাকা এবং বছরের অন্য সময়ে গড়ে ১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয় অ্যালোভেরা। এত উৎপাদন খরচ উঠলেও লাভের মুখ দেখছেন না বলে জানান তিনি। একটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের কারণে এ অচলাবস্থা বলে মনে করেন তিনি।
ভেষজ ওষুধ বিক্রেতা মুক্তার আলী জানান, উৎপাদিত এসব অ্যালোভেরা দ্বারা ডায়াবেটিস, কোষ্ঠকাঠিন্যসহ বিভিন্ন রোগের ওষুধ তৈরি করা হয়। এখান থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলে যায় ওষুধ। 

লক্ষ্মীপুর খোলাবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন জানান, বিশ্বের অন্যান্য দেশে আয়ুর্বেদিক ওষুধ, প্রসাধনীসহ নানান খাদ্য পণ্যে অ্যালোভেরার বিস্তৃত ব্যবহার লক্ষ করা গেলেও বাংলাদেশে শরবত ছাড়া কোনো কাজে খুব একটা ব্যবহার দেখা যায় না। ফলে এখনো বড় বেপারি ও শরবত বিক্রেতাদের যৌথ সিন্ডিকেটের বাইরে কোনো বাজার গড়ে ওঠেনি। এতে অ্যালোভেরা চাষীরা এক প্রকার জিম্মি। নায্য দাম পেতে এই ইউনিয়নে একটি বাজার প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। সেই সঙ্গে চাষ বৃদ্ধিতে সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের সহকারি অধ্যাপক উজ্জল হক জানান, প্রাচীনকাল থেকেই ভেষজ চিকিৎসা শাস্ত্রে অ্যালোভেরার ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। পাতার রস যকৃত ও পাতার শাঁস ফোড়ার জন্য উপকারি। হাঁপানি ও এলার্জি প্রতিরোধে এটি কার্যকর। তিনি বলেন, অ্যালোভেরা পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ামুক্ত ভেষজ চিকিৎসার কাঁচামাল ও ফার্মাসিউটিক্যাল প্রডাক্টে ব্যবহার করা যেতে পারে। তাতে বিজ্ঞান নির্ভর প্রাকৃতিক ওষুধ উৎপাদনের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে তিনি বলে মনে করেন। 

বিডি প্রতিদিন/আল আমীন

 


আপনার মন্তব্য