শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ৭ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৬ নভেম্বর, ২০১৯ ২২:২৩

কমছে শিশুতোষ নাটক, চলচ্চিত্র গান ও শিশুবান্ধব অনুষ্ঠান

কমছে শিশুতোষ নাটক, চলচ্চিত্র গান ও শিশুবান্ধব অনুষ্ঠান

শিশুদের সামনে শিশুবান্ধব অনুষ্ঠান উপহারের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু আজকের শিশুরা নির্মল বিনোদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এখন দুই-একটি টিভি চ্যানেল বাদে শিশুতোষ অনুষ্ঠান প্রচার হয় না বললেই চলে। শিশুর মানসিক বিকাশ ও বিনোদনের জন্য কারও কোনো মাথাব্যথাও নেই। শিশুবান্ধব অনুষ্ঠান নির্মাণ কেন অবহেলিত। লিখেছেন- পান্থ আফজাল

 

শিশুর একমাত্র বিনোদন টেলিভিশনকেন্দ্রিক। আমাদের বেশির ভাগ টিভি চ্যানেল দিনে ১ ঘণ্টার বেশি কোনো শিশুতোষ অনুষ্ঠান প্রচার করে না; দুই একটি টিভি চ্যানেল বাদে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, বাংলাদেশে এখনো খুব বেশি কার্টুন সিরিজ তৈরি হয়নি। বাংলাদেশে কার্টুনের অপ্রতুলতার কারণে স্বাভাবিকভাবে শিশুরা বিদেশি কার্টুনের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। শুধু কার্টুন নয়, শিশুতোষ অনুষ্ঠানের বেশ ঘাটতিও রয়েছে। মুস্তাফা মনোয়ারের ‘মনের কথা’ কিংবা ‘সিসিমপুরে’র মতো শিশুতোষ অনুষ্ঠান একেবারে হাতেগোনা। আগে বিটিভিতে ফেরদৌসী রহমানের তত্ত্বাবধানে গান শেখানোর আসর ‘এসো গান শিখি’ বা ‘নতুন কুঁড়ি’র মতো এখন তেমন করে নেই শিশুদের জন্য টিভি অনুষ্ঠান। বাচ্চারা এখন স্কুল আর চার দেয়ালের মাঝে বন্দী হয়ে প্রযুক্তির সঙ্গে করছে সখ্যতা। বিনোদনের আরেক বড় মাধ্যম শিশুতোষ নাটক ও চলচ্চিত্র। এগুলোর অবস্থা আরও ভয়াবহ। আগে বিটিভিতে শিশুদের জন্য অনেক নাটক নির্মিত হতো। পরবর্তীতে কয়েকটি বেসরকারি চ্যানেলও কিছু অনুষ্ঠান নির্মাণ করেছিল। কিন্তু বর্তমানে ‘দুরন্ত’ টিভি ছাড়া শিশুদের জন্য তেমন করে কোনো চ্যানেল নাটক বা শিশুবান্ধব অনুষ্ঠান নির্মাণ করছে না। হচ্ছে না মনজুড়ানো শিশুতোষ গান। এখন তো শিশুতোষ চলচ্চিত্র নেই বললেই চলে। ‘দীপু নাম্বার টু’, ‘এমিলির গোয়েন্দা বাহিনী’, ‘ছুটির ঘণ্টা’, ‘অশিক্ষিত’, ‘মাটির ময়না’, ‘দূরবীণ’ কিংবা ‘আমার বন্ধু রাশেদে’র মতো চলচ্চিত্র শিশুদের মানসিক ও মানবিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। পরবর্তীতে ‘আঁখি ও তার বন্ধুরা’ নির্মিত হয়েছিল। তবে সুখবর হচ্ছে- মানিক মানবিকের উদ্যোগে ‘ছেলেটি অভুত’ নির্মিত হচ্ছে। পূর্বে বিটিভিতে প্রচারিত হয়েছিল মুস্তাফা মনোয়ারের বিখ্যাত পুতুল শো ‘আজব দেশে’। স্বাধীনতা অর্জনের পর বিটিভি ‘নতুন কুঁড়ি’ বা পুতুল শো ‘পারুল’ এবং পরবর্তীতে কার্টুন সিরিজ শিশুদের ক্রমবর্ধমান আগ্রহে পরিণত হয়েছিল। টেলিভিশনে শিশু বিনোদনের জায়গা করে নেয় একসময় বিদেশি স্যাটেলাইট চ্যানেল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, শিশুরা তাদের মাতৃভাষায় একটি বাক্য বলতে সক্ষম হওয়ার আগেই তারা ভিনদেশি ভাষা শিখে যাচ্ছে। শিশুদের গাইবার জন্য এমন কোনো গান নেই চলচ্চিত্রে। নাচের অনুষ্ঠানও কম হচ্ছে। শিশু চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য সরকারি প্রণোদনাস্বরূপ নির্মাতাদের বিভিন্ন রকমের সুবিধা প্রদান এবং কর মওকুফের ঘোষণা থাকলেও নির্মাতারা তাতে খুব একটা আগ্রহী হন না। বর্তমানে যদিও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমি দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশুদের জন্য উৎসবমুখর পরিবেশে চলচ্চিত্র প্রদর্শনে মনোযোগী হয়েছে। এটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক বিষয়। চিল্ড্রেন ফিল্ম সোসাইটির আয়োজন ঢাকা ও দেশের মাত্র কয়েকটি বিভাগীয় শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি দেশের ৬৪টি জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে একযোগে চলচ্চিত্র উৎসব করতে যাচ্ছে এটি আরও বেশি উৎসাহ এবং আশার কথা। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির চেয়ারম্যান ও গুণী অভিনেত্রী লাকী ইনাম বলেন, ‘টিভি ছাড়া অন্যান্য প্লাটফর্মে কাজ কিন্তু প্রচুর হচ্ছে। শিশু একাডেমিতে প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী। তারা কেউ শিখছে নাচ, কেউ গান, আবৃত্তি, বিতর্ক, ছবি আঁকা, অভিনয়সহ নানা বিষয়। ৯ ডিসেম্বর রোকেয়া দিবসের জন্য সবাই প্রস্তুত হচ্ছে। তবে এটা ঠিক যে, শিশুদের মানসিক বিকাশ ও বিনোদনের জন্য যে পরিমাণ ব্যবস্থা থাকা উচিত তা এখন হচ্ছে না। আগে বিটিভিতে ফেরদৌসী আপার তত্ত্বাবধানে ‘এসো গান শিখি’, ‘নতুন কুঁড়ি’ কিংবা ‘রুমঝুম’ অনুষ্ঠান হতো। এখন দুই-একটি চ্যানেল বাদে তেমন করে হচ্ছে কই? দুরন্ত টিভিতে বাচ্চাদের নিয়ে হচ্ছে। তবে বিটিভিসহ যে কোনো চ্যানেলে শিশুদের অনুষ্ঠান ও ব্যাপ্তি বাড়ানো দরকার। আর যেহেতু বিটিভি বাইরে দেখে, তাই এই চ্যানেলে আরও বেশি পরিমাণ শিশুদের অনুষ্ঠান দেখানো উচিত।’ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী বলেন, ‘দেশে প্রায় ৪৫ শতাংশ শিশু। এই বিপুলসংখ্যক শিশুকে বাদ দিয়ে জাতির বিকাশ সম্ভব নয়। তাই সব চ্যানেলে শিশুতোষ অনুষ্ঠানের পরিমাণ বাড়াতে হবে। তাদের মেধা বিকাশকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে ভিন্নরকম শিশুবান্ধব অনুষ্ঠান নির্মাণ করতে হবে। শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে কিছুদিন আগে ৬৪ জেলাভিত্তিক নাট্যোৎসব করলাম। প্রায় ১০ হাজার শিশু অংশগ্রহণ করেছিল। ৬৪ জেলায় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আগের থেকে অনেক বাড়িয়েছি। এখন ১২টি কর্মশালা হচ্ছে, যা আগে তেমন করে ছিল না। শিল্পকলা একাডেমি থেকে একটি চ্যানেল চেয়েছি। এটি বাস্তবায়ন হলে তৃণমূল পর্যায়ের শিশুদের বেশি উপস্থাপন করতে পারব। শিশুদের জন্য প্রাইভেট চ্যানেলসহ বিটিভিতে আরও বেশি অনুষ্ঠান করা দরকার।’ এদিকে শিশুতোষ চ্যানেল দুরন্ত টেলিভিশনের হেড অব প্রোগ্রাম মোহাম্মদ আলী হায়দার বলেন, ‘আমাদের টেলিভিশন তো পুরোপুরি শিশুদের জন্যই। বাচ্চা ও পরিবারের জন্য আমরা ভিন্ন ভিন্ন অনুষ্ঠান পরিকল্পনা করে থাকি। দেশে প্রচুর শিশু। তাদের অবজ্ঞা বা অবহেলা করার তো কিছু নেই। যদি তাদের উপযুক্ত পরিবেশ ও সুস্থ বিনোদনের জোগান না দিতে পারি তবে তারা তো অন্য খারাপ কিছু শিখে যাবে। প্রতিটি টিভি চ্যানেলের দায়িত্ব, অন্তত ২ ঘণ্টা বিভিন্ন রকমের শিশুতোষ অনুষ্ঠান প্রচার করা। আমরা বিটিভির সেই নতুন কুঁড়ি থেকে অনেককেই পেয়েছি। যারা এখন সদর্পে কাজ করছেন। তবে আমরা প্রতিযোগিতানির্ভর কাজ করতে চাই না। কারণ প্রতিযোগিতায় শিশুরা হেরে গেলে কষ্ট পায়। এখন জনপ্রিয় নির্মাতাদের দিয়ে কিছু নাটক, অনুষ্ঠান নির্মাণ করছি। বর্ণমালার ঘর, গল্প শেষে ঘুমের দেশে, মাস্টার মাইন্ড ফ্যামিলি বাংলাদেশসহ আরও বেশকিছু অনুষ্ঠান হচ্ছে। সামনে গোলাম মুক্তাদিরের ‘বাবা থাকে বাসায়’-এর তৃতীয় সিরিজ আসছে।


আপনার মন্তব্য