শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৮ জানুয়ারি, ২০২০ ২২:২৮

নাটকের নামের এ কী হাল!

আলাউদ্দীন মাজিদ

নাটকের নামের এ কী হাল!

‘টেলিভিশন নাটকে আপত্তিকর কিছু থাকবে এটি কারও কাম্য নয়। টেলিভিশনকে বলা হয় ড্রয়িং রুম মিডিয়া। এখানে পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে টিভি দেখেন। সময়ের সঙ্গে আধুনিকতা আমাদের মধ্যে এসেছে। তাই বলে অশ্লীলতাকে নিজেদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া যাবে না। শিল্পী ও নির্মাতাদেরও সমাজ এবং দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা আছে। সমাজ ও তরুণদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে- এ ধরনের নাটকে অভিনয় থেকে শিল্পীদের দূরে থাকা উচিত-’ ক্ষোভ নির্মাতা গিয়াসউদ্দীন সেলিমের।

সেলিমের এ ক্ষোভ যৌক্তিক। কারণ চলচ্চিত্রের পর এবার অশ্লীলতার কবলে পড়েছে টিভি নাটক। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে দেশের প্রধান গণমাধ্যম চলচ্চিত্রে অশ্লীলতার আগ্রাসন জেঁকে বসে। নির্মিত হতে থাকে ‘কোপা সামসু’, ‘খাইছি তোরে’, ‘নিষিদ্ধ নারী’, ‘নষ্টা মেয়ে’, ‘সেয়ানে সেয়ানে টক্কর’, ‘অশান্ত মেয়ে’, ‘উতলা মন’, ‘বউবাজার’, ‘ক্ষ্যাপা বাসু’র মতো রুচিবিবর্জিত নাম, গল্প ও অভিনয়ের অশ্লীল সব ছবি। এতে মধ্য থেকে উচ্চবিত্তের দর্শক সিনেমা হল ছাড়ে। ফলে চলচ্চিত্রে নেমে আসে চরম ধস। যার মাসুল এখনো গুনছে চলচ্চিত্র জগৎ। এবার এ অশ্লীলতার আগ্রাসন ভর করেছে টিভি নাটকে। কিছু দিন ধরে নির্মিত হচ্ছে অশ্লীল নাম ও ভাষার নাটক। যেমন- ব্যাচেলর ট্রিপ, দুদু মিয়া, সেন্ড মি নুডস, বেড সিন, ছ্যাঁকা খেয়ে বেঁকা, বাকিখোর, চুটকি ভান্ডার, সেলিব্রেটি কাউ, ফালতু, লেডি কিলার, প্লে-বয়, ক্রেজি লাভার, ড্যাশিং গার্লফ্রেন্ড, বংশগত পাগল, চ্যাতা কাশেম, ছ্যাঁচড়া জামাই, চিটার, প্রোটেকশন, শোবার ঘর প্রভৃতি। এতে ড্রইং রুমের পারিবারিক বিনোদনের এ ছোট পর্দার সামনে দর্শক এখন পরিবার নিয়ে বসতে রীতিমতো লজ্জাবোধ করে। অনেকের মতে, নাটকে অশ্লীলতা শুরু হয় ‘আবাসিক হোটেল’ শিরোনামের একটি নাটকের মধ্য দিয়ে। এটি ২০১৭ সালে ইউটিউবে আসে। এরপর থেকে নাটকে অশ্লীলতা বাড়তে থাকে। অনেক দিন ধরে কিছু নাটকে অশ্লীল সংলাপ ব্যবহার হচ্ছে। সুরসুরি দেওয়ার মতো সংলাপ ‘সোনা’, ‘বাবু’ ব্যবহার করতেও বিবেকে বাধছে না নির্মাতাদের। নির্মাতা শিহাব শাহিন বলেন, তরুণ নির্মাতাদের মধ্যে এখন ভিউয়ের প্রতিযোগিতা চলছে। যেভাবে নাটক নির্মাণ হচ্ছে সেভাবে চলতে থাকলে চলচ্চিত্রের মতো একটা সময় আমাদের নাটকও শেষ হয়ে যাবে। ‘দর্শকরা খায়’ এমন ভাবনা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। অভিনেতা তারিক আনাম খান বলেন, নাটক সমাজের কথা বলে। এখানে সমাজের অনেক কিছু তুলে ধরার সুযোগ আছে। তবে সেটির উপস্থাপনায় অবশ্যই শৈল্পিক ব্যাপারটা থাকতে হবে। নাটকের মান এখন কমে গেছে। নাটক-সংশ্লিষ্ট অনেকের কথায়, প্রতিযোগিতার নামে কোনো কোনো নির্মাতা কিংবা অভিনয়শিল্পী অকারণে এত বেশি খোলামেলা হচ্ছে তা চোখে লাগার মতো। কিছু খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে তারা। এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে না পারলে এক সময় নাটক ও নাটকের মানুষরা অস্তিত্ব হারাবে। এক সময় সাহিত্যনির্ভর গল্প নিয়ে তৈরি হতো টেলিভিশন নাটক। সে নামগুলোতে পাওয়া যেত কাব্যিক ছোঁয়া। এখন সেদিন নেই। এখন নাটকের ভিউ বা জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য নাটকের যা ইচ্ছে তাই নাম রাখা হচ্ছে। অনেক সময় এসব নাটকের নাম মুখে নিতেও বিব্রত হতে হয়।

প্রখ্যাত অভিনেত্রী দিলারা জামান বলেন, নাটকের এমন উদ্ভট ও অরুচিকর নামকরণকে পরিচালকদের সৃজনশীলতা ও শিক্ষার অভাব দায়ী। দীর্ঘদিন ধরে টিভি নাটকে পরিবার খুঁজে পাওয়া যায় না। একজোড়া তরুণ-তরুণী আর দুটি মোবাইল ফোনই হচ্ছে এখনকার বেশির ভাগ নাটকের চরিত্র। প্রেমের প্যানপ্যানানিতে নাটকের শুরু আর শেষ। এর ওপর অরুচিকর সংলাপ আর নাম তো আছেই। এভাবে চলতে থাকলে নিজেকে নাটকের মানুষ নামে পরিচয় দিতে একসময় লজ্জিত হতে হবে।

নাট্যজন আলী যাকের বলেন, কিছু নাটকে যে ধরনের নাম দেওয়া হচ্ছে, এগুলো মানতে পারি না। নাটকের নামের এই বিকৃতির পেছনে যারা আছেন, তাদের শাস্তি দেওয়া উচিত। অভিনেতা আবুল হায়াত বলেন, একটা সময় টিভি নাটক দেখে বাচ্চারা কথা বলা শিখেছে। প্রমিত বাংলায় লেখা নাটকের ভাষা যেখানে হারিয়ে গেছে, নাম নিয়ে আর কী আশা করতে পারি। আরটিভির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ আশিক রহমান বলেন, এ ধরনের নামের বিষয়টি মোটেও সমর্থনযোগ্য নয়। এটি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে শিল্পী, পরিচালক থেকে শুরু করে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। টিভি চ্যানেল বা ইউটিউবের জন্য নির্মিত নাটকের সেন্সর না থাকায় নির্মাতারা কোনো ধরনের বিচার-বিবেচনা ছাড়াই উদ্ভট নামের নাটক বানিয়ে চলেছেন।

প্রখ্যাত অভিনেতা পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় এক সময় সকাল-সন্ধ্যা, ঢাকায় থাকি, শুকতারা, রূপনগর, বাবার কলম কোথায়, এখানে নোঙর’, শঙ্খনীল কারাগার, ফুল বাগানে সাপ, এইসব দিন রাত্রি, বহুব্রীহি, অয়োময়, স্বপ্নের পৃথিবী, সংশপ্তক, কোথাও কেউ নেই, আজ রবিবার, জোয়ার ভাটা, যদিও দূরের পথ-এর মতো অর্থবহ ও মার্জিত নামের নাটক প্রচার হতো।

আর এখন রুচিবিবর্জিত নাম, স্বল্প পোশাক আর অশ্লীল সংলাপে নাটক নির্মাণ চলছে। এক্ষেত্রে টিভি প্রিভিউ বোর্ডের কঠোরতা ও সচেতনতা এবং ইউটিউবের ক্ষেত্রেও সেন্সর আরোপ জরুরি হয়ে পড়েছে। নাম, সংলাপ, পোশাক যদি সংস্কৃতি ও পারিবারিক মূল্যবোধের বাইরে যায় তাহলে ওই দৃশ্যে পরিবার যে অস্বস্তিকর ও লজ্জাজনক পরিবেশের মধ্যে পড়বে তার দায়ভার কে নেবে?

নাট্যকার আহমেদ কাউসারের মতে, এটা বাংলা নাটকের জন্য অশনিসংকেত। প্রয়োজনে সিনেমার মতো নাটক, টেলিফিল্ম ও ওয়েব কন্টেন্টগুলোতেও সেন্সর সিস্টেম চালু করতে হবে। আমি কাউকে নাচতে নেমে ঘোমটা দিতে বলব না। কলাকুশলী ও নির্মাতাদের একটা জিনিস মাথায় রেখে নাটক বানানো উচিত, তা হলো- এই নাটকটি হয়তো টিভির সামনে কোনো বাবার পাশে মেয়ে, কোনো মায়ের পাশে ছেলে, কোনো বড় ভাই বা বোনের পাশে বসে তার ছোট সহোদর দেখছে। তাই এমন কিছু দেখানো যাবে না যা তাদের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়। মনে রাখতে হবে, রিমোট দিয়ে চ্যানেল পরিবর্তন করা কোনো সমাধান নয়।

 সুমিত রায় অন্তর নামে একজন নাট্য পরিচালক তার ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, ‘একটি নাটকের সংলাপ ছিল এমনÑ ‘শালীর ঘরে শালী, একদম নড়বি না মাইরা ফেলব... শালীর ঘরে শালী’। অন্তরের কথায় বাংলা টিভি নাটকে এমন সংলাপ! কীভাবে সম্ভব? টিভির প্রিভিউ কমিটি থাকে, তারা দেখল না? তারা কীভাবে ছাড় দিল এ সংলাপকে? এরপর আরেকটি সংলাপ- ‘কুত্তার বাচ্চা, চারটা বছর তুই আমাকে ইউজ করছোস, তারপর ছুড়ে ফেলে দিছোস,’ ‘ধরাধরি করতে ভালো লাগতেছে? চল উপরে চল, ধরাধরি করি।’ অন্তর বলেন, টিভি নাটক হলো ড্রয়িং রুম মিডিয়া। একটি পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে টিভি দেখে। সেখানে এ ধরনের গালিগালাজ, অশ্লীল ইঙ্গিতপূর্ণ সংলাপ আসলেই ভয়ঙ্কর ব্যাপার। বাচ্চারা এ নাটক দেখে কী শিখবে। তাহলে কি অবক্ষয় এবার বড় পর্দা ছাড়িয়ে ছোট পর্দায় এসে ভর করেছে? নাটকের এ পরিস্থিতির জন্য নাট্যকার, পরিচালক, অভিনেতা-অভিনেত্রী, টিভি কর্তৃপক্ষ সবাই দায়ী। নাট্য নির্মাতা হিসেবে আমি বড়ই লজ্জিত।’


আপনার মন্তব্য