শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১ মার্চ, ২০২১ ২২:০২

চলচ্চিত্রের সুদিন কি ফিরছে

আলাউদ্দীন মাজিদ

চলচ্চিত্রের সুদিন কি ফিরছে

‘সিনেমা হলের উন্নয়নের জন্য সরকার প্রতিশ্রুত ১ হাজার কোটি টাকা অবশেষে পেতে যাচ্ছে সিনেমা হল মালিকরা। এবারই সরকারি অনুদানের ছবি নির্মাণে ছবিপ্রতি সর্বোচ্চ অনুদান দেওয়া হচ্ছে। শুরু হচ্ছে বিগ বাজেটের বেশ কিছু ছবি নির্মাণ। বিদেশি ছবি আমদানির বিষয়টিরও অগ্রগতি হচ্ছে। চলতি বছর হঠাৎ করে চলচ্চিত্রকে নিয়ে এমন একাধিক ইতিবাচক প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের প্রশ্ন- ‘চলচ্চিত্রের সুদিন কি তাহলে ফিরছে?’

সম্প্রতি তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ চলচ্চিত্রকারদের উদ্দেশে বলেছেন আগামী ৫ বছরে দেশে সিনেমা হলের সংখ্যা দ্বিগুণ হবে। তাঁর কথায় বর্তমান সরকার তিন ক্যাটাগরিতে সিনেমা হলগুলোতে প্রণোদনা দিচ্ছে। হলপ্রতি সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা, দুটি হলে ১০ কোটি টাকা করে দেওয়া হচ্ছে।

এ ছাড়া সিনেমা তৈরিতেও অনুদানের সংখ্যা এবং টাকার পরিমাণও বাড়ানো হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারি অনুদানে সিনেমা বানালে কমপক্ষে ১০ হলে তা প্রদর্শন করতে হবে। তথ্যমন্ত্রীর এমন আশ্বাসের পর চলচ্চিত্রকারদের মধ্যে আশার আলো আরও উজ্জ্বল হয়েছে।

চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মিয়া আলাউদ্দীন জানিয়েছেন, সিনেমা হলের উন্নয়নে সরকারের দেওয়া ১ হাজার কোটি টাকার তহবিলের বিষয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক এক সার্কুলারে জানিয়েছে, প্রাথমিক ধাপে এই টাকা থেকে ৫০০ কোটি টাকার ঋণ সহজ শর্তে সিনেমা হল মালিকদের দেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে বাকি ৫০০ কোটি টাকাও প্রদানের প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। একটি সিনেমা হলকে সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হবে।

সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি কিস্তিতে এই ঋণের অর্থ পরিশোধ করা যাবে। মেট্রোপলিটন এলাকার জন্য ৫ পার্সেন্ট ও বাইরের সিনেমা হলের জন্য সাড়ে ৪ পার্সেন্ট করে সুদ ধরার প্রস্তাব রয়েছে। ঋণ প্রাপ্তির প্রথম বছর সুদবিহীন অর্থ পরিশোধ করার সুযোগ থাকছে।

অন্যদিকে চলচ্চিত্র নির্মাণে সরকারি অনুদানের ক্ষেত্রে এবারই প্রথম ছবিপ্রতি সর্বোচ্চ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। মোট ১০টি পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবিকে অনুদান দেওয়া হবে এবং ছবিপ্রতি অনুদানের অঙ্ক হচ্ছে ৭৫ লাখ টাকা। দেশে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ছবির পরিমাণ দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে কম থাকায় দর্শকের অভাবে সিনেমা হল পড়েছে লোকসানের কবলে। লোকসানের ঘানি টানতে না পেরে ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় ১ হাজার ৩০০ সিনেমা হল। এ অবস্থার উত্তরণে উপমহাদেশীয় চল”িচ্চত্র আমদানির জন্য ২০১০ সাল থেকে দাবি জানিয়ে আসছিল চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতি।

মাঝে আংশিক অনুমতি পাওয়া গেলেও ছবি আমদানিতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এই প্রক্রিয়া ফলপ্রসূ হয়নি। কারণ ভারতে একটি ছবি মুক্তির পর নানা প্রক্রিয়া পূরণ করে ছবিটি এ দেশে আমদানি করতে কমপক্ষে দুই থেকে তিন মাস সময় লেগে যায়। এ সময়ের মধ্যে ওই ছবিটি সিনেমা হলে মুক্তির পর ভারতীয় টিভি চ্যানেল ও অনলাইন প্ল্যাটফরমে প্রদর্শন হয়ে যায়। তাই দেখা ছবি দর্শক আর সিনেমা হলে গিয়ে দেখতে চায় না। এ কারণে সরকারের কাছে প্রদর্শকদের দাবি ছিল আমদানি নীতিমালার শর্ত শিথিল করে দুই দেশে একই সঙ্গে ছবি মুক্তির ব্যবস্থা করা। শুরুতে বিদেশি ছবি আমদানির ক্ষেত্রে চলচ্চিত্রের অন্য সমিতিগুলোর প্রবল আপত্তি ও আন্দোলন ছিল। কিন্তু যখন ছবির অভাবে চলচ্চিত্র শিল্পই বিলীনের পথে চলে যাচ্ছে তখন তাঁদের টনক নড়ে।

তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে চলচ্চিত্র প্রদর্শক, প্রযোজক ও পরিচালক সমিতি শেষ পর্যন্ত বিদেশি ছবি আমদানিতে ঐকমত্যে পৌঁছে। শিগগিরই এ বিষয়ে তিন সমিতির আবেদন তথ্য মন্ত্রণালয়ে জমা পড়ছে বলে জানান মিয়া আলাউদ্দীন। মানে চলতি বছরের শেষভাগে বিদেশি ছবি একসঙ্গে দুই দেশে প্রদর্শন শুরু হতে পারে বলে জানান এই কর্মকর্তা। এদিকে বেশ কিছু চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিগ বাজেট ও বড় মাপের তারকা নিয়ে ছবি নির্মাণ করতে যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে এম এ জলিল অনন্তর প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান মনসুন ফিল্মসের ‘নেত্রী’।

এ ছাড়া এই প্রতিষ্ঠানের নির্মিত ইরানের সঙ্গে যৌথ প্রযোজনার ছবি ‘দিন দ্য ডে’ আগামী ঈদুল আজহায় মুক্তি পাবে। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টিমিডিয়া চলতি বছর তিনটি আন্তর্জাতিক মানের চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এদিকে জাজ কাল থেকে ‘মাসুদ রানা’ ছবির নির্মাণ কাজ শুরু করছে। 

এই প্রতিষ্ঠানের নির্মিত ‘জিন’ ছবিটি এ বছরই মুক্তি পাবে।

অন্যদিকে ঢাকাই ছবির শীর্ষ অভিনেতা শাকিব খানকে নিয়ে সম্প্রতি দুটি ছবি নির্মাণ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়ে গেছে। চলতি মাস থেকে পর্যায়ক্রমে দুটি ছবিরই শুটিং শুরু হচ্ছে। এই দুটি ছবির মধ্যে একটি হলো ‘আমিই বাংলাদেশ দ্য লিডার’, অন্যটি ‘অন্তরাত্মা’। এই ছবিতে শাকিবের বিপরীতে অভিনয় করবেন কলকাতার অভিনেত্রী দর্শনা বণিক।  কলকাতার নায়ক দেবকে নিয়ে নির্মিত শাপলার ‘কমান্ডো’ ছবিটি মুক্তির অপেক্ষায় আছে।

এ ছাড়া সৈকত নাসিরের ‘আকবর ওয়ানস আপন এ টাইম ইন ঢাকা’, ‘ক্যাসিনো’, ‘বর্ডার’ ও ‘চোখ’ ছবির নির্মাণ কাজও প্রায় শেষ। আরিফিন শুভ ভারতে ব্যস্ত রয়েছেন শ্যাম বেনেগাল নির্মিতব্য বঙ্গবন্ধুর বায়োপিকের কাজে। মোস্তাফিজুর রহমান মানিক নির্মাণ করছেন ‘যাও পাখি বলো তারে’ ছবিটি।

এ ছাড়া বড় বাজেটের ‘বীরত্ব’, ‘লাইভ’, ‘কসাই’, ‘গ্যাংস্টার’ ‘ছায়াবৃক্ষ’, ‘কানামাছি’, ‘ঈশা খাঁ’ ছবিগুলোর মধ্যে কয়েকটির নির্মাণ কাজ চলছে ও কিছু ছবির কাজ শুরু হচ্ছে এ মাসে। চলতি বছর মুক্তির তালিকায় আছে ‘মিশন এক্সট্রিম’, ‘বিক্ষোভ’, ‘বিদ্রোহী’, ‘ক্রিমিনাল’, ‘অপারেশন সুন্দরবন’, ‘শান’, ‘পরাণ’, ‘শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ-২’,  ‘জিন’সহ প্রায় অর্ধশতাধিক ছবি।

প্রদর্শক সমিতির কর্মকর্তা মিয়া আলাউদ্দীন বলেন, সরকার সিনেমা হলের উন্নয়নে ঋণ দিচ্ছে এটি আশার কথা। এখন দরকার পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ছবি। স্বল্প বাজেটের নামেমাত্র ছবি নির্মাণ করে কোনো লাভ নেই। এতে সিনেমা হলবিমুখ দর্শকদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। সব মিলিয়ে ‘চলচ্চিত্রের সুদিন ফিরছে’- এমন খবরের সুবাতাস বইছে এখন চলচ্চিত্রাঙ্গনে।


আপনার মন্তব্য