Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা
আপলোড : ২১ অক্টোবর, ২০১৬ ২৩:২৫

আজ স্মরণকালের বড় রাজনৈতিক উৎসব

জাহাঙ্গীর আলম

আজ স্মরণকালের বড় রাজনৈতিক উৎসব
আওয়ামী লীগের সম্মেলনের মঞ্চ প্রস্তুত। গতকাল তোলা ছবি —জয়ীতা রায়

আওয়ামী লীগের ২০টি সম্মেলনের মধ্যে ছয়টিই হয়েছে দল ক্ষমতায় থাকাকালে। এর মধ্যে আজকের ২০তম সম্মেলন ঘিরেই সবচেয়ে বেশি হৈচৈ আর আনন্দ দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে। আগের কোনো সম্মেলন নিয়ে এরকম উন্মাদনা দেখা যায়নি। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলন ছাপিয়ে স্মরণকালের বড় রাজনৈতিক উৎসব বসছে আজ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের মতে, এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কোনো রাজনৈতিক শক্তি দেশে নেই। তা ছাড়া দলটির ক্ষমতার গত আট বছরে বেশ কিছু দৃশ্যমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ড আছে। দারিদ্র্য বিমোচনের আপেক্ষিক হার হ্রাস, আট বছর ধরে অব্যাহত ছয় ভাগের বেশি প্রবৃদ্ধির হার ধরে রাখা, নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি প্রতিপালন তথা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যকর প্রভৃতি সাফল্য এই সম্মেলনে নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে।

পাশাপাশি ভারত-চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র হলেও এই চারটি শক্তিধর রাষ্ট্রের সঙ্গেই আওয়ামী লীগ সরকারের সুসম্পর্ক রয়েছে। সম্প্রতি চীনের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরকালে দুই দেশের মধ্যে প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার ঋণচুক্তির সমঝোতা স্মারক করেছে। বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফর করে দুই বিলিয়ন ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ তার আগের ক্ষমতার মেয়াদগুলোতে এমন সুসময় পার করেনি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই দলের এবারের সম্মেলন বৃহত্তম রাজনৈতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। সংবিধান অনুসারে ২০১৮ সালের শেষার্ধে জাতীয় নির্বাচনের সময় নির্ধারিত থাকায় আওয়ামী লীগের টানা ক্ষমতারোহণের হ্যাটট্রিকের সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি নির্মূলে কঠিন অঙ্গীকার আছে দলের ঘোষণাপত্রে। এই দুই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি সামনে রেখে আওয়ামী লীগের দুই দিনব্যাপী ত্রিবার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।  ‘শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে চলেছি দুর্বার, এখন সময় বাংলাদেশের মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার’ স্লোগান নিয়ে আজ সকাল ১০টায় সম্মেলনের উদ্বোধন করবেন দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের সম্মেলনের প্রথাগত আকর্ষণীয় দিক হলো, নেতা নির্বাচনে শেষ মুহূর্তের টানটান উত্তেজনা, কানাকানি আর অভাবনীয় নাটকীয়তার মহোৎসবের সমষ্টি। দলীয় সভাপতি হিসেবে শেখ হাসিনার বিকল্প না থাকায় পদটি তার জন্য সুনিশ্চিত। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন ঘিরেই থাকে আওয়ামী লীগের সম্মেলনের মূল আকর্ষণ। এ পদেও সম্মেলনের একদিন আগেই সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের মনোনয়ন প্রায় নিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় বাকিটা কেবল আনুষ্ঠানিকতা। তবে আওয়ামী লীগের সম্মেলন কেবল নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের দলীয় সমাবেশ নয়, সম্মেলনের মাধ্যমে দলের আগামী দিনের নীতিনির্ধারণের পাশাপাশি দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও নতুন রাজনৈতিক কর্মকৌশল নেওয়া হয় বলে আকর্ষণীয়তার এতটুকু কমতি থাকে না।

এ ছাড়া দলের সভাপতিমণ্ডলী, সম্পাদকমণ্ডলী ও কেন্দ্রীয় সদস্য পদে ব্যাপক পরিবর্তনের আভাস থাকায় সম্মেলন ঘিরে নেতা-কর্মীদের উত্সুক আছেই। আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে, এবারের সম্মেলনে আগের দুই কমিটির বিতর্কিত, অযোগ্য, ব্যর্থ এবং যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আছে তারা বাদ পড়তে পারেন। নতুন কমিটিতে অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ও সাংগঠনিক শক্তি সম্পন্ন নেতাদের স্থান দেওয়া হবে। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকসহ সম্পাদকমণ্ডলীতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে নতুন কমিটিতে। কে বাদ পড়ছেন আর নতুন কে আসছেন তা নেতাদের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা আছে। এবারের সম্মেলনে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের মূল কমিটিতে ফিরিয়ে নেওয়া হবে কিনা বা তাদের ভাগ্যে কী আছে তা এখনো স্পষ্ট নয়। এই কমিটির মাধ্যমে সংগঠনকে আরও চাঙ্গা করে আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া দলের বড় লক্ষ্য। একই সঙ্গে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস নির্মূলের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠাও সম্মেলনের অন্যতম উদ্দেশ্য। ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করার উন্নয়ন পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে সম্মেলনে।

কমিটির অবয়ব বাড়ছে : এবারের সম্মেলনে আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে ব্যাপক সংশোধনী আনা হচ্ছে। তবে সংশোধনীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে কমিটির অবয়ব বাড়ানো। আগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ ছিল ৭৩ সদস্যের। এবার আটজন বাড়িয়ে ৮১ সদস্যবিশিষ্ট করা হবে। আগের কমিটিতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সংখ্যা ছিল ১৫। নতুন কমিটিতে থাকছে ১৯ সদস্য। অর্থাৎ সভাপতিমণ্ডলীতে চারটি পদ বাড়ানো হচ্ছে। আগের কমিটিতে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের পদ ছিল তিনটি। এবার এ পদে একটি বাড়িয়ে চারটি করা হবে। সাংগঠনিক সম্পাদক পদ একটি বাড়িয়ে আটটি করা হচ্ছে। আগের কমিটিতে কেন্দ্রীয় সদস্য ছিল ২৬ জন। নতুন কমিটিতে দুজন বাড়িয়ে ২৮ জন করা হবে।

যা থাকতে পারে ঘোষণাপত্রে :  আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্রে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করা হচ্ছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে দলের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার অবসান, দারিদ্র্য বিমোচন এবং খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা বিধানে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ারও অঙ্গীকার থাকছে ঘোষণাপত্রে।

সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতা : সকাল ১০টায় জাতীয় পতাকা এবং দলীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে। এরপর বেলুন এবং কবুতর ওড়ানো, মঞ্চে দলীয় সভাপতির আসন গ্রহণ, দলীয় সংগীত-দেশাত্মবোধক সংগীত এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। এরপর পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ, শোক প্রস্তাব এবং এক মিনিট নীরবতা পালন শেষে সভাপতির উদ্বোধনী ভাষণ। সাধারণ সম্পাদকের সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ শেষে আমন্ত্রিত বিদেশি অতিথিদের ভাষণ থাকবে। মধ্যাহ্ন বিরতির পর প্রত্যেক জেলা থেকে একজন করে কাউন্সিলর বক্তব্য রাখবেন। এ প্রক্রিয়া চলবে সন্ধ্যা পর্যন্ত। রাতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি প্রথম দিনের অনুষ্ঠানের। সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশন বসবে কাল রবিবার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে। এ অধিবেশনে কাউন্সিলররা নেতা নির্বাচন করবেন। প্রথা অনুযায়ী কাউন্সিল অধিবেশনে দলের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করেন কাউন্সিলররা। সম্মেলনে ৬ হাজার ৫৭০ জন কাউন্সিলর অংশ নেবেন। ৫০ হাজার কাউন্সিলর ও ডেলিগেটের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে প্যান্ডেলে। ১০টি বড় পর্দায় সম্মেলনের কার্যক্রম দেখানো হবে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার মানুষের দুই দিনের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।  নতুন কমিটি নির্বাচনের কার্যক্রম পরিচালনা করবে তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশন। উদ্বোধনী অধিবেশনে যোগ দিতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ, বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এ ছাড়াও বিদেশি কূটনীতিক, বুদ্ধিজীবী এবং সংবাদপত্রের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বিদেশি অতিথিদের মধ্যে ১২টি দেশের ৫৫ জন রাজনীতিবিদ সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। সম্মেলন উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের চারপাশে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের সর্বশেষ জাতীয় সম্মেলন হয় ২০১২ সালের ২৯ ডিসেম্বর। সম্মেলনে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন শেখ হাসিনা ও সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।


আপনার মন্তব্য